রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামো বা আমলাতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সরকারের নীতি, পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব থাকে প্রশাসনের ওপর। তাই কোনো সরকারের সাফল্যের অনেকটাই নির্ভর করে আমলাতন্ত্রের আন্তরিকতা-সহযোগিতার ওপর। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গত ১৮ মাস রাষ্ট্র পরিচালনার যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তার প্রেক্ষাপটে আমলাতন্ত্রের সহযোগিতা কতটুকু ছিল— এই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।
৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর যখন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন পুরো প্রশাসনিক কাঠামোই পরিচালনা করছিলেন মূলত আগের সরকারের নিয়োগ করা কর্মকর্তারা। দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশে কাজ করার কারণে প্রশাসনের একাংশের মধ্যে দলীয় প্রভাব পড়া বা আনুগত্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। ফলে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রশাসনের আচরণ ও মনোভাব নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ও শঙ্কা ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়। দলীয়ভাবে প্রভাবিত বা বিতর্কিত কিছু কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়। আবার অনেকে চাকরির নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ায় অবসরে যান। তবে বাস্তবতা হলো— প্রশাসনের পুরো কাঠামো এক সাথে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, সেটি কাম্যও নয়। কারণ রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অভিজ্ঞ আমলাদের প্রয়োজন হয়।
তবুও বাস্তবে দেখা গেছে, প্রশাসনের একটি অংশ নতুন সরকারের নীতি বাস্তবায়নে প্রত্যাশিত মাত্রায় সক্রিয় ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প ও প্রশাসনিক ফাইল নিষ্পত্তিতে অস্বাভাবিক দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ ওঠে। নানা ধরনের প্রশ্ন তুলে ফাইল ফেরত পাঠানো, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যাখ্যা চাওয়া কিংবা ফাইল দীর্ঘ সময় আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ সময়মতো বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল সীমিত হওয়ায় দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেছে। এর ফলে সরকারের অনেক পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকজন সদস্যও সাবেক সচিব হিসেবে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখতেন। ফলে আমলাতন্ত্রের একটি অংশের পক্ষ থেকে যে অনীহা বা অসহযোগিতার মনোভাব দেখা গেছে, সেটি তাদের নজর এড়ায়নি। কোথায় কোথায় অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়টি তারা বুঝতে পেরেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রকৃত চিত্র অনুধাবনে উপদেষ্টা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পেরেছে।
কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা প্রকাশ্যে এক আলোচনা সভায় মন্তব্য করেন— বারবার চেষ্টা করে, এমনকি নীতিমালার খসড়া পয়েন্ট আকারে লিখে দেয়ার পরও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে একটি নীতিমালা তৈরি করানো সম্ভব হয়নি। এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়; বরং এটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার জটিলতা ও অনীহার এক প্রতীকী উদাহরণ। তবে পুরো আমলাতন্ত্রকে এককাতারে বিচার করা ঠিক হবে না। প্রশাসনের মধ্যে অনেক সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আছেন, যারা নিষ্ঠার সাথে সরকারের কাজ এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের সক্রিয় সহযোগিতা না থাকলে উপদেষ্টাদের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিনতর হতো। অনেক ক্ষেত্রে এই কর্মকর্তারাই উদ্যোগী হয়ে প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর এবং বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন।
এটিও লক্ষণীয় যে, যারা আগে অন্তর্বর্তী সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করেননি, তাদের অনেককেই এখন ১২ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বেশ সক্রিয় দেখা যাচ্ছে। কেউ আবার নতুন ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা ও বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। প্রশাসনে এ ধরনের প্রবণতা নতুন নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রশাসনের একটি অংশ দ্রুত নিজেদের অবস্থান বদলে নেয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য এক ধরনের আশীর্বাদ হিসেবেই প্রতিভাত হয়েছে। বিগত আওয়ামী সরকারের সময় কারণে অকারণে বহু যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে দীর্ঘদিন ওএসডি করে রাখা হয়েছিল অথবা পদোন্নতি বঞ্চিত করা হয়েছিল। ফলে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের হতাশা ও বৈষম্যের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অসাম্যের অবসান ঘটাতে উদ্যোগী হয়। মেধা, অভিজ্ঞতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে অনেক কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল করা হয় এবং যথাযথ পদোন্নতির সুযোগ দেয়া হয়। এর ফলে প্রশাসনে কর্মস্পৃহা ও ন্যায়বোধ পুনরুদ্ধারের একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে, যা সামগ্রিকভাবে প্রশাসনকে গতিশীল ও কার্যকর করতে সহায়ক হয়েছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির জয়লাভের পর সরকার গঠনের আগেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চুক্তি বাতিল করার ঘটনা প্রশাসনিক শিষ্টাচার ও ধারাবাহিকতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রশাসনে অত্যন্ত সৎ ও দক্ষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে অসততা বা অনিয়মের অভিযোগও ছিল না। তবু কেবল রাজনৈতিক বা দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিবেচনায় তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়— যা প্রশাসনের পেশাগত নিরপেক্ষতার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অনেকে মনে করেন।
পরে তার স্থলে তৎকালীন মুখ্যসচিবকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেয়া হয় এবং ১৭ তারিখে নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের জন্য নিবেদক হিসেবে তার নামে আমন্ত্রণপত্রও ছাপানো হয়। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের ঠিক আগমুহূর্তে তাকেও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের আকস্মিক ও ধারাবাহিক পরিবর্তনকে সাধারণত ‘ব্যাড প্র্যাকটিস’ হিসেবে দেখা হয়, কারণ এতে প্রশাসনের পেশাগত স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন হয়।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত দক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে অপমানবোধ ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে। যখন কর্মকর্তারা মনে করেন, তাদের কর্মদক্ষতা বা সততার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাই প্রধান হয়ে উঠছে, তখন প্রশাসনের ভেতরে আস্থার সঙ্কট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে প্রশাসনের মনোবল ও কর্মোদ্দীপনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও অনুকূল নয়। এ কারণে অনেক প্রশাসনিক বিশ্লেষক মনে করেন, সরকার পরিবর্তনের সময়ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভারসাম্য, শালীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
প্রকৃতপক্ষে আমলাতন্ত্রের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্র ও জনগণের সেবা করা। সংবিধান, আইন ও প্রশাসনিক নীতিমালার আলোকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করাই একজন সরকারি কর্মকর্তার পেশাগত ও নৈতিক কর্তব্য। একটি সুস্থ প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে এই নীতির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার থাকা জরুরি। বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আমলাতন্ত্র সাধারণত রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করে। সরকার পরিবর্তন হলেও প্রশাসনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে এবং নতুন সরকারের নীতি বাস্তবায়নে কর্মকর্তারা পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকেই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশেও সেই ধরনের পেশাদার প্রশাসনিক সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা সময়ের দাবি।
আমলাতন্ত্রের ভেতরে পারস্পরিক সম্পর্ক ও চেইন অব কমান্ড রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক ভিত্তি। প্রশাসনের প্রতিটি স্তর— সচিব থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব কাঠামোর মধ্যে কাজ করেন। এই কাঠামোর মূল লক্ষ্য হচ্ছে শৃঙ্খলা, সমন্বয় ও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম কার্যকরভাবে পরিচালনা করা। সাধারণত প্রশাসনে সহকর্মীদের মধ্যে পেশাগত সহযোগিতা বিদ্যমান থাকে। অভিজ্ঞতা, তথ্য ও প্রশাসনিক দক্ষতার আদান-প্রদানের মাধ্যমে কর্মকর্তারা একে অপরকে সহায়তা করেন এবং সমষ্টিগতভাবে সরকারি নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নকে এগিয়ে নিয়ে যান। এ কারণে আমলাতন্ত্রকে সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দল হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
তবে বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন কেবল একটি পেশাগত কাঠামো নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ক্ষমতার পরিবর্তন এবং মতাদর্শিক বিভাজনের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা ব্যক্তিগত আনুগত্য প্রশাসনের ভেতরেও প্রভাব বিস্তার করে। অনেক কর্মকর্তা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়েন, আবার কেউ নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। এর ফলে প্রশাসনে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে সহকর্মীদের মধ্যে কখনো এক ধরনের গোপন প্রতিযোগিতা ও প্রতিহিংসামূলক আচরণ দেখা যায়। পদোন্নতি, গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন বা ক্ষমতা-কেন্দ্রের কাছাকাছি অবস্থানের আকাঙ্ক্ষা থেকে কিছু কর্মকর্তা অন্যদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের প্রশাসনিক কৌশল প্রয়োগ করেন। অভিযোগ, অপপ্রচার, নেতিবাচক রিপোর্ট বা গোপন লবিং— এসবের আশ্রয় নেন। এর ফলে অনেক দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তা অযৌক্তিকভাবে ওএসডি হয়ে পড়েন, পদোন্নতিবঞ্চিত হন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে ছিটকে পড়েন।
স্বাধীনতার পর গত কয়েক দশকের প্রশাসনিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ভিক্টিম হওয়ার পেছনে সরাসরি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রশাসনের ভেতরের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা ও কারসাজিও ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ কখনো রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে কিছু কর্মকর্তা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেছেন, আবার কখনো সহকর্মীদের দুর্বল করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের প্রবণতাও দেখা গেছে। এই প্রবণতা প্রশাসনের পেশাগত নৈতিকতা ও পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনগণমুখী প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। প্রশাসনের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত যোগ্যতা, সততা, পেশাগত দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা। কর্মকর্তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা এবং ন্যায্য প্রতিযোগিতা থাকলে প্রশাসন আরো কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি পদোন্নতি, পদায়ন ও মূল্যায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা নিশ্চিত করা হলে ব্যক্তিগত কারসাজি বা গোপন লবিংয়ের সুযোগ অনেকাংশে কমে যাবে।
আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরুদণ্ড। এই কাঠামোর ভেতরে যদি পারস্পরিক আস্থা, ন্যায়পরায়ণতা এবং পেশাগত মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে প্রশাসন শুধু দক্ষই হবে না; বরং জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতাও অর্জন করবে। আর সেই লক্ষ্যেই প্রতিহিংসাপরায়ণ মনোভাব, ব্যক্তিগত জিঘাংসা এবং দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রশাসনিক কাঠামোর দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভবিষ্যতে প্রশাসনে পেশাদারিত্ব, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্মসচিব ও উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন (এসিআর) প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমি সর্বোচ্চ ন্যায়পরায়ণতা ও পেশাগত মূল্যায়নের নীতি অনুসরণ করেছি। তাদের কর্মদক্ষতা, নিষ্ঠা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উচ্চ নম্বর দিয়েছি এবং প্রশংসাসূচক মন্তব্য সংযোজন করেছি, যাতে ভবিষ্যতে তাদের পদোন্নতি কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পদায়নের ক্ষেত্রে অযথা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। এতে প্রশাসনের যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়েছেন বলে আমি মনে করি।
রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রশাসনের কর্মদক্ষতা ও দায়িত্ববোধের ওপর। একই সাথে সরকারকেও প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও নৈতিকতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই রাষ্ট্র পরিচালনা হবে গতিশীল, কার্যকর এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম।
লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা



