প্রভাবমুক্ত, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ নির্বাচন চাই

এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে সরকারকে সর্বাগ্রে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব ও দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, পেশাদার ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে হবে, যাতে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছাড়া আইন প্রয়োগ করতে পারে তারা। একই সাথে নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ও স্বাধীনতা পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। কেবল এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের আস্থা, অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন, পিএসসি
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এইচ আর এম রোকন উদ্দিন, পিএসসি |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

বাংলাদেশে নির্বাচন কখনো সম্পূর্ণভাবে অভ্যন্তরীণ একটি প্রক্রিয়া হিসেবে পরিচালিত হয়নি। রাষ্ট্রের জন্মলগ্ন থেকে আঞ্চলিক শক্তি, বৈশ্বিক অভিনেতা, দাতারাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্নভাবে নির্বাচনী স্থিতিশীলতা এবং শাসনব্যবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। এ প্রভাবগুলো খুব কম ক্ষেত্রে সরাসরি বা যান্ত্রিক ছিল; বরং এগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রণোদনা, বৈধতার প্রশ্ন এবং ক্ষমতার ভারসাম্যকে প্রভাবিত করেছে, যা অনেকসময় বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিভাজন আরো তীব্র করেছে।

এ প্রভাবের সবচেয়ে মৌলিক ও প্রারম্ভিক উদাহরণ হলো ১৯৭১ সালের ঘটনা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং তৎকালীন শীতল যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। ভারতের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ– বিশেষত শরণার্থীসঙ্কট ও নিজস্ব নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থেকে, পাকিস্তানের পরাজয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথ সুগম করে। যদিও স্বাধীনতা জনগণের সার্বভৌমত্বের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছিল, একই সাথে এটি নতুন রাষ্ট্রে একটি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক মানসিকতা প্রোথিত করে। ১৯৭০-এর দশকে শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে আঞ্চলিক নির্ভরতা, যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রয়োজনের বাস্তবতায়। ফলে তখনকার নির্বাচনগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতার চেয়ে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও ক্ষমতার সংহতকরণ বেশি গুরুত্ব পায়। এ উত্তরাধিকার পরবর্তী দশকগুলোতেও বারবার ফিরে এসেছে।

১৯৭০-এর শেষভাগ ও ১৯৮০-এর দশকে বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রভাব আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামরিক শাসনামলে, বিশেষ করে এরশাদ আমলে, বাংলাদেশ বৈদেশিক সহায়তা ও সহজ শর্তের ঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সহায়তাকে শাসনমান, আর্থিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির সাথে যুক্ত করতে শুরু করে। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে যখন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন তীব্র হয়, তখন এই দাতাগোষ্ঠীর চাপ শাসকগোষ্ঠীর কৌশলগত পরিসর সঙ্কুচিত করে। যদিও ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন মূলত অভ্যন্তরীণ গণ-আন্দোলনের ফল, তবু বৈদেশিক অর্থনৈতিক চাপ অভিজাত শ্রেণীর ভাঙন ত্বরান্বিত করে এবং শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা দুর্বল করে। এর পর সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচনী বৈধতাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় পর্যায়ে শাসনের অপরিহার্য ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

১৯৯০-এর দশক দেখায় কিভাবে বহির্বিশ্বের প্রত্যাশা ও অভ্যন্তরীণ অবিশ্বাস একত্রে নির্বাচনী কাঠামোকে প্রভাবিত করেছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর তীব্র মেরুকরণ এবং কারচুপির স্মৃতি নির্বাচন পরিচালনার ওপর আস্থাহীনতা সৃষ্টি করে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা শুধু একটি দেশীয় উদ্ভাবন ছিল না; এর পেছনে এ উপলব্ধিও কাজ করেছে যে, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন না হলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, সহায়তার আস্থা ও কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ঝুঁকির মুখে পড়বে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো দেশী-বিদেশী উভয় মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং তুলনামূলক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনে। তবে সময়ের সাথে সাথে এ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একটি কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি করে; একে সরিয়ে দেয়ার পর বৈধতাসঙ্কট আরো তীব্রভাবে ফিরে আসে।

২০০৬-২০০৮ সালের সঙ্কট আন্তর্জাতিক বৈধতার সীমাবদ্ধতামূলক ভূমিকা আরো স্পষ্ট করে তোলে। সহিংস রাজপথ রাজনীতি ও বিতর্কিত নির্বাচনী রোডম্যাপের প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসঙ্ঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ স্থগিত বা প্রত্যাহার করে, যা স্পষ্ট বার্তা দেয় যে একটি একতরফা বা ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে না। একই সময়ে জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের ব্যাপক অংশগ্রহণ সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আন্তর্জাতিক সুনাম রক্ষাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনায় পরিণত করে। এর ফল হিসেবে একটি সামরিক সমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, নির্বাচন স্থগিত হয়, ভোটার তালিকা সংস্কারের পর ২০০৮ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই অভিজ্ঞতা রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে এ ধারণা দৃঢ় করে যে, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নির্বাচন সময়সূচি ও পদ্ধতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

২০১৪ সালের পর থেকে বহির্বিশ্বের চাপ ও নির্বাচনী স্থিতিশীলতার সম্পর্ক আরো সঙ্ঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই বছরের বর্জিত নির্বাচন পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে; কিন্তু এ চাপ সমঝোতা আনতে ব্যর্থ হয়; বরং সরকার এটিকে সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করে এবং বিরোধীরা বৈধতা প্রশ্নে এটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। এর ফলে শাসনব্যবস্থা আরো নিয়ন্ত্রণমুখী ও ক্ষমতা-কেন্দ্রীভূত হয়ে ওঠে, যেখানে নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক চাপ স্থিতিশীলতার উপাদান না হয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আরেকটি উপকরণে পরিণত হয়।

২০১৮ সালের নির্বাচন ঘিরে এবং পরবর্তী সময়ে পশ্চিমা দেশগুলোর বিবৃতি, সতর্কতা ও ভিসা-সংক্রান্ত লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নির্বাচনী সহিংসতা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আচরণ প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। একই সাথে বাংলাদেশের নেতৃত্ব বিকল্প কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে এ চাপ সামাল দেয়। আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারতের দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক সমর্থনকে অনেকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার কৌশলগত অংশ হিসেবে দেখেছেন, অন্য দিকে চীন এ হস্তক্ষেপ ও উন্নয়ন সহযোগিতার ভাষ্যকে গুরুত্ব দিয়েছে। এ ধরনের ভূরাজনৈতিক বিকল্প উপস্থিত থাকায় পশ্চিমা চাপের কার্যকারিতা অনেকাংশে হ্রাস পায়।

এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটি সুস্পষ্ট ধারা ফুটে ওঠে যে, বহিঃশক্তিগুলো খুব কম ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেছে; কিন্তু কিভাবে নির্বাচন হবে, তা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলো কিভাবে ঝুঁকি ও লাভের হিসাব কষবে, সে বিষয়ে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, অর্থনৈতিক প্রণোদনা, সুনামহানি বা সুনাম রক্ষার প্রশ্ন এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণ বারবার শাসকগোষ্ঠী, বিরোধী দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একধরনের ‘স্থিতিশীলতা সমঝোতা’কে প্রভাবিত করেছে। যখন এই বহিঃশক্তির প্রত্যাশা অভ্যন্তরীণ সমঝোতার সাথে মিলেছে, যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়, তখন শাসনব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বৈধতা ও স্থিতিশীলতা পেয়েছে। যখন তা তীব্র মেরুকরণ ও পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতির সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, তখন শাসন আরো কেন্দ্রীভূত ও দমনমূলক রূপ নিয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে জনপ্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চ ও গভীর। বহু বছর ধরে চলমান রাজনৈতিক সঙ্ঘাত, আস্থাহীনতা ও বিতর্কিত নির্বাচনের অভিজ্ঞতার পর সাধারণ মানুষ একটি সত্যিকারের অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়, যেখানে তাদের ভোটের মূল্য ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। মানুষের প্রত্যাশা হলো, এ নির্বাচন যেন শুধু ক্ষমতা বদলের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া না হয়ে গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ হয়। তারা এমন একটি নির্বাচনী পরিবেশ কামনা করে, যেখানে সহিংসতা, ভয়ভীতি ও প্রশাসনিক পক্ষপাত থাকবে না। সেই সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে জনগণ আশা করে যে, নির্বাচনের মাধ্যমে এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যারা অর্থনৈতিক সঙ্কট, বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের মতো দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। অনেকের কাছে এ নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক দল বেছে নেয়ার বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈধতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।

এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু, সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে সরকারকে সর্বাগ্রে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তব ও দৃশ্যমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাস, ভয়ভীতি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, পেশাদার ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের সুযোগ দিতে হবে, যাতে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছাড়া আইন প্রয়োগ করতে পারে তারা। একই সাথে নির্বাচন কমিশনকে তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ও স্বাধীনতা পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। কেবল এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে জনগণের আস্থা, অংশগ্রহণ এবং নির্বাচনের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
[email protected]