‘আর যারা সত্যকে অস্বীকার করেছে, (হে নবী) তাদের তুমি যতই সতর্ক করো না কেন, তারা কখনো বিশ্বাস করবে না। আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন, কান করেছেন বধির আর চোখ ঢেকে দিয়েছেন পর্দায়। ওদের জন্য অপেক্ষা করছে শাস্তি।’ (সূরা বাকারাহ-৭) ‘ওদের উপমা হচ্ছে এমন জনতার, যারা আগুন জ্বালাল। আগুনে চার পাশ আলোকিত হওয়ার পরই আল্লাহ সে আলো সরিয়ে নিলেন। ওরা ঘোর অন্ধকারে ডুবে গেল। অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখার থাকল না। ওরা বধির, বোবা ও অন্ধ। সুতরাং ওরা আঁধারেই ঘুরপাক খাবে, আলোয় ফিরে আসতে পারবে না। (সূরা বাকারাহ : ১৭-১৮) শুধু বাংলাদেশ কেন গোটা বিশ্ব এখন এ ধরনের গোলকধাঁধার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রত্যেক ব্যক্তি এবং সবাই মিলে গোটা বিশ্বকে আজ এমন এক অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার তাগিদ থাকবে, যেন সেই ঘোর কেটে যায়। নিজের স্বার্থে, পরিবার, সমাজ, দেশ এবং বিশ্ব-সভ্যতার সবার স্বার্থে আত্মসম্মোহনের সামিয়ানায় আসার অবকাশ তৈরি হচ্ছে। সম্মোহন (Hypnosis) হলো এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে মনোযোগ গভীরভাবে কেন্দ্রীভূত হয়, পারিপার্শ্বিক চেতনা হ্রাস পায় এবং পরামর্শের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়ে, যা ঘুমন্ত অবস্থার মতো মনে হলেও এটি আসলে স্বপ্নালু এক গভীর শিথিলতা, যা ব্যথা, চাপ, উদ্বেগ কমানো ও বদঅভ্যাস ত্যাগসহ আধ্যাত্মিক সাধনা তথা চিকিৎসা-শুশ্রূষার কাজে ব্যবহৃত হয়।
সুফি সাধকরা আট কুঠুরি ৯ দরজার মানবদেহের মধ্যে দিয়ে চিন্তাচেতনার মুক্তবুদ্ধির অচিন পাখি কেমনে আসে যায় তার তত্ত্বতালাশে মনোনিবেশে থাকতে চান। প্রত্যেকের স্বাধীন সার্বভৌম অধিকার এবং নিজস্ব সীমা-পরিসীমার মধ্যে থাকার অধিকারকে আধুনিককালে সীমাহীন ক্ষমতাধররা আরো ক্ষমতাশালী হওয়ার জন্য এটি সেটিতে (যেমন- গাজা, গ্রিনল্যান্ড) দখলদারিত্ব কায়েম করতে চাইছে। উগ্রতা সব সুবুদ্ধিজাত সুকুমারবৃত্তি ও মানবিক পেশাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেয়ার ধৃষ্টতা দেখাতে ‘অন্ধ, মূক ও বধির’-এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চাইছে। যে চিন্তা থেকে কাজের উৎপত্তি সেই চিন্তার জগতেও যেন ভাইরাসের আক্রমণ শুরু হয়েছে। বছর পাঁচেক আগে করোনা অতিমারীতে দুই হাত ধোয়ার মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ প্রতিরক্ষার উপায় শিখিয়ে দিয়ে গেছে, তা মনোভঙ্গিকে ধুয়ে সাফ করার কথা বলতে কি ভুলেই গেল, না স্বার্থপর মানুষই তা ভুলতে বসেছে। অথচ করোনা এসেছিল যেন যুগ যুগ ধরে মানবতার অবমাননা, বৈষম্য, লোভ-লালসা, মিথ্যাবাদিতা ও অহমিকার যে পাপাচার বিশ্বকে গ্রাস করছিল, তা দূর করতে গোটা বিশ্বময় একটি প্রবল ঝাঁকুনি দিতেই। সবার সেখানে আত্মশুদ্ধি ও অনুশোচনার শিক্ষা নেয়ার কথা ছিল। অতিমারী করোনার পর বিগত কয়েক বছরে মনোভঙ্গির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয় না।
