রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধের উপায়

বাংলাদেশে রাজনীতি মানেই যেন বিভক্তি, প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু। এই অদ্ভুত মানসিকতার মধ্যে আমরা বহু বছর ধরে বাস করছি। একই মাটির মানুষ, একই ভাষায় কথা বলে; কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্নতায় তারা একে অন্যের রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক হানাহানিতে কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত স্ত্রী অকালে বিধবা হয়েছেন, কত শিশু বাবার মুখ মনে রেখে বড় হতে পারেনি— তা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি জাতির গভীর লজ্জা।

ক্ষমতা বদলায়, পতাকা বদলায়; কিন্তু সহিংসতার রঙ বদলায় না। বিরোধী দলে থাকলে প্রতিবাদ, ক্ষমতায় গেলে প্রতিশোধ— এই চক্র ভাঙতে না পারলে আমরা কেবল সহিংসতার উত্তরাধিকারই বয়ে নিয়ে যাবো। একটি রাষ্ট্র যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তবে রাজনৈতিক মতভেদ রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতে রূপ নেবে— এটি সেই রাষ্ট্রের জন্য গভীর কলঙ্ক।

প্রশ্ন হলো, এই চক্র থামানো কি সম্ভব? উত্তর হ্যাঁ। কিন্তু কেবল বিবৃতি বা নিন্দা প্রস্তাব দিয়ে নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন।

প্রথমত, দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মাঠের ক্যাডারদের শাস্তি দিয়ে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। যারা নির্দেশ দেয়, যারা মদদ দেয়, যারা নীরবে প্রশ্রয় দেয়— তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও ঝুঁকির মধ্যে আনতে হবে। সহিংসতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নেতাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাজনীতি থেকে অযোগ্য ঘোষণার মতো কঠোর ব্যবস্থা বিবেচনায় আনা যেতে পারে। যখন নেতৃত্ব জানবে সহিংসতা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্বকে বিপন্ন করবে, তখন তারাই কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী হবে।

দ্বিতীয়ত, দলীয় নিবন্ধন ও কার্যক্রমের শর্ত কঠোর করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের শর্তে স্পষ্টভাবে যুক্ত করতে পারে যে, সহিংসতায় জড়িত হলে দলকেও সাংগঠনিকভাবে দায় নিতে হবে। পুনরাবৃত্তি ঘটলে সতর্কবার্তা, জরিমানা, এমনকি নিবন্ধন স্থগিতের বিধান থাকতে পারে। শুধু মুখে নিন্দা জানিয়ে দায়মুক্তির সুযোগ আর চলতে পারে না।

তৃতীয়ত, ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির সংস্কার জরুরি। ছাত্র ও যুবসংগঠনগুলো যদি অস্ত্রনির্ভর শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তবে সহিংসতা অনিবার্য। এগুলোকে রাজনৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সেবা ও নীতিনির্ভর নেতৃত্ব গঠনের প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করতে হবে। বেকারত্ব ও হতাশা রাজনৈতিক সহিংসতার বড় জ্বালানি— কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নও তাই এই লড়াইয়ের অংশ।

চতুর্থত, রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন জরুরি। শুধু সাধারণ ফৌজদারি ধারায় বিচার করলে এই সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতার জন্য পৃথক সংজ্ঞা, পৃথক তদন্তকাঠামো এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত না হলে আইনের ভয় জন্মায় না। বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকলে অপরাধীরা বরং উৎসাহিত হয়— কারণ তারা জানে, সময়ই তাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্ত শেষ করা এবং নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা আইনে যুক্ত করা উচিত। বিচারপ্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জনসম্মুখে দৃশ্যমান হলে একটি স্পষ্ট বার্তা যাবে যে, রাজনীতি কোনো ঢাল নয়, কোনো দায়মুক্তির লাইসেন্স নয়।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান ব্যবস্থায় অনেকেই বিশ্বাস করে— রাজনৈতিক আশ্রয় থাকলে অপরাধের কোনো পরিণতি ভোগ করতে হয় না। মাঠে যারা সহিংসতা করে বেড়ায় তাদের মনে একধরনের নিশ্চয়তা কাজ করে যে, ‘নেতা’ তাদের রক্ষা করবেন। এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে আইন কেবল কাগজেই থাকবে।

অতএব, আইনের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন তার নিরপেক্ষ প্রয়োগ। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় প্রভাব খাটানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্র যদি স্পষ্টভাবে দেখাতে পারে যে, অপরাধী পরিচয়ে নয়, অপরাধের বিচার হবে— তবেই ভয়ের সংস্কৃতি বদলে ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা হবে।

পঞ্চমত, দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অন্ধ আনুগত্য, পরিবারতন্ত্র এবং ‘নেতা যা বলবেন তাই আইন’ এই মানসিকতা সহিংসতার উর্বর ক্ষেত্র। দলীয় সংবিধানে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নির্বাচন, জবাবদিহি ও মতবিরোধের স্বীকৃতি না থাকলে মাঠের সহিংসতা বন্ধ হবে না।

আমাদের স্বীকার করতে হবে, রাজনৈতিক সহিংসতা কোনো এক দলের সমস্যা নয়; এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ দিনের ব্যাধি। এই ব্যাধি সারাতে আইনের কঠোরতা যেমন দরকার, তেমনই দরকার নৈতিক সাহস। রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, ক্ষমতা সাময়িক; কিন্তু একজন মায়ের কান্না চিরজীবনের।

যে দিন আমরা প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, ভিন্নমতের নাগরিক হিসেবে দেখতে শিখব, সে দিনই পরিবর্তনের সূচনা হবে। আর রাষ্ট্র যদি সত্যিই গণতন্ত্রের দাবিদার হয়, তবে সহিংসতাকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার যুগ শেষ করতেই হবে, এখনই।

লেখক : কানাডা প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক