ঈদযাত্রায় বিশৃঙ্খলার সেই পুরনো চিত্র

যানজটের সেই অসহনীয় পুরনো চিত্র এখনো বিদ্যমান। কর্তৃপক্ষ একটু সচেতন হলে এগুলো এড়ানো যায়। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি উৎসব পালিত হয়। মহাতীর্থ অষ্টমী স্নানোৎসব ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পুণ্যার্থীরা জমায়েত হন। এবার সেটি ঈদযাত্রার ভরা মৌসুমে ২৫ ও ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে

রেল, নৌ ও সড়ক— যাতায়াতে ঈদযাত্রায় বিশৃঙ্খলার সেই পুরনো চিত্রই দেখা গেল। সব পথে দুর্ঘটনায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। কিছু দুর্ঘটনা পূর্বপ্রস্তুতি ও সতর্কতার অভাবে ঘটেছে। রেল ও নৌপথের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল। রেলের বগি লাইনচ্যুত হওয়া এবং আগুন ধরার মতো ঘটনাগুলো গাফিলতির কারণে ঘটেছে। ফেরিতে উঠতে গিয়ে বাস ডুবে গণহারে যাত্রীর প্রাণহানি স্রেফ অব্যবস্থাপনার বিষফল।

ঈদুল ফিতর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় উৎসব। সারা দেশ থেকে মানুষ নাড়ির টানে বাড়ি ফেরে। কিছু মানুষের জন্য এটা হয়ে থাকে অন্তিম যাত্রা। প্রতি বছর নির্দিষ্টসংখ্যক হতভাগা এতে কেবল একটি সংখ্যা হিসেবে যোগ হন। উৎসবের মৌসুমে প্রতি বছর এমন প্রাণহানি আমরা স্বাভাবিক মেনে নিয়েছি।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির যে বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে নানা পক্ষের অবহেলার বিষয়টি পরিষ্কার। ওই সময়ে বাসটি পন্টুনে ওঠার কথা নয়। নিয়ম না মেনে চালক হুড়মুড় করে ঝুঁকি উপেক্ষা করে পন্টুনে ওঠেন। দুর্ঘটনা ঘটানোর পর নিয়ম না পালনের অভিযোগে বাসটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। অথচ ফিটনেস না থাকায় আরো আগেই বাসটি রাস্তায় চলার উপযোগিতা হারিয়েছিল। যথাসময়ে ফিটনেস যাচাই হলে এটি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে, সেই আলামত পাওয়া যেত। বাসটির নিবন্ধন স্থগিত বা বাতিলের কাজ সময়মতো করা গেলে দুর্ঘটনা হয়তো এড়ানো যেত। চালকের দক্ষতা ও নিবন্ধন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বাস্তবে কাজটি সড়ক কর্তৃপক্ষের আগে করা উচিত ছিল। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ চালকের অদক্ষতা, গাফিলতি ও নিয়ম-কানুন না মানা। এগুলোর জন্য চালকদের জবাদিহি নেই। টাকা দিলে সড়কে তাদের সাত খুন মাফ।

ফেরিঘাটে যেখানে ফেরি পন্টুনের সাথে এসে মিলিত হয়, এটি দুর্ঘটনাপ্রবণ। এ জন্য পন্টুনের ফিটনেস ও সুরক্ষিত নিরাপত্তা বলয় দরকার। পন্টুনটির রেলিং ছিল না। ফলে বাসটি পেছন থেকে ধাক্কা খেয়ে এক ঝটকায় পানিতে পড়ে। ফেরিতে উঠতে গিয়ে যানবাহন পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ফেরি চলাচলের জায়গায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এখন সেতু নির্মাণ হয়েছে। সে কারণে আগের মতো দুর্ঘটনা ঘটে না। তারপরও নদীতে বাস ডুবে এবারের ঈদে যেভাবে বেঘোরে কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ হারালেন, তা মেনে নেয়া যায় না। বরাবর যেমন হয়ে থাকে, এবারো দুটো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। একটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে; অন্যটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে। অতীতে লঞ্চডুবিতে একই ধরনের তদন্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির সংখ্যা বেশি হওয়ায় গুরুত্ব বিবেচনা করে দুইয়ের অধিক তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। ঘটনার ভয়াবহতা ও জনক্ষোভ প্রশমন করতে এগুলো করা হয়। সরকার এ সময় নিজেকে করিৎকর্মা ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন দেখাতে চায়। তদন্তের উদ্যোগ প্রধানত জনদৃষ্টি ঘোরাতে ব্যবহার করা হয়।

এসব তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার জন্য প্রকৃত দায়ীদের বের করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কী পরামর্শ দেয়, তা খুব কম ক্ষেত্রে জানা যায়। কিছু দিন যেতে না যেতে প্রতিটি দুর্ঘটনা মানুষ ভুলে যায়। এ নীরবতার সুযোগে কর্তৃপক্ষ প্রতিকারে খুব বেশি দায় বোধ করে না। তাই নতুন করে আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটা পর্যন্ত সুনসান নীরবতা বজায় থাকে। তদন্ত কমিটি যদিও কিছু পরামর্শ দিয়ে থাকে, তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন হয় না। দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। ঘটনার পূর্বাপার বিশ্লেষণে পরিষ্কার বোঝা যায়, ঘটে যাওয়া বেশির ভাগ দুর্ঘটনা প্রতিরোধযোগ্য ছিল।

আরেকটি পরিহাস হলো— যখন মানুষের জীবন অর্থের অঙ্কে হিসাব করা হয়। দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো প্রত্যেক ব্যক্তির পরিবারকে কিছু টাকা দেয়া হয়। যারা আহত হন তাদেরও কিছু অনুদান দেয়া হয়। নিহত ব্যক্তির পরিবার ও আহতের প্রাপ্ত অর্থের মধ্যে কয়েক হাজার টাকার পার্থক্য থাকে। এ অর্থ প্রদান আসলে নিহত ব্যক্তির পরিবারের সাথে উপহাসের নামান্তর। দুর্ঘটনার শিকার পরিবারের সাথে বিষয়টি আরো দরদ দিয়ে মোকাবেলা করা উচিত। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের পরিবারের সাথে তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা অনুযায়ী আচরণ করা উচিত। দেখা যাবে, কিছু পরিবারের জন্য নগদ অর্থ কিংবা অন্য সব সাহায্য অপ্রয়োজনীয়। জীবনের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণকে তারা অসম্মানজনক মনে করতে পারে। কিছু পরিবার আছে, যারা হতদরিদ্র। নিহত ব্যক্তিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, পরিবারটির দায়িত্ব কিছু সময়ের জন্য পুরোপুরি বহন করা। দুর্ঘটনার পর সরকার যখন গড়ে সবাইকে টাকার অঙ্কে সাহায্য করে, তা মোটেও শোভন নয়। সময়মতো দায়িত্ব পালন করতে না পারার কাফফারা দিয়ে তারা বাঁচতে চায়।

ঈদের ছুটির শুরুতে বগুড়ার আদমদীঘিতে একটি ট্রেনের ৯টি বগির লাইনচ্যুতি সরকারের প্রস্তুতির অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় ৬৫ জন আহত হয়েছেন। ঈদ উপলক্ষে যেখানে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন ছিল, তা ঘূণাক্ষরেও টের পাওয়া যায়নি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চলন্ত ট্রেনে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনায়। দুটো দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটতে পারত। লাইনচ্যুতির ঘটনায় ঈদের ব্যস্ত সময়ে উত্তরাঞ্চলের সাথে ঢাকার ট্রেন যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটে। ২২ ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকার পর তিনটি বগি উদ্ধার হয়। ট্রেন চলাচল আবার শুরু হয়। তবে বাকি ছয়টি বগি তখনো উদ্ধার করা যায়নি। ওই ঘটনায় সরকার স্টেশন মাস্টার, ট্রেন চালকসহ তিনজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।

