জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে কেবল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নয়; বরং একটি নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। দলটি এখানে যে ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকার করেছে, তার ভিত্তি হিসেবে সুশাসন, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ন্যায়সঙ্গত উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ— অর্থনীতি এখানে উদ্দেশ্য নয়; বরং মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার একটি মাধ্যম।
বাংলাদেশের কৃষিনীতি দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হলেও বাস্তবে তা অধিকাংশ সময় শিল্পায়ন ও নগরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির ছায়ায় থেকেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খাদ্য উৎপাদনে সাফল্য থাকলেও কৃষকের আয়, গ্রামীণ দারিদ্র্য, বাজারের অস্থিরতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নীতিনির্ধারণে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের প্রস্তাবিত কৃষিনীতি বর্তমান নীতির সাথে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য তৈরি করে, যেখানে কৃষিকে কেবল উৎপাদন খাত নয়; বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনী ইশতেহার সাধারণত প্রতিশ্রুতির তালিকা হিসেবেই দেখা হয় যেখানে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান কিংবা দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বারবার উচ্চারিত হলেও সেগুলোর নৈতিক ভিত্তি, কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তব সমাজে তার প্রভাব নিয়ে গভীর আলোচনা তুলনামূলকভাবে কমই হয়। এই প্রেক্ষাপটে ‘চলো এক সাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে প্রকাশিত জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার অর্থনীতি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে কেবল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নয়; বরং একটি নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার অবিচ্ছেদ্য স্তম্ভ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।
সুদমুক্ত ও নৈতিক অর্থনীতি : বিকল্প অনুসন্ধান
জামায়াতের অর্থনৈতিক দর্শনের প্রথম ও সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো সুদনির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দলটির দৃষ্টিতে, আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি মূলত সুদের ওপর দাঁড়িয়ে এমন এক কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে পুঁজি নিজেই পুঁজি উৎপাদন করে বাস্তব উৎপাদন, শ্রম বা সামাজিক প্রয়োজনের সাথে যার সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটে, আয়বৈষম্য বাড়ে এবং দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতার বিপরীতে জামায়াত সুদমুক্ত ও নৈতিক অর্থনীতিকে একটি বিকল্প পথ হিসেবে তুলে ধরেছে। এখানে ইসলামী ব্যাংকিং ও বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থাকে কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের অংশ হিসেবে নয়; বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দলটির মতে, মুনাফাভিত্তিক অংশীদারত্ব, ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং বাস্তব উৎপাদনের সাথে অর্থায়নের সংযোগ অর্থনীতিকে আরো স্থিতিশীল ও মানবিক করে তোলে। ইশতেহারে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও এর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তাও যুক্ত রয়েছে— ব্যাংকিং ব্যবস্থা যেন কেবল বড় শিল্পগোষ্ঠী বা প্রভাবশালী শ্রেণীর জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও নতুন ব্যবসায়ীদের জন্য সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ‘চলো এক সাথে’ ধারণার সাথে সরাসরি সংযুক্ত, যেখানে উন্নয়ন একক কোনো গোষ্ঠীর নয়; বরং পুরো সমাজের অংশগ্রহণে পরিচালিত হবে।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও এসএমই
জামায়াতের ইশতেহারে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও এসএমই খাতকে অর্থনীতির প্রান্তিক উপাদান নয়; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই খাতটি নীতিগত অবহেলা, উচ্চ সুদ, জটিল ব্যাংকিং প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক দুর্নীতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত। ইশতেহারে এই খাতের জন্য সহজ অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা ও বাজারে প্রবেশাধিকারের কথা বলা হয়েছে। দলটির যুক্তি হলো— যদি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা টিকে থাকে ও বিকশিত হয়, তা হলে কর্মসংস্থান স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছবে। এটি এমন এক উন্নয়ন মডেল, যেখানে বড় শিল্পের পাশাপাশি ছোট উদ্যোগও সমান গুরুত্ব পায়।
সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন : উন্নয়নের নৈতিক মানদণ্ড
জামায়াতের অর্থনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ হলো সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের ধারণা, যা দলটির মতে উন্নয়নের প্রকৃত নৈতিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে। ইশতেহারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে— উন্নয়ন তখনই অর্থবহ ও টেকসই হয় যখন তার সুফল সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছায়। কেবল বড় অবকাঠামো প্রকল্প, উচ্চ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান কিংবা শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন যদি দরিদ্র, কৃষক ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর জীবনকে আরো অনিশ্চিত করে তোলে, তবে সেই উন্নয়ন মানবিক নয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। এই অবস্থান থেকে একটি মৌলিক নৈতিক প্রশ্ন উঠে আসে, অর্থনীতি কার জন্য? জামায়াত এই প্রশ্নের উত্তরে অর্থনীতিকে মানুষের কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায়, যেখানে পুঁজি ও বাজার মানুষের প্রয়োজনের অধীন থাকবে, মানুষ বাজারের অধীন হবে না। ইশতেহারে অর্থনৈতিক ন্যায়সঙ্গত উন্নয়নকে সরাসরি সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। এখানে রাষ্ট্রকে কেবল বাজারের নিয়ন্ত্রক নয়; বরং সামাজিক ভারসাম্যের রক্ষক হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টনের মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস, মধ্যবিত্তের স্থিতিশীলতা ও শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সামাজিক স্থিতিশীলতা সুদৃঢ় হয়। ফলে এটি কেবল একটি অর্থনৈতিক নীতি নয়; বরং ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ’ গড়ার একটি বিস্তৃত রাষ্ট্রীয় কৌশল।
কর্মসংস্থান ও শিল্পায়ন : মানুষের জন্য অর্থনীতি
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের প্রশ্নটি কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে নয়; বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ শক্তিকে যদি উৎপাদনশীল কর্মে যুক্ত করা না যায়, তবে তা হতাশা, সামাজিক অস্থিরতা ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার জন্ম দিতে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে ইশতেহারে যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। তবে কর্মসংস্থানকে এখানে কেবল সংখ্যার বিচারে মূল্যায়ন করা হয়নি; বরং মর্যাদাপূর্ণ জীবিকার ধারণার সাথে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে শ্রমিক অধিকার, ন্যায্য পারিশ্রমিক, কাজের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনীতিকে মানুষের প্রয়োজন ও মর্যাদার অধীন করার একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থানকে প্রতিফলিত করে। একই সাথে জামায়াতে ইসলামী শ্রমঘন শিল্পে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত। তুলনামূলকভাবে কম পুঁজিতে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতার কারণে এই খাতকে দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে। ইশতেহারে স্পষ্ট করা হয়েছে— শিল্পায়ন যদি কেবল মুনাফাকেন্দ্রিক হয়, তবে তা বৈষম্য বাড়াতে পারে; কিন্তু শ্রমঘন শিল্পের বিকাশ বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত করে উন্নয়নের সুফল বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে। কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের এই নীতির সাথে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণের বিষয়টিও যুক্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা উপেক্ষিত থেকেছে। ইশতেহারে তাদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে ভৌগোলিক সীমার বাইরে বিস্তৃত করেছে, যা ‘চলো এক সাথে গড়ি বাংলাদেশ’ স্লোগানকে একটি মানবিক ও আন্তর্জাতিক মাত্রা প্রদান করে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি : রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড পুনরুদ্ধার
জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে ‘রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড’ আখ্যা দেয়া নিছক প্রতীকী উচ্চারণ নয়। এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন দর্শনে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জিডিপির হিসাবে কৃষির সরাসরি অবদান তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেলেও সামাজিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবনের টিকে থাকার ক্ষেত্রে কৃষির ভূমিকা আজও মৌলিক। দলটির মতে, কৃষিকে উপেক্ষা করে গৃহীত নগর ও শিল্পকেন্দ্রিক উন্নয়ন কৌশল শহর-গ্রাম বৈষম্য বাড়িয়েছে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে কৃষিকে পুনরায় রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে স্থাপন করা জরুরি। ইশতেহারে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি সেই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, যেখানে কৃষকের আয় বৃদ্ধি কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণের বিষয় নয়; বরং গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার মৌলিক শর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
