শরীর ভাড়া হয়ে গেছে, মগজ বন্ধক

রাতারাতি সব বদলে দেয়া যাবে না। ধীরে ধীরে এগোতে হবে। আসুন আমি আপনি সবাই মিলে একযোগে এগোতে থাকি। পথ তৈরি করে এগোতে থাকি। এ তৎপরতা সহজ হবে না। তবে দুর্জয় নয়।

শরীর ভাড়া দেবেন- এমন প্রশ্ন শুনলে আপনি কি রেগে উঠবেন। আর আপনি যদি নারী হন তা হলে থাকিতে চরণ মরণে কি ভয় স্মরণ করে ছুটে পালানোর রাস্তা খুঁজতে হবে। শরীর ভাড়া দেয়ার সভ্য কোনো মানে নেই।

সজ্ঞানে শরীর ভাড়া দেন বা না দেন, তেড়ে আসুন কিংবা ধীরে এসে ফেটে পড়ুন। কিছুই যায়-আসে না। একটু খেয়াল করে দেখুন। আমার আপনার শরীরের দখল চলে গেছে পুঁজিকর্তাদের হাতে। লি লেভিস, অ্যাডিডাস, পুমাসহ রকমারি দামি ব্র্যান্ডের পণ্য তার ব্যবহারকারীদের কৌশলগত স্থানে নিজ ব্র্যান্ডের নামটি শোভনীয় করে রেখেছে। ক্রীড়া-পোশাক কিনলে সে নামটি আপনার বক্ষদেশেই স্থান করে নেবে। প্যান্ট হলে পশ্চাৎদেশে হবে তার স্থান।

নামীদামি পণ্যের প্রসার বাড়ানোর ধান্দায় পণ্য-দূত বা ব্র্যান্ড-অ্যাম্বাসেডর পোষেণ ব্যবসাদাররা। মোটা মাসোহারার বিনিময়ে তাকে ওই ব্যবসায়ী সংস্থার পণ্যেই ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু আপনি আমার মতো সাধারণজন, বা অতিশয় সাধারণজন যারা তাদের পণ্য-দূত হওয়ার চকমকে মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ নেই। পত্রপাঠই তারা আমাদের বিদায় করে দেবে। হয়তো পত্রপাঠই করবে না। পণ্য-দূত হওয়ার জন্য কোনো বিজ্ঞাপন তো দেয় না। ওই কাজ তলে তলে সারে। ‘সেলিব্রেটি’ বা ‘সেলিব্রেটারদের’ পুঁজিওয়ালারা কিভাবে বেছে নেন জানি না। কাজেই ইচ্ছে বা লোভ থাকলেও ও দরজা খোলার চিচিংফাঁক মন্ত্র অজানা ও অধরাই রয়ে যাবে আজীবন।

কিন্তু তারপরও আমার শরীর রক্ষা পাবে না। গোচরে বা অগোচরে তাদের ভাড়া খাটতে হবে। দেহজীবী না হয়েও শরীরকে রক্ষা করতে পারছি না। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। দর্পণে নিজেকে দেখুন আরেকবার। অন্তর্বাস থেকে বহির্বাস, জুতা থেকে জাঙ্গিয়া বা লেহাংগা থেকে সালোয়ার কামিজ, বোরকা থেকে নিকাব- যাই পরুন দেখবেন বিক্রেতার লোগো বা নাম এমনভাবে বসানো আছে যে, তা অনায়াসেই দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে। আমার পোশাকে আমাকে প্রকাশ করা যাচ্ছে না। আমার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে ব্যবসায় চতুর অতিচালক কিছু সংস্থা! পুরনো কবিতা ঘুরিয়ে বলতে পারে, ‘তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করো আমার দেহ মাঝে!’

তারপরও কিছু কিছু মানুষ থাকেন। চিন্তায় কর্মে সচেতন। বহু বছর আগে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই হবে হয়তো। ঢাকায় সাড়া তুলে ফেলল জিন্স প্যান্ট তৈরি করে ইব্রাহিম নামে এক দর্জিঘর। আমাদের এক সিনিয়র বন্ধু তার প্যান্ট নিতে গিয়ে বলল, ভাই বানানোর কোনো টাকা দেবো না; বরং আপনারা আমাকে ভাড়া বাবদ টাকা দেয়ার ব্যবস্থা করেন।

-কেন? ঢোঁক গিলে অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন মালিক বা ম্যানেজার। প্যান্টটাকে আছড়ে ফেলল তার সামনে। আঙুল উঁচিয়ে বলল, দেখুন আমার পশ্চাৎদেশে বিশাল করে বিজ্ঞাপন লাগিয়েছেন।

-স্যার ওটা তো স্টিকার। জানেন...

-ওই সব জানেনের গল্প বাদ দিন। আগে ওই স্টিকার নামের বিজ্ঞাপন কেটে সরান, তারপর বানানোর টাকার কথায় আসেন। তার মারমূর্তি দেখে ঢোঁড়া সাপের মতোই নিরীহভাবে হুকুম তামিল করলেন সে ব্যক্তি।

ইরানে পোশাকের নামজাদা প্রতিষ্ঠান ‘হাকুপিয়ান।’ বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মহোদয় একটি কোট কেনেন। রাষ্ট্রদূতের পরিচয় জানার পর প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি তড়িঘড়ি ভিআইপিদের জন্য বরাদ্দ একটি স্টিকার সাঁটতে চাইলেন। তার আগে, চিনতে না পারার জন্য একাধিকবার ‘বেবাককশিত’ ‘বেবাকশিত’ (মানে, মাফ চাই) করে নেন। কিন্তু রাষ্ট্রদূত মহোদয় তাকে থামিয়ে দেন। বলেন, একজন রাষ্ট্রদূতের পোশাকে স্টিকার বসাতে চাইলে মোটা অঙ্কের ‘পুল’ (টাকা) দিতে হবে। কারণ তার শরীরটি অন্যদের তুলনায় দামি! ভদ্রলোক ভড়কে গিয়েছিলেন। অন্যেরা এ ক্ষেত্রে আগ্রহভরে এগিয়ে আসে। কিন্তু এমন কথা কোনোকালেই শোনেননি কেউ।

সখের ব্র্যান্ডের শার্ট, জুতা বা টি-শার্ট কিংবা প্যান্ট থেকে লোগো হটিয়ে দেয়ার অবকাশ থাকলেও কয়জনই বা সে অবকাশ ব্যবহার করার মানসিক সক্ষমতা রাখেন! জরিপ চালাতে হবে না। ফলাফল বাতাস দেখেই আঁচ করা যায়।

ব্র্যান্ড মানে উত্তম পণ্য? ইংল্যান্ডের ট্যাবলয়েড দৈনিক মেইল কয়েক বছর আগে এ নিয়ে খবরে করেছে। বাজার থেকে নামীদামি ব্র্যান্ডের জিন্স প্যান্ট এবং ফুটপাথে বিক্রি করা অনামি সস্তা প্যান্ট কিনেছে। তারপর দুটোরই পরিচয় চিহ্ন নিখুঁতভাবে সরিয়ে নিয়ে বস্ত্র বিশেষজ্ঞদের দিয়েছে গুণাগুণ পরীক্ষা করতে। গুণে মানে দু’জাতের বস্ত্রই কাছাকাছি রয়েছে। যদিও দামে তাদের মধ্যে ফারাক আকাশ-পাতাল।

বাংলাদেশের একটি বিখ্যাত পাদুকা প্রস্তুতকারী বিদেশী কোম্পানি পুরান ঢাকা থেকে জুতা তৈরি করে তারপর নিজেদের স্টিকার মেরে চড়া দামে বিক্রি করে বা করত। সে কাহিনীর সাথে আমরা কমবেশি পরিচিত। ওই একই জুতা নির্মাতারা সস্তায় দিলেও লোকে নিতে চায় না। মান নিয়ে খুঁত খুঁত করে! কিন্তু লোগোর জাদুতে গুণে না বাড়লেও দামে সরসর করে বেড়ে যায়!

ব্র্যান্ড মোটেও সেরা পণ্য দেয় না। বানায় না বা বিক্রি করে না। তারা আমাদের অহংবোধকে সুড়সুড়ি দেয়। তাকে তুঙ্গে তুলে ধরে। নিউইয়র্কের কোটিপতিদের দোকান নাকি আছে। আগে সময় না নিয়ে ওসব দোকানে ঢোকা যাবে না।

রাম-রহিমের কাছে তারা পণ্য বিক্রিতে লালায়িত নয়। ধনকুবেরদের জগতে অপরিপূর্ণতা নেই। সবই আছে তাদের। তা হলে তাদের কাছে কি বিক্রি করে জানতে চাওয়া হলে দোকানির জবাব ছিল- আমরা তাদের কাছে অহংবোধ বিক্রি করি, পণ্য নয়! উদাহরণ দিলেন, এই যেমন এক ধনশালী নারীকে তার বৃক্কের পাথর বসিয়ে প্লাটিনামের আঙটি বানিয়ে দিয়েছি ব্যাপক খরচে। খায়েশ হলেই এমন আঙটি কেউ বানাতে বা কিনতে পারবে না।

আমাদের মগজ অনেকে আগেই বন্ধক পড়ে গেছে। ফেসবুক কহেন বা ইন্সটাগ্রাম কহেন- কথিত সামাজিক মাধ্যম অনেক আগেই মগজ দখল করে নিয়েছে। আপনার যা পছন্দ তাই দেখাবে। গাণিতিক প্রক্রিয়ায় আপনার পছন্দ নির্ভুলভাবে বের করে নেয়। এর নাম অ্যালগরিদম। এ ছাড়া আপনার বা আমার স্বভাবের ডেটা বা ডাটা হাতড়ে তারা নানাভাবে ‘ইলিশ’ খায়। লাভের ওপর লাভ করে। আমি বোধ হয় একবারো ভাবি না, মাগনা দিচ্ছে মানে আমিই পণ্য!

‘আইভাই’ অর্থাৎ এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মাগনা ব্যবহারে পুলকিত হচ্ছি; বরং এখানে আমাকেই ব্যবহার করছে এআই। আমাকে ব্যবহার করে তার ‘জ্ঞান’ বাড়ছে দিনকে দিন। সে ফুলে উঠছে জ্ঞানে। আর আমাকে নির্ভর করে তুলছে তার ওপর। এ ভাবে চলতে থাকলে একদিন সবাই প্রম্পটজীবী হয়ে যাবো। এআইকে প্রশ্ন করাকে প্রম্পট বলা হয়। সে কথা সবারই জানা আছে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে হয়তো চিকিৎসাজীবী, বুদ্ধিজীবী, অনুবাদজীবী, আইনজীবী বলে আর কিছু থাকবে না। থাকবে কেবল প্রম্পটজীবী। আপনি যত লাগসই প্রশ্ন করতে পারবেন ততই ঠিক কাজটি করিয়ে নিতে পারবেন। বা জানবেন কাজটি কিভাবে করতে হবে!

মোবাইল নিয়ে মশকরাটি সবাই দেখেছেন। বলা হচ্ছে, এ মোবাইল বেতার যন্ত্র, গান শোনার যন্ত্র, টিভি, ছবি এবং চলচ্চিত্র ধারণের যন্ত্র সব কিছুর ভাত মেরেছে। ভবিষ্যতে নাকি এমন শক্তিশালী পাসপোর্ট তার ভাত মারবে মোবাইল। এমনভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপটে আমাদের লেখাপড়ার কাজকেও মেরে দেবে!

বেশ কিছু দিন আগে চ্যাটজিটিপিকে বলেছিলাম, তুমি আমার কাছ থেকে শিখছ। সে স্বীকার করেছে। তারপর বললাম তা হলে গৃহশিক্ষক হিসেবে আমাকে টাকা দাও। এ দাবিকে চ্যাটবাবু যৌক্তিক বলে স্বীকার করে নিলো। তবে জানাল, টাকা দেয়ার ক্ষমতা তার নেই। কখনো সুযোগ দেয়া হলে আমার দাবির কথা তার নির্মাতাদের বলবে! প্রায় একই কথা বলেছে গোগুলো জেমিনি, এক্সেরক গোর্ক, চীনের ডিপসিক, মাইক্রোসফটের কোপাইলট।

আসলে সে শিকা কখনোই ভাগ্যে ছিঁড়বে না। কিন্তু তার আগের কথা আমার শরীরকে কিভাবে ‘অবৈধ’ ভাড়ামুক্ত করতে পারি? বা দখলকৃত মগজকে নিজের জিম্মায় ফিরিয়ে আনতে পারি! ভাবছি কিন্তু সহজ কোনো কূলের দেখা মিলছে না। বারবার মনে হচ্ছে দুর্গমগিরি কান্তর মরু দুস্তর পারাপার..!

রাতারাতি সব বদলে দেয়া যাবে না। ধীরে ধীরে এগোতে হবে। আসুন আমি আপনি সবাই মিলে একযোগে এগোতে থাকি। পথ তৈরি করে এগোতে থাকি। এ তৎপরতা সহজ হবে না। তবে দুর্জয় নয়।