নির্বাচন নিয়ে কেন সংশয়

এযাবৎকালে অনুষ্ঠিত ১২টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে আটটি দলীয় সরকারের অধীন এবং চারটি অন্তর্বর্তী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রতিটিতেই ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হয়। অন্য দিকে অন্তর্বর্তী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের প্রতিটিতেই নির্বাচনের অব্যবহিত আগের ক্ষমতাসীনরা পরাজিত হয়। সুতরাং ধারণা করা যায়, দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন হলে ফলাফল কী হবে এবং অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ফলাফল কী দাঁড়াবে

বাংলাদেশ তিন দিকে ভারত-বেষ্টিত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তা পরেও অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারত একসময় সর্বোচ্চ অংশীদার ছিল, বর্তমানে দ্বিতীয় বৃহত্তম। যদিও ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানির তুলনায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি নগণ্য। ভারতের ক্ষমতাসীন সরকার সবসময় চায় বাংলাদেশে যেন তাদের অনুগত রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকে। এ যাবৎকাল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি- এ তিনটি দল ক্ষমতায় ছিল। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি ভারতপন্থী এবং বিএনপি ভারতবিরোধী হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের কোনোটিই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না। এ তিনটি নির্বাচনে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হয়ে ভারতে পলায়ন করেন এবং অদ্যাবধি সেখানে অবস্থান করে বাংলাদেশ বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস নিচ্ছেন।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হয়, তা সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের অনুবলে সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান অনুসৃত পন্থায় শপথ গ্রহণপূর্বক কার্যভার গ্রহণ করে। সে কারণে এ সরকার সংবিধানসম্মত পন্থায় গঠিত হয়নি, এমন বিতর্কের অবকাশ ক্ষীণ।

অন্তর্বর্তী সরকারের মূল কাজ ছিল স্বল্পতম সময়ে এশটি অবাধ, সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের আয়োজন করে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। ১৫ মাস পর নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোট। ইতঃপূর্বে ১৯৯০ ও ২০০৭ সালে কর্মরত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন যে অন্তর্বর্তী সরকার এবং সেনা-সমর্থিত যে অন্তর্বর্তী সরকারের আগমন ঘটে, এর প্রথমটি তিন মাসের মাথায় এবং শেষেরটি দুই বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিদায় নেয়। প্রথম সরকারটি অসাংবিধানিক পন্থায় গঠিত হলেও সংবিধানের একাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এর কার্যকলাপকে বৈধতা দেয়া হয়; এর আগে গণভোটে সরকারের কার্যকলাপের প্রতি সমর্থন আদায় করা হয়। শেষোক্ত সরকারটি তাদের কার্যকলাপ বিষয়ে গণভোটের আয়োজন করেনি এবং পরবর্তী সংসদে এটির কার্যকলাপকে বৈধতা দেয়া হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল-বিষয়ক মামলার আপিল শুনানিকালে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার অবতারণায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যকলাপকে বৈধতা দেয়ার যে প্রয়াস নেয়া হয়, তা কতটুকু আইনানুগ তা বিবেচনার দাবি রাখে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যকলাপকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে আছে। ভারত চায় আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণে অন্তর্ভুক্তিমূলক (ইনক্লুসিভ) নির্বাচন। এ বিষয়ে দেশটির ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে বক্তব্য ও বিবৃতি দেন।

পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের বক্তব্য-বিবৃতি থেকে প্রতীয়মান হয়, তারাও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের পক্ষে। তাদের যুক্তি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হলে এ নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে না।

২০১৫ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান-বিষয়ক যে বিধান তা হলো, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। এর আগে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালে নির্বাচন-বিষয়ক বিধানে বলা ছিল, মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হওয়ায় ধারণা করা যায়, ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান কার্যকর ও বলবৎ হবে। তবে সেটি কার্যকর ও বলবতে আগামী সংসদের ভ‚মিকা অনস্বীকার্য। অন্তর্বর্তী সরকার উপরোল্লিখিত সাংবিধানিক পন্থায় নির্বাচনের আয়োজন করতে পারেনি। বিলম্বে হলেও যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে, সে অনুযায়ী তারা সফলকাম হোক- এটিই প্রত্যাশা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তাতে চারটি মৌলিক বিষয়ে একটি মাত্র প্রশ্নে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মাধ্যমে অনুমোদন চাওয়া হবে। এ চারটি মৌলিক বিষয় হলো- ১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। ২. আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। ৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে এবং ৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যাবশ্যক। যে চারটি মৌলিক বিষয়ের ওপর গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মাধ্যমে অনুমোদন চাওয়া হয়েছে তা গণভোটে অনুমোদিত হলে এটিকে কার্যকর রূপ দিতে সংবিধান সংশোধনের আবশ্যকতা দেখা দেবে এবং সে ক্ষেত্রে যেকোনো দল বা জোট দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সমর্থন ব্যক্ত করলেই তা অনুমোদিত হবে।

এরশাদ সরকারের পতনের পর অনুষ্ঠিত পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে এরশাদের দল জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়নি। নির্বাচনকালীন এরশাদ কারান্তরীণ থাকলেও তিনি নিজে পাঁচটি আসনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে বিজয়ী হন এবং তার দল ৩৫টি আসন লাভ করে। সে নির্বাচনে এরশাদের দল যে ফলাফল করেছিল, পরবর্তী কোনো নির্বাচনে এককভাবে সে অর্জনের ধারা অব্যাহত রাখতে পারেনি।

১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় এ দল দু’টি নির্বাচনে ছিল না। দল দু’টির প্রতি যে জনসমর্থন ছিল তা সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মূল প্রতিদ্ব›দ্বী জাসদের প্রতি ব্যক্ত করা হলেও নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জাসদকে মাত্র একটি আসন দেয়। পরে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার যোগ্য করা হলে মুসলিম লীগ ও ডেমোক্র্যাটিক লীগ নামে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে দল দু’টি ২০টি আসন লাভ করে। সে নির্বাচনে বিএনপির প্রাপ্ত আসন ছিল ২০৭টি।

বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে যে বিরোধ তার মূলে রয়েছে একটি সরকারের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী কোন ধরনের সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এযাবৎকালে অনুষ্ঠিত ১২টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে আটটি দলীয় সরকারের অধীন এবং চারটি অন্তর্বর্তী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রতিটিতেই ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হয়। অন্য দিকে অন্তর্বর্তী ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত চারটি নির্বাচনের প্রতিটিতেই নির্বাচনের অব্যবহিত আগের ক্ষমতাসীনরা পরাজিত হয়। সুতরাং ধারণা করা যায়, দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন হলে ফলাফল কী হবে এবং অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ফলাফল কী দাঁড়াবে।

আওয়ামী লীগ ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচন এবং ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণা করায় দলটি এ নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও দলটির জনসমর্থনে হ্রাস ঘটেছে, এ কথা বলার অবকাশ বোধকরি কম।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকের বিরুদ্ধেই দলটির প্রায় ১৬ বছরের শাসনকালে নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে বিচার-পরবর্তী তাদের সাজা দেয়া হলে তারা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংবিধানিকভাবে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। অন্যথায় ব্যক্তির পরিবর্তে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হলে তা কতটুকু আইনানুগ হবে, ভাবার অবকাশ আছে। সামগ্রিকভাবে দলকে দায়ী করে তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলে নির্বাচন নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]