সার, বীজ ও সেচে ভর্তুকিকে ব্যয় নয়; বরং একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়েছে, কারণ উৎপাদন ব্যয় কমানো ছাড়া কৃষিকে লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করা সম্ভব নয়। কৃষক ঋণ সহজীকরণের প্রস্তাবও এই কাঠামোর সাথে যুক্ত। মহাজনি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা গ্রামীণ দারিদ্র্যের প্রধান কারণ হওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সহজ শর্তের ঋণব্যবস্থা কৃষিকে উৎপাদনশীল অর্থনীতির সাথে সংযুক্ত করতে পারে। ইশতেহারে খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকসইভাবে নিরাপদ হতে পারে না।
অর্থনীতি উন্নয়ন ও মানবিক রাষ্ট্রচিন্তা
জামায়াতের অর্থনৈতিক ও কৃষিনীতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এটি কেবল প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়নের সংখ্যাগত নকশা নয়; বরং একটি বিস্তৃত নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশ। এখানে অর্থনীতি কোনো স্বতন্ত্র বা নিরপেক্ষ ক্ষেত্র নয়; বরং মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমষ্টিগত নিরাপত্তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত শাসনব্যবস্থা।
ইশতেহারে উন্নয়নকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যেখানে মানুষের জীবিকা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা রাষ্ট্রীয় নীতির কেন্দ্রে অবস্থান করে। সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্গঠন— সব মিলিয়ে এটি এমন একটি উন্নয়ন দর্শনের ইঙ্গিত দেয়, যা শহরকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির বাইরে গিয়ে সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকেও উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়।
সবশেষে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার কেবল একটি বিকল্প অর্থনৈতিক বা নীতিগত প্রস্তাব হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা নাগরিকের বিবেক ও দায়িত্ববোধের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে। যখন অর্থনীতিকে মানুষের মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে সংযুক্ত করে একটি নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়, তখন তার বাস্তবায়নের প্রশ্ন অবধারিতভাবে ভোটারের সিদ্ধান্তের সাথে মিলিত হয়, কারণ নীতিগত কাঠামো যতই সুসংহত হোক, তার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় জনগণ কোন রাজনৈতিক বন্দোবস্তকে বৈধতা দেয় তার মাধ্যমে। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে তাই ভোট আর নিছক একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক দিকনির্দেশ নির্ধারণের মাধ্যম যার মাধ্যমে মানুষ শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন করে না; বরং কোন ধরনের অর্থনীতি, কোন ধরনের রাষ্ট্র এবং কোন ধরনের সামাজিক চুক্তিকে সে গ্রহণযোগ্য মনে করে, তাও ঘোষণা করে। এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি আর বিমূর্ত নয়, এই ভোট কি আজাদির পথে যাবে, নাকি পুরনো বন্দোবস্তকে নতুন নামে আবারো বৈধতা দেবে?
যখন সাময়িক সুবিধা, ভয় কিংবা অর্থ বিবেককে পরাজিত করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন ভোটার নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তা, যার ভিত্তিতে একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে ওঠার কথা। জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণের মধ্যে যে বোধ জাগ্রত হয়েছে, ভোট বিক্রি মানে নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে ঝুঁকির মুখে ফেলা, সেটিই এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তন। পুরনো বন্দোবস্ত ভেঙে পড়লেও নতুন বন্দোবস্ত নির্মাণের কাজ এখনো অসম্পূর্ণ, আর সেই দায় আজ সরাসরি জনগণের কাঁধে। ফলে রাষ্ট্রের ক্ষমতা কার হাতে যাবে, রাজনীতির চরিত্র কোন পথে মোড় নেবে এবং শাসনের নৈতিক ভিত্তি কী হবে— এসব প্রশ্নের উত্তর কোনো স্লোগান বা তাৎক্ষণিক আবেগে নয়; বরং নীরব, সচেতন ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, সানওয়ে ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া