কূটনৈতিক দায়িত্ব নিয়ে জাপানে অবস্থানকালে (১৯৯৪-২০০০) জাপানিদের জীবনযাত্রার বেশ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আমার পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে। জাপানি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরাসাওয়া (১৯১০-৯৮) আগে থেকেই আমার চিন্তাচেতনার চৌহদ্দিতে অবস্থান করছিলেন। আমাদের পাশের পাড়াতেই থাকতেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বের তিনি মারা যাওয়ার বছরখানেক আগে (ডিসেম্বর ২৪, ১৯৯৭) তার ছবিগুলোর অন্যতম নায়ক মিফুনে মারা যান। সে সময় এ উপলক্ষে আমার জাপানি সমাজ মনস্তত্ত্ব অনুধ্যান প্রয়াস আরো বেগবান হয়। অন্যতম প্রেরণা আকিরা কুরাসাওয়ার ‘রশোমন’ (Rashomon, 1950), যেটি বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অনন্য মাইলফলক। এই ছবিটি শুধু জাপানি সিনেমাকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করে তোলেনি; বরং গল্প বলার ধরন ও সত্যের ধারণা সম্পর্কে দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল।
‘রশোমন’-এর কাহিনী আবর্তিত হয়েছে একটি খুন ও এক নারীর সম্ভ্রমহানির ঘটনা ঘিরে। ঘটনা একটিই কিন্তু তার চারটি ভিন্ন বর্ণনা। ডাকাত তাজোমারু, ভুক্তভোগী নারী, নিহত স্বামীর আত্মা (মাধ্যমের মাধ্যমে) এবং এক কাঠুরে। প্রত্যেকের বয়ানেই সত্য ভিন্ন এবং প্রত্যেকেই নিজেকে নৈতিকভাবে অনুকূল অবস্থানে উপস্থাপন করেন। কুরাসাওয়া এখানে দেখান, সত্য কোনো নিরেট বস্তু নয়; তা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, স্বার্থ ও স্মৃতির দ্বারা নির্মিত। রশোমন ছবির মূল দর্শন হলো, মানবস্বভাবের স্বার্থপরতা, আত্মপ্রবঞ্চনা ও নৈতিক দ্বিধা। মানুষ কি সত্য বলতে পারে? নাকি সে নিজের সুবিধামতো সত্য তৈরি করে? ‘রশোমন’ মানবচরিত্রের অন্ধকার দিককে নির্মমভাবে উন্মোচিত করে; কিন্তু একই সাথে শেষ অংশে একটি মানবিক আশার ইঙ্গিতও দেয় একটি শিশুকে আশ্রয় দেয়ার মধ্য দিয়ে। কাজুও মিয়াগাওয়ার ক্যামেরা ব্যবহার (বিশেষত সূর্যের দিকে সরাসরি ক্যামেরা তাক করানো) তখনকার সময়ের জন্য ছিল সাহসী ও নতুন। তাজুমারু (মিফুনে) ও সাথে প্রতিপক্ষের আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ অস্ত্র চালনা লং-শটে এমন কৌশলী ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে, মনে হয়েছে দু’টি শোয়া পোকা ফাইট করছে। সম্পাদনা ও ফ্ল্যাশব্যাক : একই ঘটনার বারবার পুনর্নির্মাণ দর্শককে সক্রিয়ভাবে ভাবতে বাধ্য করে। প্রকৃতি ও আবহ : বৃষ্টি, জঙ্গল, আলো-ছায়া- সবই চরিত্রের মানসিক অবস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে।
তোশিরো মিফুনে (তাজুমারু) তার প্রাণবন্ত, উন্মত্ত অভিনয়ের মাধ্যমে চরিত্রটিকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিলেন। অন্যান্য চরিত্রও সংযত অথচ গভীর অভিনয়ে গল্পের নৈতিক টানাপড়েনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। ‘রশোমন’ ১৯৫১ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে গোল্ডেন লায়ন জিতে নেয় এবং বিশ্বব্যাপী জাপানি সিনেমার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। এ ছবির নাম থেকেই এসেছে বহুল ব্যবহৃত শব্দ Rashomon Effect, যা একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন, পরস্পরবিরোধী বর্ণনাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (আইন, ইতিহাস, সাংবাদিকতা ও মনোবিজ্ঞানে)। আমাদের আজকের আলোচনায় রশোমনকে প্রাসঙ্গিকতায় আনার কারণ হলো, ‘রশোমন’ শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি এক দার্শনিক অনুসন্ধান। সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার সংজ্ঞা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো ছবিটি তোলে, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আকিরা কুরাসাওয়া এখানে প্রমাণ করেছেন, সিনেমা কেবল বিনোদন নয়; বরং মানব অস্তিত্ব অন্বেষণের এক শক্তিশালী মাধ্যম। বলা যায়, ‘রশোমন’ দেখার অভিজ্ঞতা দর্শককে গল্পের বাইরে গিয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করতে শিখিয়েছিল।
আকিরা কুরাসাওয়ার ছবি এবং এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আমজনতার আর্থসামাজিক রাজনৈতিক কড়চায় মনোভঙ্গির মরূদ্যানে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাপানেরই নিক্কে তোশোগু মন্দিরের তিন বানরের ভাস্কর্যের একটি যোগসূত্র খুঁজে ফিরছি। নিক্কো তোশোগু (Nikkô Tôshô-gû) মন্দিরটি নির্মিত হয় ১৭০০ শতকে, টোকুগাওয়া শোগুন ইয়েয়াসু টোকুগাওয়ার স্মৃতির উদ্দেশে। এখানে একটি কাঠখোদাই শিলালিপিতে মানুষের জীবনের বিভিন্ন স্তরকে বানরের মাধ্যমে রূপকভাবে দেখানো হয়েছে। তিন বানরের দৃশ্যটি আসলে একটি বড় ধারাবাহিক ভাস্কর্যের অংশ, যা মানুষের নৈতিক শিক্ষার প্রতীক। তিন বানর শুধু ‘চোখ-কান-মুখ বন্ধ’ করার সরল উপদেশ নয়। শিশু বয়সের নৈতিক শিক্ষা : ছোটবেলায় মানুষ যেন অশুভ প্রভাব থেকে নিজেকে রক্ষা করে এই ধারণা থেকে ‘মন্দ দেখা নয়’ ‘মন্দ শোনা নয়’ ‘মন্দ বলা নয়’। এর মাধ্যমে কনফুসিয়ান নৈতিকতা : ‘নৈতিক শুদ্ধতা রক্ষা করাই সামাজিক শৃঙ্খলার ভিত্তি’- এই দর্শনের প্রতিফলন। এর মধ্যে শিন্টো-বৌদ্ধ সংমিশ্রণ খুঁজে পাওয়া যায় : অশুভ শক্তি থেকে আত্মাকে দূরে রাখার আধ্যাত্মিক প্রচেষ্টা। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বানররা মন্দের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না; বরং ব্যক্তিগত আচরণে সংযম শেখায়।
এই তিন বানর ও ‘রশোমন’-এর মাধ্যমে দার্শনিক যোগসূত্র স্থাপনের সুযোগ নিয়েছেন আকিরা কুরাসাওয়া। এখানেই বিষয়টি গভীর ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তিন বানরের নীতি বনাম ‘রশোমন’-এর প্রশ্ন : মন্দ না দেখা-মানুষ কি সত্য দেখতে চায়? মন্দ না শোনা-মানুষ কি সত্য শুনতে আগ্রহী? মন্দ না বলা-মানুষ কি সত্য বলতে সাহসী? ‘রশোমন’-এ কী ঘটে? প্রত্যেক চরিত্র নিজের সুবিধামতো সত্য দেখে; নিজের মতো করে শোনে এবং নিজের মতো করে বলে অর্থাৎ- তারা যেন একেকজন ‘তিন বানর’ হয়ে ওঠে। এ নিয়ে অনেকেই কুরাসাওয়ার নীরব সমালোচনা করেন। কুরাসাওয়া প্রশ্ন তোলেন নৈতিক সংযমের নামে আমরা কি সত্য এড়িয়ে যাচ্ছি?
আমরা কি অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করছি? এখানে তিন বানরের দর্শন একটি দ্বিধার মুখে পড়ে : এটি কি নৈতিক শুদ্ধতার শিক্ষা? নাকি সামাজিক ভণ্ডামি ও আত্মপ্রবঞ্চনার সূচনা? ‘রশোমন’-এর শেষে কাঠুরে যখন শিশুটিকে আশ্রয় দেয় সে তখন আর ‘চোখ-কান-মুখ বন্ধ’ রাখে না; বরং নৈতিক দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এখানেই কুরাসাওয়া তিন বানরের দর্শনকে অতিক্রম করেন। নিক্কো তোশোগুর তিন বানর শেখায় : ‘অশুভ থেকে নিজেকে সংযত রাখো’ রশোমন প্রশ্ন তোলে : ‘সংযমের নামে কি আমরা সত্য ও দায়িত্ব থেকে পালাচ্ছি?’ এই দ্বন্দ্বই জাপানি সংস্কৃতির গভীর মানবিক অনুসন্ধানের একটি অনন্য উদাহরণ।
ভূগোলের এই খণ্ডে, অতিমাত্রায় বিচলিত এই সময় ও সমাজে মনোভঙ্গির মরূদ্যানে সত্য ও সুন্দরের প্রতি, সুবিবেচনা, সুশাসন ও জবাবদিহির প্রান্তরে যদি নবজাগৃতি না আসে, যদি আমাদের অন্তর বিকশিত না হয়, আমরা মূক, বধির ও অন্ধ আচরণ করি, তাহলে আজকের এই দিনকে সেই দিনের কাছে নিয়ে যাওয়া সত্যিই কঠিন হবে।
লেখক : সাবেক সচিব এবং কলাম লেখক