গণমাধ্যমের খবর, আদমদীঘিতে ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার মূল কারণ মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বহন। এই ট্রেনে এত যাত্রী উঠেছিলেন যে, ছাদসহ পুরো ট্রেন ঠাসা ছিল। ইঞ্জিনের চার দিকে মানুষ বোঝাই থাকায় ট্রেনচালক সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন না। ওই ট্রেন লাইনে মেরামতের কাজ চলছিল। সে জন্য সতর্কতা হিসেবে লাল পাতাকা টানানো ছিল; কিন্তু তা চালকের চোখ এড়িয়ে যায়। ট্রেনে যাত্রী পরিবহনে যে নিয়ম তা মানা হয়নি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ছিল বেখবর। ভাগ্য ভালো যে, এখানে বড় দুর্ঘটনা ঘটে প্রাণহানি ঘটেনি। ট্রেন দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ যাত্রীদের অসতর্কতা। গত শুক্রবার এ ধরনের এক দুর্ঘটনায় ট্রেনে কাটা পড়েছে শিশুসহ পাঁচজন। প্রাণহানির এই ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত ও বেদনাদায়ক। পাশে দাঁড়ানো একটি বাসের যাত্রীরা সন্ধ্যায় রেললাইনের আশপাশে অলস সময় পার করছিলেন। অনেকে রেললাইনের ওপর অবস্থান নেন। এ সময় একটি দ্রুতগামী ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে তারা প্রাণ হারান। এ জন্য বাসযাত্রীর অসতর্কতা প্রধানত দায়ী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহতের ঘটনা বেড়েছে। এর বেশির ভাগ ঘটছে ট্রেন লাইনে অসাবধান চলাফেরায়। সাথে যুক্ত হয়েছে পথচলার সময় মোবাইলে কথা বলা। মোবাইলে কথা বলায় ট্রেন আসার শব্দ শোনা যায় না। সারা দেশে শত শত লেভেলক্রসিংও দুর্ঘটনার একটি বড় ফাঁদ। প্রায়ই দেখা যায়, বাস-ট্রাক কিংবা অন্যান্য যানবাহন এ ক্রসিংয়ে আটকা পড়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটছে। ঈদের দিন দিবাগত গভীর রাতে কুমিল্লায় রেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় বাসের ১২ যাত্রী নিহত হন।

এবারের ঈদে সড়ক যোগাযোগে ছিল চরম অব্যবস্থাপনা। বাসের টিকিটের মূল্য নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড হয়েছে। টিকিট কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। অন্য দিকে সময়মতো বাস ছাড়েনি। রাস্তায় যানজটও ছিল সারা দেশে কমবেশি। ফলে যাত্রীরা ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। প্রাণহানির ঘটনাও গত বছরের চেয়ে বেশি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, এবার ঈদের ছুটির ১৩ দিনে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩০৯ জন নিহত ও ৯০২ জন আহত হয়েছেন। নিহতের ঘটনা আরো বাড়বে, এতে সন্দেহ নেই।

যানজটের সেই অসহনীয় পুরনো চিত্র এখনো বিদ্যমান। কর্তৃপক্ষ একটু সচেতন হলে এগুলো এড়ানো যায়। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একটি উৎসব পালিত হয়। মহাতীর্থ অষ্টমী স্নানোৎসব ঘিরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পুণ্যার্থীরা জমায়েত হন। এবার সেটি ঈদযাত্রার ভরা মৌসুমে ২৫ ও ২৬ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থেকে কাঁচপুর ব্রিজ পর্যন্ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত মহাসড়ক এটি। এখানে প্রতিনিয়ত ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিষেবা চলাচল করে। স্বাভাবিক সময়ে যাত্রীবাহী বাসের পাশাপাশি ট্রাক-লরিসহ বিভিন্ন ধরনের কাভার্ড ভ্যানে ভর্তি থাকে।

ঈদের একেবারে ব্যস্ত সময়ে এই সড়কে যান চলাচল যখন সর্বোচ্চে পৌঁছে; তখন রাস্তাটি অনেকটা বন্ধ ছিল। এতে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়। অংশটি অতিক্রম করতে তিন-চার ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়েছে। এতে যাত্রীরা অসহনীয় দুর্ভোগে পড়েন। বিশেষ করে শিশু-বৃদ্ধরা গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েন। যেহেতু এ উৎসব প্রতি বছর হয়। প্রশাসন একটু আন্তরিক হলে পুণ্যার্থীদের গাড়ি ও তাদের সমাগম একটি নিয়মের মধ্যে আনতে পারে, যাতে মহাসড়ক মুক্ত থাকে।

এবারের ঈদযাত্রায় তিন শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে। আগামী বছরও অনেকের জন্য ঈদ উৎসব রাস্তায় মরণফাঁদ পেতে রেখেছে। আমরা জানি না, কারা এই হতভাগা। তবে কর্তৃপক্ষ চাইলে আন্তরিক উদ্যোগ নিয়ে পথের দুর্ঘটনার শঙ্কা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। যানজট সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে। নিরাপদ করতে পারে রেল-নৌপথও।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]