এটি এমন এক চিঠি ছিল, যার বিরোধিতায় প্রাচ্যের কবি আল্লামা ইকবালের বিরুদ্ধে অপবাদের ঝড় বয়ে যায়। এক শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের বহু সদস্য আল্লামা ইকবালের অবস্থানের সমর্থন করছেন। এটি সেই চিঠি, যার বিরুদ্ধে সৃষ্ট অস্থিরতা ইকবালের এ বিখ্যাত কবিতার জন্ম দিয়েছিল— হ্যায় খাকে ফিলিস্তিন পার ইহুদি কা আগার হাক/হাসপানিয়া পার হাক নাহিঁ কিউঁ আহলে আরাব কা— ফিলিস্তিন ভূমির ওপর যদি থাকে ইহুদিদের অধিকার/তাহলে স্পেনের ওপর অধিকার নেই কেন আরব জাতির? চিঠিটি ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড বেলফোর অন্যতম জায়নাবাদী নেতা লর্ড রথ চাইল্ডকে ১৯১৭ সালে লিখেছিলেন, যাকে বেলফোর ঘোষণাও বলা হয়ে থাকে। ওই চিঠিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, তার সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠন করতে প্রস্তুত।
আল্লামা ইকবাল বেলফোর ঘোষণার বিপক্ষে রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন শুরু করেন। ১৯১৯ সালে অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সরকারের গণহত্যার পর পুরো হিন্দুস্তানে ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। অথচ আল্লামা ইকবাল ভীতিকর ওই পরিবেশে লাহোরের মোচি গেটের বাইরের উদ্যানে ১৯১৯ সালের ডিসেম্বরে এক সমাবেশের আয়োজন করেন। ওই সমাবেশে বেলফোর ঘোষণার বিপক্ষে প্রস্তাব পাস করা হয়। ওই প্রস্তাবে দাবি করা হয়েছিল, ব্রিটিশ সরকারকে ফিলিস্তিন ভাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করতে হবে। এ সময় ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ সরকার আল্লামা ইকবালকে তার ‘আসরারে খুদি’ গ্রন্থের কারণে স্যার উপাধি প্রদান করে। আসরারে খুদির ইংরেজি অনুবাদ করেন ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আর এ নিকলসন। এই ইংরেজি অনুবাদের বদৌলতে প্রাচ্যের কবির জন্য স্যার খেতাবের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
কিছু ইকবাল বিশেষজ্ঞের ধারণা, আল্লমা ইকবাল অতীতে এ ধরনের সরকারি সম্মাননা গ্রহণে অস্বীকার করেছিলেন; কিন্তু স্যার খেতাব গ্রহণের একটি কারণ ছিল, তিনি ব্রিটিশ সরকারকে এ বার্তা দিতে চাচ্ছিলেন, তিনি সরকারের নীতির সমালোচনা অবশ্যই করেন; কিন্তু কারো সাথে শত্রুতা পোষণ করেন না। সুতরাং তার রাজনৈতিক চিন্তাধারার প্রতিও লক্ষ করা উচিত। স্যার খেতাব গ্রহণের পরও আল্লামা ইকবাল বেলফোর ঘোষণার বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন। লিগ অব নেশন্সকে কাফন চোরের সংগঠন বলে অভিহিত করেন। সে সময় লিগ অব নেশনসের হেডকোয়ার্টার ছিল জেনেভাতে। ইকবাল ‘যারবে কালিম’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘ফিলিস্তিনি আরব’ কবিতায় বলেন, তেরি দাওয়া না জেনেভা মেঁ হ্যায় না লান্দান মেঁ/ফারাঙ্গ কি রাগে জাঁ পাঞ্জায়ে ইয়াহুদ মেঁ হ্যায়— তোমার প্রতিকার নেই জেনেভায়, নেই লন্ডনে/ইংরেজের প্রাণকোষ রয়েছে ইহুদির থাবার মধ্যে!
১৯২৯ সালে আল্লামা ইকবাল লাহোরের মোচি গেটের বাইরের বাগানে আরো একটি সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন। সেখানেও তিনি বেলফোর ঘোষণার প্রত্যাহারের দাবি করেন। ১৯৩১ সালে আল্লামা ইকবাল ফিলিস্তিনের মুফতিয়ে আজম সায়্যেদ আমিনুল হোসাইনির আমন্ত্রণে বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিলিস্তিন কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে এক বক্তৃতায় বলেন, মুসলমানদের শত্রুকে নিয়ে তার বেশি ভয় নেই, তবে কিছু মুসলমানকে নিয়ে তার খুব ভয়। আল্লামা ইকবালের বক্তৃতা ছিল ইংরেজিতে, আর আবদুর রহমান আযযাম তার বক্তৃতার আরবি অনুবাদ করছিলেন। ওই কনফারেন্সে অংশগ্রহণের পর তিনি কিছু আরব দেশের সরকারের সমালোচনা শুরু করেন। এক স্থানে বলেন, কাফেলায়ে হেজায মেঁ এক হুসাইন ভি নেহিঁ/গার চে হ্যায় তাবদার আভি গেসুয়ে দিজলা ওয়া ফোরাত— হেজাজের কাফেলায় একজন হুসাইনও নেই/যদিও দজলা ও ফোরাতের ঢেউ এখনো উজ্জ্বল ও দীপ্তিময়।
আল্লামা ইকবাল তার মৃত্যু পর্যন্ত ফিলিস্তিন ভাগ ও বেলফোর ঘোষণার বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন। যার ফলে ইংরেজদের অনুগতরা তার বিরুদ্ধে অপবাদ রটাতে থাকে। কিন্তু ইকবালের অবস্থান আরো শক্ত হতে থাকে। তিনি বলেন, জিন্দা কার সাকতি হ্যায় ইরান ওয়া আরবকো কিউঁকার/ইয়ে ফারাঙ্গি মাদানিয়্যাত কে জো হ্যায় খোদ লাবে গোর!— যে পশ্চিমা সভ্যতা নিজেই মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, তা কিভাবে ইরান-আরবকে পুনরুজ্জীবিত করবে! আজ যে তেহরানে আমেরিকা ও ইসরাইল বোমাবর্ষণ করছে, ইকবালের কবিতায় সেই তেহরান সম্পর্কে এক স্থানে বলা হয়েছে, তেহরান হো গার আলামে মাশরেক কা জেনেভা/শায়াদ কুরায়ে আরজ কি তাকদির বাদাল জায়ে!— তেহরান যদি হয় প্রাচ্যের জেনেভা/তাহলে হয়তো পৃথিবীর ভাগ্যই বদলে যাবে।
আল্লামা ইকবাল লিগ অব নেশনসকে কাফন চোরের সংগঠন আখ্যায়িত করেছিলেন। ১৯৪৬ সালে তার বিলুপ্তি ঘটে। আর জাতিসঙ্ঘ তার স্থান নিয়ে নেয়। এই জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে বেলফোর ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হয়। একই সাথে ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসরাইল যখন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আল্লামা ইকবাল জীবিত ছিলেন না। কিন্তু কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইকবালের চিন্তাধারার সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে ইসরাইলকে স্বীকৃতি প্রদানে অস্বীকার করেন।
বেলফোর ঘোষণা এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার করেছে। আজ ব্রিটেনের পার্লামেন্টে এ দাবি করা হচ্ছে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যেন বেলফোর ঘোষণা ও ইসরাইল প্রতিষ্ঠায় ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কেননা, এ ইস্যুতে ব্রিটেনের ভূমিকা বিশ্বকে শান্তি নয়; বরং শুধু যুদ্ধ উপহার দিয়েছে। কয়েক দিন আগে বিভিন্ন দলের ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৪৫ সদস্য প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে লেখা একটি চিঠিতে দাবি করেন, আমাদের শুধু অতীতের ভুল স্বীকার করলে চলবে না; বরং নিজেদের ভূমিকারও পর্যালোচনা করতে হবে। সেই সাথে ইতিহাস ঠিক করতে বেলফোর ঘোষণার জন্য ক্ষমাও চাইতে হবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আরো অনেক সদস্য এ চিঠির সমর্থন করতে যাচ্ছেন। তারা এটি প্রস্তাবাকারে সংসদে পাস করানোর ইচ্ছা করেছেন। এ প্রস্তাব পাস হোক বা না হোক, তবে ৪৫ পার্লামেন্ট সদস্যের চিঠি আল্লামা ইকবাল ও কায়েদে আজমের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণিত করে দিয়েছে।
ভারতীয় লেখক তারা চরণ রাস্তোগি আল্লামা ইকবালের বিরুদ্ধে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন, যেখানে তার চরিত্রহননে মনগড়া কাহিনী জুড়ে দেয়া হয়। বলা হয়, ইকবাল তো কাশ্মিরি বংশোদ্ভূতও নন। তারা চরণ রাস্তোগির মতো অসৎ ইতিহাসবিদদের মনে ইকবালের চিন্তাধারা সবসময় কাঁটা হয়ে বিঁধতে থাকবে। কেননা, এই সাম্রাজ্যবাদী দালালরা নিজেদের সর্বোচ্চ অপচেষ্টা সত্ত্বেও ইকবালের চিন্তাধারা ধ্বংস করতে পারেনি। প্রতিটি চলে যাওয়া দিনের সাথে সাথে ইকবালের চিন্তার সত্যতা আগের চেয়ে আরো বেশি উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
যে লিগ অব নেশনসকে আজ জাতিসঙ্ঘ বলা হয়, ইকবাল তাকে জাতিগুলোর সমিতি নামে ডাকতেন। ইকবাল জাতিগুলোর সমিতিকে কারো রক্ষিতা অভিহিত করে বলেন, আশঙ্কা আছে, এই পশ্চিমা বৃদ্ধা রক্ষিতাকে ইবলিশের তাবিজ দিয়ে কিছু দিন টিকিয়ে রাখা হবে। এই জাতিসঙ্ঘ তো আজ আর কারো রক্ষিতা হয়েও থাকতে পারেনি, কেননা আধুনিক যুগের ইবলিশেরা তার কোনো সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাব মানে না। কে জানত, যে তেহরানকে আল্লামা ইকবাল প্রাচ্যের জেনেভা বানাতে চেয়েছিলেন, তা ২০২৬ সালে সমকালের ইবলিশদের জন্য বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে। সারা বিশ্বের মুসলমানরা নিজেদের সব মতভেদ ভুলে গিয়ে তেহরানের সফলতা ও নিরাপত্তায় দোয়া করবে।
ইবলিশের তাবিজে হয়তো ইসরাইল আরো কিছু দিন টিকে থাকবে; কিন্তু ইসরাইল আমেরিকার সাথে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছে, তার মূল কারণ ১৯১৭ সালে লর্ড বেলফোরের পক্ষ থেকে লেখা একটি পত্র, আল্লামা ইকবাল যা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ২০২৬ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরাও ওই পত্র প্রত্যাখ্যান করছেন। সুতরাং মুসলিম বিশ্বের শাসকদেরও উচিত তারা আজকের কোনো ইবলিশের তাবিজের ওপর নির্ভর না করে, ইকবালের চিন্তাধারার প্রতি ফিরে যাওয়া, যা এক শতাব্দীর পরও ইতিহাসের সঠিক পথে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হবে।
হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জংয়ের
উর্দু থেকে ভাষান্তর করেছেন ইমতিয়াজ বিন মাহতাব



