গণভোট কখনোই কেবল একটি প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের চরিত্র, ক্ষমতার উৎস এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার চূড়ান্ত প্রকাশ। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণভোটকে প্রায়ই ‘রাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, যেখানে জনগণ প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো অতিক্রম করে সরাসরি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখায় হস্তক্ষেপ করে। বিশেষ করে এমন রাষ্ট্রে, যেখানে দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা এবং নাগরিক অধিকারের ভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। সেখানে গণভোট একটি প্রশাসনিক ঘটনার সীমা অতিক্রম করে অস্তিত্বগত রাজনৈতিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান গণভোট ঠিক সেই পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এর ফলাফল কেবল কিছু প্রস্তাবের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না; বরং রাষ্ট্র কোন পথে যাবে, সংস্কার নাকি পুনরায় ফ্যাসিবাদ তা নির্ধারণ করবে।
২০২৪ এর জুলাই বিপ্লব গণভোটকে অনিবার্য ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দিয়েছে। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের আন্দোলন নয়, বরং ছিল রাষ্ট্রীয় দমন, ভোটাধিকার হরণ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যাংকিং খাতের লুটপাট এবং প্রশাসনিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ছিল একটি ‘legitimacy rupture’ যেখানে জনগণ বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামোর নৈতিক ভিত্তি প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই প্রত্যাখ্যান থেকেই রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ফলে এই গণভোট সরাসরি জুলাই বিপ্লবের রাজনৈতিক পরিণতি এবং এর সাংবিধানিক রূপান্তরের সম্ভাব্য সেতু।
রাজনৈতিক তত্ত্ব বলে, গণভোট তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা ক্ষমতাসীনদের বৈধতা রক্ষার হাতিয়ার না হয়ে জনগণের সম্মতিকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে স্থাপন করে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, গণভোট ব্যর্থ হলে বা জনগণের রায় কার্যকর না হলে রাষ্ট্র দ্রুত বৈধতার সঙ্কট, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং কর্তৃত্ববাদের পুনরাগমনের পথে ধাবিত হয়। ইউরোপের পোস্ট-অস্টেরিটি রাষ্ট্রগুলো, লাতিন আমেরিকার বিপ্লবোত্তর সমাজ, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের আরব বসন্ত-পরবর্তী দেশগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে, গণরায় উপেক্ষিত হলে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতায় ডুবে যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই গণভোটের গুরুত্ব আরো গভীর। এটি নির্ধারণ করবে অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদন পাবে কি না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আবার জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় ফিরবে কি না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি কার্যকরভাবে রোধ করা যাবে কি না।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গণভোটকে অনিবার্য গুরুত্ব দিয়েছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সঙ্কট, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার মধ্য দিয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের শাসন সূচকে দেখা যায়, রাজনৈতিক বৈধতা ও আইনের শাসনের দুর্বলতা সরাসরি অর্থনৈতিক ঝুঁকি বাড়ায়। আন্তর্জাতিক বাজার, উন্নয়ন অংশীদার এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখন আর শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়; বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈধতাকেই প্রধান সূচক হিসেবে দেখছে। ফলে গণভোটের ফলাফল কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নয়; রফতানি, রেমিট্যান্স, ঋণচুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎও এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এই প্রেক্ষাপটে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ দু’টি শব্দ আর সাধারণ মতামত নয়। ‘হ্যাঁ’ মানে রাষ্ট্র সংস্কারের দরজা খোলা রাখা, জুলাইবিপ্লবের গণ-আকাঙ্ক্ষাকে সাংবিধানিক পথে এগিয়ে নেয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বাস পুনর্গঠনের চেষ্টা। বিপরীতে ‘না’ মানে কেবল সংস্কার প্রত্যাখ্যান নয়; এটি অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া এবং পুরনো ফ্যাসিবাদী শক্তি ও আধিপত্যবাদী প্রভাবের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা।
