দখলদারত্বের রাজনীতি

জম্মু ও কাশ্মিরে এই প্রস্তাবগুলো আইনগতভাবে স্পষ্ট কিন্তু রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

রাষ্ট্র কিভাবে বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে সেটি আন্তর্জাতিক আইন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমতীরে ইসরাইল এবং জম্মু ও কাশ্মিরে ভারতের দখলদারত্ব দু’টি সমসাময়িক ও বহুল আলোচিত উদাহরণ। সমালোচকরা ব্যাপকভাবে এটিকে কার্যত সংযুক্তীকরণ হিসেবেই দেখেন যা অর্জনের কৌশল হিসেবে অভ্যন্তরীণ আইন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কাজে লাগানো হয়েছে। উভয় রাষ্ট্রই ভেতর থেকে বৈধকরণের একটি কৌশল অনুসরণ করেছে, কার্যকরভাবে ভূ-খণ্ডগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃত অবস্থা ও অবস্থান বাতিল করার চেষ্টা করেছে। ইসরাইল ও ভারত উভয়ই তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলো মৌলিকভাবে পরিবর্তন করার জন্য নাটকীয় আইনি কৌশল ব্যবহার করেছে।

জম্মু ও কাশ্মিরের আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা শেষ করার জন্য ভারত ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে। অন্যদিকে ইসরাইল কয়েক দশক ধরে পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপন করে উপনিবেশ তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আঞ্চলিক পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে, ইসরাইল ও ভারত উভয়ই বানোয়াট ধর্মীয় প্রতিশ্রুতির উপর ভিত্তি করে ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদী মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। দখলদারত্বের লক্ষ্য এবং সরঞ্জামগুলো একই থাকলেও কৌশলে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ১৯৫৪ সালে কাশ্মিরকে আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা দেয়া কেবল আত্মনিয়ন্ত্রণের কণ্ঠস্বর দমন করার একটি পদক্ষেপ। ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ, অর্থ এবং বৈদেশিক বিষয়সহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ভারতের কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল। ৩৭০ কেবল কাশ্মিরকে কিছুটা স্বশাসনের অনুমতি দেয় যা পুতুল শাসনের মতো। ২০১৯ সালে, ভারত অ-কাশ্মিরিদের এই অঞ্চলে সম্পত্তির মালিক হতে, সম্পদ শোষণ করতে ও অস্থায়ী থেকে স্থায়ী সামরিক দখলদারত্বে স্থানান্তরিত করার অনুমতি দেয়। অন্যদিকে, ইসরাইল বছরের পর বছর ফিলিস্তিনি ভূমি অবৈধভাবে দখল ও বসতি তৈরি করে, এখন দখলদারত্ব বৈধ করার জন্য সাংবিধানিক পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

ইসরাইল ১৯৬৭ সাল থেকে সামরিক প্রশাসনের অধীনে পশ্চিমতীর (পূর্বজেরুসালেম বাদে, তবে সেখানেও মুসলমানদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করা হচ্ছে) শাসন করেছে। এই শাসন বৈধকরণের চেষ্টা করা হয়। যদিও ২০১৭ সালে এক আইনের মাধ্যমে বেসরকারি ফিলিস্তিনি জমিতে নির্মিত বসতিগুলোকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। ইসরাইলি সুপ্রিম কোর্ট পরে সেটি বাতিল করে, তবে এই পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট আইনি অভিপ্রায় প্রতিষ্ঠা করেছে বলে মনে করা হয়। ২০২৪ সালে এক আইনে কার্যকরভাবে বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে ইসরাইলি বেসামরিক প্রশাসনকে ক্ষমতাশালী করা হয়, একটি দ্বৈত আইনি ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়, যেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা ইসরাইলি নাগরিক আইনে পরিচালিত হয়, আবার ফিলিস্তিনিরা সামরিক আইনের অধীনে থাকে। এই প্রশাসনিক পরিবর্তন কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই আইনগত সংযুক্তির একটি রূপ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

ডেমোগ্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন বৈধকরণ কৌশল হলো স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা এবং আদিবাসী মুসলিম জনগণের রাজনৈতিক শক্তিকে হ্রাস করার জন্য জনসংখ্যাতাত্তি¡ক এবং রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপের পরিবর্তন, যা পশ্চিমতীরে পাঁচ লাখেরও বেশি ইসরাইলি নাগরিকের বসবাস নিশ্চিত করে। ইসরাইলি সামরিক প্রশাসন ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য ফিলিস্তিনিদের বসতবাড়ি ও চাষযোগ্য জমিকে ‘রাষ্ট্রীয় ভূমি’ হিসেবে ঘোষণা অথবা ‘সামরিক প্রয়োজন’ রয়েছে- চিহ্নিত করে ছিনিয়ে নিচ্ছে।

কাশ্মিরে ভারতের কৌশল ছিল আকস্মিক ও সাংবিধানিক। ৫ আগস্ট, ২০১৯-এ, সরকার একতরফাভাবে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে, যেটি জম্মু ও কাশ্মিরকে বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা দিয়েছিল। এই সাংবিধানিক সংস্কার ভারতীয় প্রশাসনে বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০১৯ সালে রাজ্যটিকে দু’টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে জম্মু ও কাশ্মির এবং লাদাখ সৃষ্টি করা হয়। এই আইনের ফলে সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে যায় যা দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় ইউনিয়নের সাথে জম্মু ও কাশ্মিরের সম্পর্ক রক্ষা করে আসছিল। এসব ব্যবস্থার পক্ষে বিচার বিভাগীয় বৈধতা নেয়া হয় যা ইসরাইলি নিয়মিতকরণ আইনের বিপরীত। আবাসিক আইন ও সীমানা পুনর্বিন্যাস ভারতের কৌশলটি অ-কাশ্মিরিদের বসতি স্থাপনের সুবিধার্থে আবাসিক এবং ভূমি মালিকানা আইন পরিবর্তন করে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জম্মু অঞ্চলের পক্ষে রাজনৈতিক মানচিত্র নতুনভাবে প্রকাশের পদক্ষেপ নেয়। ২০২২ সালে আবাসিক বিধি এবং পরবর্তী ভূমি আইন সংশোধনের ফলে অনাবাসীদের জমি কেনা এবং সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার পূর্ববর্তী বিধিনিষেধগুলো তুলে নেয়া হয়। ২০২২ সালে সীমানা পুনর্নির্ধারণ কমিশন নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণ করার সময়, জম্মু অঞ্চলে (হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ) আসনের সংখ্যা ছয়টি বৃদ্ধি করে। কিন্তু মুসলমানদের বৃহত্তর জনসংখ্যা থাকা সত্তে¡ও কাশ্মির উপত্যকায় মাত্র একটি আসন বাড়ানো হয়। এই পদক্ষেপ নেয়া হয় মুসলিম জনগণকে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করা এবং ক্ষমতাসীন দলের জন্য অনুকূল নির্বাচনী ফলাফল নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে।

এই দখলদারত্ব মারাত্মক অর্থনৈতিক ও জনতাত্তি¡ক ক্ষতি সাধন করেছে। পশ্চিমতীরে ইসরাইল এবং কাশ্মিরে ভারত কর্তৃক অনুসৃত বৈধকরণ কৌশলগুলো, যদিও তাদের আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও, কার্যত একই এবং একই দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে পরিচালিত। উভয় ভূ-খণ্ডের অর্থনৈতিক প্রভাব স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন পদ্ধতিগতভাবে ভেঙে ফেলা এবং কেন্দ্রীয় শক্তির উপর কাঠামোগত নির্ভরতা তৈরির বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপন এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণের ফলে ফিলিস্তিনি অর্থনীতির স্বাধীন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে সীমিত হয়েছে।

টঘঈঞঅউ-এর মতে, পশ্চিমতীরের অর্থনীতি ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আনুমানিক ৬৮ শতাংশ বড় হতো যদি দখলদারির সীমাবদ্ধতা না থাকত। সা¤প্রতিক সঙ্কট দুই দশকেরও বেশি সময়ের উন্নয়নের অর্জন মুছে দিয়েছে। একইভাবে, কাশ্মিরে, ২০১৯ সালে বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহারের পরে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়। অনুমান করা হয়, ৫৩০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে এবং কমপক্ষে এক লাখ মুসলিম চাকরি হারিয়েছে। উদ্যানপালন ও হস্তশিল্পের মতো ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক মূল ভিত্তিগুলো টার্গেট করা হয়েছে প্রশাসনিক বাধা এবং অস্থানীয় প্রতিযোগিতার প্রবর্তনের মাধ্যমে। এই অঞ্চলের বিশাল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্থানীয় বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়মিত ঘটনা। স্থানীয়দের ব্যবসায় এবং কৃষকদের বাস্তুচ্যুত করার হুমকিতে স্থানীয়রা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।

ইসরাইলে কৌশলগত অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে বসতি স্থাপন বিশ্বব্যাপী ধিকৃত হয়েছে। কাশ্মিরে, কৌশলটি ইতোমধ্যে অস্থানীয়দের হাজার হাজার আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা এবং তাদের জমি কেনা ও সরকারি চাকরির অধিকার দিয়েছে।

পশ্চিমতীর এবং কাশ্মিরে বৈধকরণ কৌশলগুলোর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক এবং জনসংখ্যাতাত্তি¡ক পরিণতি গভীর এবং পারস্পরিক সম্পর্ক জোরালো। এসব নীতি অর্থনৈতিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী নির্ভরতার অবস্থা তৈরি করে, যেখানে স্থানীয় সম্পদ বিচ্ছিন্ন হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঠামোগতভাবে সীমাবদ্ধ থাকে। জনসংখ্যাগতভাবে, কৌশলগুলো একই সাথে রাজনৈতিক এবং স্থানীয় আদিবাসী মুসলিম স¤প্রদায়কে প্রান্তিক করার উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছে।

উভয় ক্ষেত্রেই বিশ্ব ও জাতিসঙ্ঘ নিষ্ক্রিয়ভাবে তাকিয়ে আছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যানস যখন শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ইসরাইলে ছিলেন তখনই সংসদীয় ভোট অনুষ্ঠিত হয়। মজার ব্যাপার হলো, নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টি ইসরাইলি গণমাধ্যমে এই বিলের বিরোধিতা করেছে। অনেকের কাছে, এটি রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রতি ইসরাইলের প্রতিশ্রুতি হিসেবে মনে করেন, তবে এই রাজনৈতিক স্ট্যান্ট আসলে বিশ্বকে বোকা বানানোর চেষ্টা। পশ্চিমতীরের সংযুক্তি ছিল নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান আকর্ষণ। সেটি মানুষ এত তাড়াতাড়ি ভুলবে না। এই বিষয়টি উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন আদায় এবং বৃহত্তর ইসরাইলের এজেন্ডার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। পশ্চিমতীরের সংযুক্তির ধারণার বর্তমান বিরোধিতা নেতানিয়াহু-ট্রাম্পের সম্পর্কের প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়।

পশ্চিমতীরের সংযুক্তি ইসরাইলি সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতিতে পরিণত হওয়ার আগে এটি কেবল সময়ের ব্যাপার। যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইল যেমন গাজায় বিমান হামলা চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করেই যাচ্ছে, তেমনই পশ্চিমতীর সংযুক্তির বিরোধিতাও আসলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূল করার রাজনৈতিক আচ্ছাদনমাত্র।

জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ অসংখ্য প্রস্তাব জারি করেছে যাতে অবৈধ দখলদারত্ব এবং বন্দোবস্ত উদ্যোগ স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়। ১৯৬৭ সালের ২৪২ এর মতো রেজুলিউশনগুলো ‘শান্তির জন্য ভূমি’ নীতি এবং দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইসরাইলি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করেছিল। সা¤প্রতিককালে, ২০১৬ রেজুলিউশন ২৩৩৪ স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছে যে, বসতি স্থাপনের কোনো আইনি বৈধতা নেই এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রাথমিক বাধা হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগ, যা ঐতিহাসিকভাবে ইসরাইলের সমালোচনামূলক রেজুলিউশনগুলো রুদ্ধ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। নিরাপত্তা পরিষদের বাধ্যতামূলক পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমাবদ্ধ করে। ২৩৩৪ ধারা একটি বিরল ব্যতিক্রম, কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকার কারণেই পাস হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা পরিষদ দখলদার বা নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে ব্যর্থ হয়।

জম্মু ও কাশ্মিরে এই প্রস্তাবগুলো আইনগতভাবে স্পষ্ট কিন্তু রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার