শ্রম দিবসের অঙ্গীকার

বাংলাদেশের শ্রম খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার ব্যবধান দূর করা। শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী পরিদর্শন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য

মে দিবস আধুনিক শ্রমব্যবস্থার ভিত্তি গঠনের এক ঐতিহাসিক মোড়; কিন্তু শ্রমিকশ্রেণীর সংগ্রামী চেতনার স্মারক দিবসটির মর্মকথা কতটা বাস্তবে রূপ পেয়েছে, আর কতটা আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত তা ভেবে দেখার মতো।

পশ্চিমা বিশ্বে মে দিবসের চেতনা রাষ্ট্রীয় নীতি, শ্রম আইন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ দেশে এখন কর্মঘণ্টা সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক দেশে ওভারটাইমের জন্য বাধ্যতামূলক উচ্চহারে অতিরিক্ত মজুরি দেয়া হয় এবং শ্রমিকের বিশ্রামের অধিকার আইনগতভাবে সুরক্ষিত। অর্থাৎ, পশ্চিমা বিশ্বে মে দিবসের মূল চেতনা- শ্রমের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্যতা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যদিও এর পরিপূর্ণতা নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি।

বাংলাদেশে মে দিবস আজও অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতামাত্র। প্রতি বছর র‌্যালি, সেমিনার এবং আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মাধ্যমে পয়লা মে পালিত হয়; কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এর বাস্তব প্রভাব খুবই সীমিত। শ্রমবাজারের একটি বড় অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে কর্মঘণ্টা, মজুরি, নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক সুরক্ষার কোনো সুস্পষ্ট ও কার্যকর কাঠামো নেই।

বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তি সাত কোটি ৭০ লাখের কাছাকাছি, যা এক দিকে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে, অন্য দিকে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করে। এই শ্রমশক্তির একটি বড় অংশই তরুণ, যাদের সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বাস্তবতা হলো, এই বিপুল শ্রমশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যেখানে কাজের স্থায়িত্ব নেই, লিখিত চুক্তি নেই এবং সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তাও অনুপস্থিত। ফলে দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নির্মাণ শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবনযাপন করেন, যেখানে আয় অনিয়মিত এবং ভবিষ্যৎ প্রায় অজানা।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তৈরী পোশাকশিল্প একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, যেখানে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মরত এবং তাদের একটি বড় অংশ নারী। এই শিল্প দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হলেও শ্রমিকদের মজুরি, কর্মপরিবেশ এবং নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্ন উঠছে। নারী শ্রমিকরা এখনো মজুরি বৈষম্য, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন।

অন্য দিকে কৃষি খাত এখনো বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যদিও জাতীয় আয়ে এর অবদান ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ এই খাতে নিয়োজিত থাকলেও কৃষি শ্রমিকদের কাজ সাধারণত মৌসুমি এবং আয় সীমিত। আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতার অভাব উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করছে, যার ফলে এই খাতের শ্রমিকরা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত থাকছেন।

সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংখ্যার দিক থেকে শক্তিশালী হলেও গুণগত দিক থেকে এখনো পিছিয়ে। মে দিবসের মূল চেতনা- যেখানে শ্রমিকের মর্যাদা, অধিকার এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়, সেটি বাস্তবায়নের জন্য কেবল আনুষ্ঠানিকতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর নীতি, কঠোর বাস্তবায়ন এবং সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত প্রয়াস।

রানা প্লাজা ধসের পর পোশাকশিল্পে আন্তর্জাতিক তদারকির মাধ্যমে কিছু নিরাপত্তা উন্নয়ন ঘটলেও ছোট ও মাঝারি কারখানা, সাব-কন্ট্রাক্ট ইউনিট এবং গৃহভিত্তিক উৎপাদন এখনো সেই সংস্কারের বাইরে রয়ে গেছে। এর ফলে শ্রমক্ষেত্রে একটি দ্বি-স্তর বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে বড় ব্র্যান্ড-সংযুক্ত কারখানাগুলো তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হলেও বিস্তৃত অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থার শ্রমিকরা এখনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছেন।

পরিবহন ও নির্মাণ খাতের বাস্তবতাও শ্রম অধিকারের সাথে বড় ধরনের বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। বাস, ট্রাক ও অটোরিকশাচালকদের একটি বড় অংশ দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন, যেখানে কোনো চুক্তি, বীমা বা আয় সুরক্ষা নেই। একই অবস্থা নির্মাণ শ্রমিকদেরও।

শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়নের দুর্বলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত সমস্যা। আইনি অধিকার থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত, ফলে তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল থাকে।

সবকিছুর মধ্যেও কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি লক্ষ করা যায়। পোশাকশিল্পে নিরাপত্তা মানোন্নয়ন, নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে উন্নত কর্মপরিবেশ ও আয়ের সুযোগ তৈরি করছে।

তবে এসব অগ্রগতি এখনো সীমিত পরিসরে আবদ্ধ এবং বৃহত্তর শ্রমবাজারে এর প্রভাব পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। বাংলাদেশের শ্রম খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার ব্যবধান দূর করা। শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য শক্তিশালী পরিদর্শন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে জীবনযাত্রার ব্যয়কে বাস্তবভাবে বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন, যাতে শ্রমিকরা প্রকৃত অর্থে জীবনমান উন্নত করতে পারেন।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]