‘না’ জয়ী হলে একটি তাৎক্ষণিক বৈধতা সঙ্কট সৃষ্টি করবে। প্রশাসন বিভক্ত হবে, সংবিধানিক শূন্যতা প্রকট হবে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশ একটি অনিশ্চিত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। রাজনৈতিক সঙ্ঘাত তীব্র হবে, পুরনো ফ্যাসিবাদী শক্তি ও দলীয় এলিটরা সক্রিয় হবে এবং জুলাই বিপ্লবের নেতৃত্ব প্রতিশোধমূলক দমনের ঝুঁকিতে পড়বে। অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, বৈদেশিক আস্থা সঙ্কট এবং ভূরাজনৈতিক চাপ একত্রে রাষ্ট্রকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। যার চূড়ান্ত পরিণতি সহিংস সঙ্ঘাত বা গৃহসঙ্ঘাত পর্যন্ত গড়াতে পারে।
গণভোট রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস নির্ধারণের রাজনৈতিক যুদ্ধ। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, ‘প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গত দেড় দশকে এই জনগণ বাস্তবে কতটুকু ক্ষমতার মালিক ছিল? ভোটাধিকার হরণ, একতরফা নির্বাচন, সংসদীয় রাবার-স্ট্যাম্প সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক দলীয়করণের মধ্য দিয়ে জনগণকে সংবিধানগত মালিকানা থেকে কার্যত উচ্ছেদ করা হয়েছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান গণভোট কোনো নীতিগত সংস্কারের প্রশ্ন নয়; এটি জনগণ বনাম ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের মুখোমুখি সংঘর্ষ। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রজাতন্ত্র হবে গণতন্ত্রের ভিত্তিতে পরিচালিত; কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে ১৫৩ ধারার বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইন এবং বিচারবহির্ভূত দমননীতির মাধ্যমে। এই সাংবিধানিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে জুলাই বিপ্লব ছিল জনগণের স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া- একটি গণ-বিদ্রোহ, যা সংবিধানের প্রস্তাবিত ‘মানবাধিকারের নিশ্চয়তা’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে গণভোট নির্ধারণ করবে, সংবিধান কি আবার জনগণের হাতে ফিরবে, নাকি ক্ষমতাধর এলিটদের ব্যাখ্যার খেলায় বন্দী থাকবে। সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সংসদের আস্থাভাজন হবেন; কিন্তু সংসদ যদি জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি না হয়, তবে সেই আস্থা সাংবিধানিক হলেও নৈতিকভাবে ভুয়া। গণভোট এই ভুয়া বৈধতার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত।
বাংলাদেশের ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী কোনো গণভোট ছাড়াই সংসদে পাস হয়েছিল, যার পরিণতি ছিল একদলীয় শাসন, সংবাদপত্র বন্ধ, বিচার বিভাগের গলা টিপে ধরা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতা ও সামরিক হস্তক্ষেপ। জনগণের সম্মতি উপেক্ষা করার ফল রাষ্ট্র কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার সবচেয়ে নির্মম উদাহরণ এটি। আবার নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের দাবিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- যা কার্যত একটি ডি-ফ্যাক্টো গণভোটের ফল। সেই ব্যবস্থার অধীন নির্বাচনগুলোই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে, কোনো গণভোট ছাড়াই। এর ফলাফল হয়েছিল, ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের মধ্যরাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের গণবিস্ফোরণ। ইতিহাস স্পষ্ট, জনগণের মত উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধন রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারে না।
বিশ্বে গণভোটের অনেক উদাহরণ রয়েছে। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রিটিশ জনগণ ‘Leave’-এ ভোট দিয়েছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সত্ত্বেও রাষ্ট্র জনগণের রায় বাস্তবায়ন করেছে। ফলাফল ছিল অস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে গণতান্ত্রিক বৈধতা অক্ষুণ্ন রয়ে গেছে। গ্রিসে ২০১৫ সালের গণভোটে জনগণ আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কঠোর শর্তে ‘না’ বলেছিল। কিন্তু সরকার সেই রায় কার্যকর করেনি। এর ফলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়েছে, রাজনৈতিক চরমপন্থার উত্থান হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয় হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান গণভোটও একটি নিষ্পত্তিমূলক মুহূর্ত। গণভোটে না জয়যুক্ত হওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে তাৎক্ষণিক পরিণতি হবে সংবিধানিক বৈধতা সঙ্কট। সংবিধানের ৫৫ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাহী ক্ষমতা সংসদের প্রতি দায়বদ্ধ। কিন্তু সংসদ না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নির্ভর করছে গণসমর্থনের ওপর। গণভোটে ‘না’ মানে সেই গণসমর্থন প্রত্যাহার। ফলে সরকার আইনত টিকে থাকলেও নৈতিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়বে। এই শূন্যতায় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাঙন। সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের জনগণের সেবক হিসেবে নির্ধারণ করেছে। তবু বাস্তবে তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়বে।
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট



