ঢাকার যানজট নিরসনে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচলে উন্মুক্ত হওয়ায় এগুলোতে শৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচল করলে যান্ত্রিক যানের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানের চলাচল কোনোভাবে কাম্য নয়। আর অযান্ত্রিক যানগুলোর বেশির ভাগ ব্যাটারি-চালিত হওয়ায় এতে কিছুটা যান্ত্রিকতার ছাপ পড়েছে। তবে তা কোনোভাবে বড় যান্ত্রিক যানবাহনের সাথে তুল্য নয়। একই সাথে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সহায়ক নয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে— যাতে কোনোভাবে একই সড়কে যেন যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচল না করে

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের সময় পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল মাত্র আড়াই লাখ। প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৭১ সালে জনসংখ্যা ১৫ লাখের কাছাকাছি পৌঁছায়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে। স্বাধীন দেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব সমধিক বেড়ে যায়। সেই সাথে ক্রমান্বয়ে প্রতি বছর রাজধানী শহরের জনসংখ্যা উচ্চহারে বাড়তে থাকে। বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় তিন কোটি ৬৬ লাখ। ফলে ঢাকা এখন বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহর।

১৯৪৭ সালে ঢাকার পরিধি যা ছিল ক্রমান্বয়ে বেড়ে তা এখন বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর তীর, ধলেশ্বরী, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদী দ্বারা বেষ্টিত। জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই অনুপাতে সড়ক নেই। যেকোনো আধুনিক শহরের ২৫ শতাংশ জায়গা সড়কের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়; কিন্তু ঢাকায় এর পরিমাণ ৮ শতাংশের কিছু উপরে। আয়তন ও জনসংখ্যার তুলনায় সড়কের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় এবং একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচল করায় যানজট বেড়ে অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বর্তমানে ঢাকায় যান্ত্রিক যানের সংখ্যা ১৫ লক্ষাধিক। অযান্ত্রিক যানের মধ্যে পায়ে চালিত রিকশা অন্যতম। বর্তমানে বেশির ভাগ রিকশা ব্যাটারিচালিত। তা ছাড়া স্কুটারের পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত মোটরসাইকেলের চলাচল রয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। গণপরিবহন হিসেবে বিআরটিসি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস চলাচল করলেও এগুলোর বেশির ভাগ মানহীন।

সাধারণ মানুষের চলাচলের জন্য সড়কের দু’ধারে ফুটপাথ আছে। তবে বেশির ভাগ ফুটপাথ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দখলে। তাতে নির্বিঘ্ন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। আবার দেখা যায়, ফুটপাথ ছাড়িয়ে সড়কের অংশজুড়েও ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলছে। এতে সড়ক সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে মেট্রোরেল-৬ ঢাকার উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত করা হলেও বর্তমানে মতিঝিল পর্যন্ত চলমান। এটি চলাচলে কিছুটা স্বস্তি দিলেও অবশিষ্ট সড়কে যাত্রীদের প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। ইতোমধ্যে যানজট নিরসনে বেশ কিছু উড়াল সড়ক এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো শহরের ভূ-ভাগে চলাচলকারী সড়কের যানবাহনের যাতায়াতে এখনো স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। উড়াল সড়কের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, হানিফ ফ্লাইওভারের পূর্বাংশের প্রবেশমুখ ও পশ্চিমাংশের বহিঃপথে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত যানজট লেগে থাকে।

ঢাকার যানজট নিরসনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। কার্যক্ষেত্রে তা ফলদায়ক হয়নি। এখনো প্রায় সব সড়কে ট্রাফিক পুলিশ হাতের ইশারায় যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে। এতে প্রায়ই যানবাহন চলাচলে স্থবিরতা দেখা যায়।

ঢাকায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির আগমন ঘটলে অনেক সড়কে অন্যান্য যান চলাচল সাময়িক বন্ধ করা হয়। এতে বিভিন্ন সড়কে ১৫-৪৫ মিনিট যান চলাচল ব্যাহত হয়। যান চলাচলে এই বিঘ্নতায় যে যানজটের সৃষ্টি হয়, তা কাটিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে অনেক সময় লেগে যায়। অথচ পৃথিবীর অন্যান্য রাজধানী শহরের ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই ধরনের ব্যক্তিদের চলাচলে সাধারণের চলাচল কোনোভাবে বিঘ্নিত হয় না।

ঢাকার জনমানুষের চলাচল নির্বিঘ্ন ও আরামদায়ক করতে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ মেট্রোরেল-১ ও মেট্রোরেল-৫ এ দু’টি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। মেট্রোরেল-১ প্রকল্পটি দুভাগে বিভক্ত। একটি অংশে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১২টি পাতাল স্টেশন আছে, অন্য দিকে আরেকটি অংশে নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল টার্মিনাল পর্যন্ত ৯টি উড়াল স্টেশন রয়েছে। মেট্রোরেল-৫, মেট্রোরেল-১-এর মতো দু’টি অংশে বিভক্ত। এর উত্তর অংশটি উড়াল-পাতাল সমন্বয়ে ১৪টি স্টেশন নিয়ে গঠিত। উত্তর অংশটি হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রস্তাবিত দক্ষিণ অংশটি ১৪টি স্টেশন সমন্বয়ে গাবতলী থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রসারিত। মেট্রোরেল-১ ও মেট্রোরেল-৫-এর কাজ চলমান। মেট্রোরেল-৫-এর প্রস্তাবিত অংশ ছাড়া অবশিষ্টাংশের কাজ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর এর মধ্যে শেষ করার কথা। তবে কাজের গতি দেখে প্রতীয়মান হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না। এ দু’টি প্রকল্পের কাজ প্রস্তাবিত অংশসহ শেষ হলে আশা করা যায়, রাজধানীবাসীর চলাচল অনেকটা স্বস্তিদায়ক হবে।

মেট্রোরেল-২ ও মেট্রোরেল-৪ সম্ভাব্যতা যাচাই পর্যায়ে রয়েছে। ২৪টি স্টেশন সমন্বয়ে মেট্রোরেল-২ গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত প্রসারিত হওয়ার কথা। মেট্রোরেল-৪ কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের বন্দর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হওয়ার কথা। এ দু’টি প্রকল্প বিষয়ে জাপান ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, চীন ও বিশ্বব্যাংকের সাথে অর্থায়ন বিষয়ে আলোচনা চলছে। আশা করা যায়, আলোচনা সফল হলে ২০৩০ সাল নাগাদ কাজ শুরু হয়ে ২০৩৪ বা ২০৩৫ সালের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে। এমআরটি-৩ নামে কোনো প্রকল্প এখন পর্যন্ত হাতে নেয়া হয়নি। চলমান এমআরটি-৬, নির্মাণাধীন এমআরটি-১ ও ৫ এবং প্রস্তাবিত এমআরটি-২ ও ৪ প্রকল্প সম্পন্ন হলে ধারণা করা যায়, ঢাকার সামগ্রিক জনসংখ্যার বড় অংশ মেট্রোরেলের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। এতে নির্দ্বিধায় বলা যায়, রাজধানীবাসীর চলাচল নির্বিঘ্ন, আরামদায়ক ও স্বস্তিকর হবে।

আশুলিয়া থেকে এয়ারপোর্ট হয়ে যাত্রাবাড়ীসংলগ্ন কুতুবখালী পর্যন্ত বিস্তৃত ৪২ কিলোমিটারের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মূল লক্ষ্য উত্তরবঙ্গ এবং চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল থেকে আসা যানগুলো যেন ঢাকা শহরে প্রবেশ ছাড়াই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ বিমানবন্দর থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত শেষ হয়েছে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ এটি চালু হবে বলে আশা করা যায়। এক্সপ্রেসওয়ে সম্পূর্ণ চালু হলে এটি যেভাবে নানামুখী র‌্যাম্পের মাধ্যমে হানিফ ফ্লাইওভারের সাথে এবং ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা যেমন— ফার্মগেট, মগবাজার, মালিবাগ প্রভৃতির সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, তাতে ঢাকা শহরের অভ্যন্তরীণ যাটজন সহনীয় মাত্রায় থাকবে মর্মে আশা করা যায়।

গাজীপুরের ভোগড়া থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুর পর্যন্ত বিস্তৃত চার লেন-বিশিষ্ট ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ের ভোগড়ার দিক থেকে ১৮ কিলোমিটার পর্যন্ত ইতোমধ্যে যান চলাচলে উন্মুক্ত করা হয়েছে। ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে ২০২৮ সাল নাগাদ সম্পূর্ণ চালু করা হলে উত্তরাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে আসা ভারী যানগুলো ঢাকা শহরে প্রবেশ ছাড়া এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে পারবে। এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে হলে প্রতিটি যানবাহনে টোল পরিশোধযোগ্য। এটি নির্মাণে সরাসরি গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের যোগাযোগ সহজতর হয়েছে।

ঢাকা শহরের চার পাশে ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ঢাকা ইনার রিং রোড’ প্রকল্পের কাজের প্রাথমিক পর্যায়ে আমিনবাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত চার লেন-বিশিষ্ট সড়কপথ নির্মাণের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে আমিনবাজার দিক থেকে আসা যানবাহনগুলো নির্বিঘ্নে গাবতলী হয়ে সদরঘাট পৌঁছাতে পারবে। পরবর্তী সময়ে সড়কটি বিস্তৃত করা হলে ঢাকা শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত এবং ঝামেলামুক্তভাবে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াত সহজতর হবে।

যানজট নিরসনে ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে যেসব ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে এর মধ্যে অন্যতম হলো হানিফ ফ্লাইওভার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, মগবাজার ফ্লাইওভার, বিজয় সরণি ফ্লাইওভার, মহাখালী ফ্লাইওভার, কালশী ফ্লাইওভার, খিলক্ষেত ফ্লাইওভার প্রভৃতি। এসব ফ্লাইওভার নির্মাণে যান চলাচলে সম্পূর্ণভাবে স্বস্তি না এলেও অনেক ক্ষেত্রে সহজতর হয়েছে। সেই সাথে যান চলাচলে যে গতি এসেছে, কথাটি অনস্বীকার্য। এ ফ্লাইওভারগুলোর সাথে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সম্পৃক্ততা আছে। ‘ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে’র নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে নিরূপণ করা সম্ভব হবে সমন্বিতভাবে ফ্লাইওভারগুলো এবং এক্সপ্রেসওয়ে যানজট নিরসনে কতটুকু সক্ষম।

ঢাকার বেশির ভাগ সড়ক যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচলে উন্মুক্ত হওয়ায় এগুলোতে শৃঙ্খলা বলতে কিছু নেই। একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচল করলে যান্ত্রিক যানের গতি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই একই সড়কে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানের চলাচল কোনোভাবে কাম্য নয়। আর অযান্ত্রিক যানগুলোর বেশির ভাগ ব্যাটারি-চালিত হওয়ায় এতে কিছুটা যান্ত্রিকতার ছাপ পড়েছে। তবে তা কোনোভাবে বড় যান্ত্রিক যানবাহনের সাথে তুল্য নয়। একই সাথে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সহায়ক নয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে— যাতে কোনোভাবে একই সড়কে যেন যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যান চলাচল না করে।

ঢাকা অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ শহর। শহরটিতে ব্যবহারযোগ্য সড়কের পরিমাণ নগরীর আয়তনের তুলনায় স্বল্প। এতে শহরের ভূ-ভাগের সড়কে যানজট নিত্যসঙ্গী হয়ে দেখা দিয়েছে। শহরটিতে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলো খোলা থাকার সময় চার পাশে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ যানজটসহ সামগ্রিক যানজট থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। সেই সমন্বিত উদ্যোগ হতে হবে বাস্তবভিত্তিক, সময়োপযোগী ও টেকসই।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]