‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা’

আওয়ামী দুঃশাসন ও শেখ হাসিনার নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সবসময় সোচ্চার। ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রচারকালে এক জনসভায় দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা’। কতটা দেশপ্রেম ও কতটা জাতীয়তাবাদী চেতনা থাকলে এত শক্ত কথা বলা যায়। তিনি ক্ষমতার বাইরে বা ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো দেশের স্বার্থে ভারত বা কোনো শক্তির সাথে বিন্দুমাত্র আপস করেননি

ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব
ড. মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুব |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে দৈনিক নয়া দিগন্তে আমি সোহেল মাহমুদ নামে উপ-সম্পাদকীয়তে ‘সময়ের সাহসী কণ্ঠ বেগম খালেদা জিয়া’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর সব মিডিয়া বিশেষ করে পত্রপত্রিকায় তার ওপর বহু ফিচার, নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। আমি তখন যা লিখেছিলাম, তার বহু কথা এখনো বেশ প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করে পুনর্লিখনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি।

দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তেমন একটা লেখালেখি করতেন না। জরুরি আইনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কারাগারে থাকাকালে যথেষ্ট সময় হাতে পেয়েছিলেন, তখন কিছু লিখেছিলেন কি না আমাদের জানা নেই। অবশ্য লেখালেখির জন্য যে মানসিক স্বস্তির প্রয়োজন, তখন সেটি তিনি পাননি। কারণ নিজের ও পরিবারের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র প্রক্রিয়াধীন ছিল তাতে মানসিক স্বস্তির সুযোগ তো ছিলই না; বরং প্রতিটি মুহূর্ত তার কেটেছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়। তখন নির্বাচনের পর তিনি বলেছিলেন, অনির্বাচিত সরকারের চেয়ে নির্বাচিত সরকার ভালো। কিন্তু তার সে আশা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের ওপর যে অমানবিক এবং নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে তা সত্যিকার অর্থে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কোনো সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অবশ্য শেখ হাসিনার সরকার তো জনগণের দ্বারা নির্বাচিত ছিল না।

Khaleda Zia Madam

জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান ছিল রোমাঞ্চকর। ঝড়ের বেগে এসে আবার সেভাবেই চলে গেছেন। স্বল্প সময়ে অনেক বেশি কাজ করে গেছেন, যার অধিকাংশ ছিল দেশের জন্য অত্যন্ত মৌলিক, সুদূরপ্রসারী ও স্পর্শকাতর। তাকে যারা পছন্দ করেন না এবং কথায় কথায় আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন, তারাও ঐতিহাসিক এই সত্য অস্বীকার করতে পারেন না। জিয়াউর রহমান হতাশা ও কালো আঁধারের অমানিশা থেকে বাংলাদেশের মানুষকে আশার আলো ও স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।

অন্য দিকে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্থান কিছুটা নাটকীয় হলেও রাজনৈতিক মঞ্চে এসেছেন অনেকটা ধীরলয়ে, হাঁটি হাঁটি পা-পা করে। তবে হ্যাঁ, পরিস্থিতির প্রয়োজনে তিনি ঘরকন্না থেকে রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ জটিল পথে পা বাড়িয়েছিলেন। এ পথ এতই অমসৃণ ছিল যে, তিনি সহসাই হোঁচট খেতে পারতেন; কিন্তু না, তিনি পিচ্ছল পথে তার পা শক্ত করে ধরে রাখতে পেরেছিলেন। এটি তার জীবনের বিরাট সাফল্য। বেগম খালেদা জিয়ার বিরোধীরা তার জীবনের চড়াই-উতরাই ও শিক্ষা-অভিজ্ঞতা নিয়ে নানা কটাক্ষ করে থাকে; কিন্তু তার জীবনের নানা চ্যালেঞ্জ তিনি যেভাবে মোকবেলা করেছেন, গৃহবধূর সরল জীবনের পরিমণ্ডল থেকে উঠে এসে জনগণের কাছে যেভাবে মহীরুহ হিসেবে আবির্র্ভূত হয়েছিলেন। সেই সাথে দীর্ঘ দিন স্বগৌরবে তা ধরে রেখেছিলেন তা নিঃসন্দেহে এক বিস্ময় ও কৌতূহলের বটে। ২০০৯ সালের নির্বাচনে বিরাট বিপর্যয়ের পরও দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে টিকে ছিলেন তিনি।

জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অবতীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতির মাঠে পদার্পণ করেন বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদের দেয়া কোনো আপস প্রস্তাব মেনে নেননি তিনি। শত জুলুমের পরও মাথানত করেননি। ১৯৮৬ সালে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করা হলে বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি তাতে অংশগ্রহণ করেনি। অথচ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সামরিক স্বৈরাচারের সাথে আপসরফা করে নির্বাচনে গিয়েছিল। গণতন্ত্রের পক্ষে ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বেগম জিয়ার অনমনীয় অবস্থানে তাকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

দৈনিক নয়া দিগন্তে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি লেখা ছাপা হয়েছিল যার শিরোনাম ছিল : ‘ডানপন্থীদের বামে, বামপন্থীদের ডানে’। ছোট্ট একটি নিবন্ধ; কিন্তু লেখাটিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের অভ্যুদয়ের প্রেক্ষাপট, দলটির নীতি ও আদর্শের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছিল। আমাদের জানা নেই যে, বিএনপি চেয়ারপারসনের গভীর তাৎপর্যপূর্ণ লেখাটি তার দলের কতজন নেতাকর্মী মনোযোগসহকারে পড়েছেন বা আদৌ পড়েছেন কি না। রাজনীতি বিশ্লেষক ও গবেষকরা মাঝে মধ্যে অভিযোগ করে থাকেন, বিএনপি যতটা না প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল, তার চেয়ে বেশি ‘রাজনৈতিক ছাতা’। বিএনপি নামক রাজনৈতিক ছাতার নিচে আশ্রয় নিয়েছেন নানা মতের, নানা পথের লোক। ফলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে যেমন রাজনৈতিক মতাদর্শগত ঐকমত্যের অভাব ও অস্পষ্টতা রয়েছে, তেমনি দলের আদর্শের প্রতি নেতাকর্মীদের বলিষ্ঠ অঙ্গীকারের ঘাটতি রয়েছে। এ অভিযোগের বাস্তবতা হয়তো কিছুটা আছে। তবে এটিও কি বিস্ময়ের নয় যে, এরূপ ঢিলেঢালা মতাদর্শের একটি পার্টি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় দীর্ঘ দিন অধিষ্ঠিত ছিল এবং তা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে। জেনারেল জিয়ার ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং তার ভিশন যেমন দেশকে নতুন একটি পথের দিশা দিয়েছিল, তেমনি নবগঠিত দল বিএনপিকেও একটি প্রচণ্ড গতি দিয়ে গেছেন তিনি। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে দলটি জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিল। ইতোমধ্যে দেশে বহু চড়াই-উতরাই ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার অকস্মাৎ হত্যা, ১৯৮২ সালে নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে জেনারেল এরশাদের জোর করে হটিয়ে ক্ষমতা দখল, সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আন্দোলনের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উদ্ভব এবং সবশেষ জরুরি আইনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দলের নেত্রী বেগম জিয়া, তার দুই ছেলে ও দলের বহু নেতাকর্মীর ওপরে দলন-পীড়ন ইত্যাদি ঘটনা ছিল বিএনপি ও দলনেত্রী বেগম জিয়ার জন্য এক একটি অগ্নিপরীক্ষা। অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে যিনি বিধবা হয়েছিলেন, যার কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না; দুই শিশুপুত্রকে বুকে আগলে রেখে যিনি বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছেন; স্বৈরাচারের রোষানলে যাকে প্রতিনিয়ত পেরেশান থাকতে হয়েছে, সেই বেগম খালেদা জিয়া তার সুপ্ত ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটিয়ে রাষ্ট্রের নির্বাহী কাঠামোর সর্বোচ্চ পদটিতে তিনবার বসতে পেরেছেন। নিঃসন্দেহে তার প্রতি মহান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ রহমত ছিল। তবে সবকিছুর উপরে জরুরি আইনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে যা ঘটেছিল তা ছিল বেগম জিয়ার জন্য জীবন-মরণ প্রশ্ন। এতে যে মানসিক আঘাত তার ও তার পরিবারের ওপর নেমে এসেছিল, তা সহজে উপশম করার ছিল না। সুস্থ-সবল তরুণ পুত্র তারেক রহমানকে রিমান্ডে আর কারাগারে রেখে যে নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং পঙ্গু করে দেয়া হয়েছিল- তার নজির এ দেশে আর নেই। আরেক পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর ওপর যে নিপীড়ন চালানো হয়, তা তাকে অল্প বয়সে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

২০০৭ সালের সামরিক বাহিনী সমর্থিত ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের সরকার ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আওতায় বেগম জিয়াকেও দেশের বাইরে জোর করে পাঠাতে চেয়েছিল। তখন বেগম জিয়া বলেছিলেন, ‘দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশে জন্মগ্রহণ করেছি। এ দেশের মাটি মানুষের সাথেই আমি থাকতে চাই। এ দেশেই মরতে চাই’। দেশপ্রেমের এমন নজির তিনি শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছিলেন। তিনি ‘ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিন সরকার’ বা ‘শেখ হাসিনার সরকার’- কারো কাছে বিন্দুমাত্র মাথানত করেননি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তার মনোবাসনা পূরণ করেছেন; তিনি দেশেই মৃত্যুবরণ করেছেন। দেশের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বেগম জিয়াকে তার বহু স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে অন্যায়ভাবে জোরপূর্বক বের করে দেন। একপর্যায়ে তাকে মিথ্যা মামলায় কারাবন্দী করা হয়। এরপর আদালত প্রহসনমূলক রায় দিয়ে কারাদণ্ড দেন। তাকে ঢাকার পরিত্যক্ত কারাগারে নিঃসঙ্গভাবে আটকে রাখা হয়। তিনি ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে যথাযথ চিকিৎসার সুযোগ দেয়া হয়নি। এর ফলে তিনি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান।

আওয়ামী দুঃশাসন ও শেখ হাসিনার নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সবসময় সোচ্চার। ২০০৮ সালের নির্বাচনী প্রচারকালে এক জনসভায় দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা’। কতটা দেশপ্রেম ও কতটা জাতীয়তাবাদী চেতনা থাকলে এত শক্ত কথা বলা যায়। তিনি ক্ষমতার বাইরে বা ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো দেশের স্বার্থে ভারত বা কোনো শক্তির সাথে বিন্দুমাত্র আপস করেননি। সবসময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের নানাবিধ অবন্ধুসুলভ আচরণের প্রতিবাদ করতেন। পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয় জাতিসঙ্ঘে তুলে ধরেন। ভারতকে করিডোর দেয়ার বিরুদ্ধে তিনি সাবধান করতেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়ে কাউকে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না তিনি। ভারত তাকে কখনো বাগে আনতে পারেনি। এমনকি, তিনি যখন সরকারে ছিলেন না, তখনো তিনি হরতালের দিনে ভারতের রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করতে যাননি।

শেখ হাসিনা জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির শীর্ষ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে তাদের তথাকথিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে পেশ করেন। সে সময়ে ওই ট্রাইব্যুনালের দেয়া দু’টি রায় নিয়ে এক দিকে শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ এবং অন্য দিকে, জামায়াত-শিবিরের প্রতিবাদের বিরুদ্ধে সরকার পরিচালিত হত্যাকাণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, তখন সিঙ্গাপুর থেকে ফিরে এসে বিরোধীদলীয় নেতা ও ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সময়ের এক সাহসী উচ্চারণ’ করেন। তিনি তীব্র কণ্ঠে বলেন, সরকার প্রতিবাদী জনগণের ওপর ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আর যদি একটি গুলি চলে, তাহলে পরিণতি হবে ভয়াবহ’। বেগম জিয়ার সে দিনের বক্তব্য ছিল নিরাপত্তাহীন জনগণের জন্য এক কঠোর প্রতিশ্রুতির বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেছিলেন, জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিচারের নামে প্রহসন করা হচ্ছে। তার ওই বক্তব্য তখন বিভিন্ন মহলে বেশ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল।

সে দিন সরকারপক্ষ বলেছিল, বেগম জিয়া একে ‘গণহত্যা’ বলে ১৯৭১ সালের ‘গণহত্যা’কে ছোট করে ফেলছেন। সে দিন সরকারবিরোধীরা বলেছিলেন, বেগম জিয়া যথার্থ বলেছেন, সরকার ‘গণহত্যা’ চালাচ্ছে। ফরহাদ মজহার ‘গণহত্যা’র আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, বেগম জিয়া ভুল বলেননি। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিভিন্ন সময়ে পুলিশের নির্বিচার হত্যাকাণ্ডে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসি, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা বিভিন্ন সময়ে বিবৃতি দিয়েছে। চব্বিশের গণহত্যা সম্পর্কে জাতিসঙ্ঘ নিজস্ব তদন্তের ভিত্তিতে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও হত্যাকাণ্ড বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন ও কাবা শরিফের ইমামও উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছিলেন।

বিরোধীদলীয় নেতার অভিযোগের কোনো সন্তোষজনক জবাব আওয়ামী লীগ সরকার কখনো দিতে পারেনি। হাস্যকর বিষয় হলো, শেখ হাসিনা সে দিন বলেছিলেন, ‘এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য বেগম জিয়াই দায়ী’। তার এ মন্তব্য মানবতার সাথে উপহাস বৈ কিছু ছিল না। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলাবাহিনী তথা সরকারের হাতে এক দিনে এতগুলো মানুষের জীবন হানির ঘটনা আর নেই। জুলাই বিপ্লবের সময় এক মাসে প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং ৩০ হাজার লোককে আহত ও পঙ্গু করে দেয়ার ঘটনা ছিল নির্মমতার লজ্জাজনক উদাহরণ।

কয়েক দিন পরে বেগম জিয়া তার স্বভাবসুলভ আপসহীন কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতায় যেতে পারলে ‘গণহত্যা’র জন্য শেখ হাসিনাসহ দায়ী ব্যক্তিদের ট্রাইব্যুনালে বিচার করবেন। বিস্ময়কর হলেও সত্য, জুলাই অভ্যুত্থানের পরে শেখ হাসিনার নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালে তার ও তার দোসরদের বহু অপরাধের মামলায় বিচার চলছে। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়ে গেছে।

বেগম জিয়ার বহুল আলোচিত দ্বিতীয় সত্য কথাটি ছিল শাহবাগে তরুণদের আন্দোলন নিয়ে। যখন দেশব্যাপী ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ আলোড়ন তুলল, হাজারো মানুষ তাতে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় জড়ো হতে লাগল; অনেকে বুঝে উঠতে পারছিলেন না- সেখানে কী হতে যাচ্ছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে বেগম জিয়া সত্যের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সরকারের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘নাস্তিক ব্লগার ও আওয়ামী লীগাররা শাহবাগে জড়ো হয়ে সেখানে অপকর্ম করছে’। বেগম জিয়ার ওই মন্তব্য নিয়ে সে দিন চলেছিল বহু আলোচনা-সমালোচনা। শেখ হাসিনা ও সরকারের সমর্থকরা বলেছিলেন, শাহবাগে মুক্তযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত তরুণরা সমবেত হয়েছে। তরুণদের এ উচ্ছ্বাসকে অনেকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রকৃত বাস্তবতা ছিল, শাহবাগের তরুণরা ছিল আওয়ামী লীগ ও তাদের ছাত্র সংগঠন- ছাত্রলীগ, ১৪ দলীয় মহাজোটের অন্যান্য দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠন ও জোটের বাইরের আরো কিছু বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মী। তাদের উৎসাহ ও সহযোগিতা দিয়েছে সেক্যুলার তথা আওয়ামী-বামজোটের সাংস্কৃতিক মোর্চার নেতাকর্মীরা। আরো ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বাম ও সেক্যুলার শিক্ষক। এ সব তরুণকে আকাশে তুলে ধরেছিল বেশ কিছু মিডিয়া। মিডিয়ার কোনো কোনো প্রতিবেদকের ভাষায়- কোটি কোটি (?) তরুণ নাকি শাহবাগে হাজির হয়েছিল। চ্যানেলগুলো এত ব্যয়বহুল লাইভ কাভারেজ কিভাবে করল- তখন অনেকে সে প্রশ্ন তুলেছিলেন। সরকার শাহবাগীদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে। শুধু তাই নয়, কয়েক সপ্তাহ ধরে বিরিয়ানি-মিনারেল ওয়াটার, খরচাপাতি, মোবাইল, টয়লেট- আরো কত কিছু সরবরাহ দেয়া হয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে! আওয়ামী নেতারা অতি উৎসাহে একে বলেছিলেন ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’। সে দিন সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন একটি আবহ তৈরি করা হয়েছিল যে, ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক বহু লোক তাদের সাথে সুর মিলিয়েছিলেন। যারা এসব দাম্ভিকতা পছন্দ করেননি, তারা নীরবে কেঁদেছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়াই সময়ের সাহসী উচ্চারণটি করেছিলেন।

বেগম জিয়া আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু তিনি দেশের বিভিন্ন ক্রান্তিকালে জাতিকে যে পথের দিশা দেখিয়েছেন, সে জন্য বাংলাদেশের মানুষ তাকে সুদীর্ঘকাল স্মরণে রাখবে। একই সাথে তিনি ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবেন।

লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব
[email protected]