পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে চিকিৎসাসেবা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। বেশির ভাগ উন্নত দেশের নাগরিকরা রাষ্ট্র থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। অথবা চিকিৎসা গ্রহণ-পরবর্তী বীমা কোম্পানির মাধ্যমে চিকিৎসাব্যয় নির্বাহ করে। আমাদের দেশে চিকিৎসাসেবা মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত না হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে এটি স্থান পেয়েছে। মৌলিক অধিকারের সাথে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির পার্থক্য হলো— প্রথমোক্তটির ব্যত্যয়ে একজন নাগরিক আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন; অন্য দিকে শেষোক্তটির ব্যত্যয়ে আদালতে আশ্রয় গ্রহণের সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের ইউনিয়ন অবধি স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত হলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রার সুযোগের অভাবে তা জনমানুষের চাহিদা পূরণে অক্ষম। এ দেশের প্রতিটি জেলা শহরে এক বা একাধিক এবং উপজেলা শহরে ন্যূনতম একটি করে সরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র রয়েছে। জেলাপর্যায়ের চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোতে জটিল প্রায় সবধরনের রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা থাকলেও দুর্বল ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসাসেবা প্রার্থীরা তাদের চাহিদামাফিক সেবাপ্রাপ্তিতে বঞ্চিত হচ্ছেন। উপজেলা চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের পদায়ন করা হলেও প্রায়ই দেখা যায়, স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক নিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগী রোগীরা পর্যাপ্ত সেবাপ্রাপ্তিতে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেসব চিকিৎসক কর্মরত আছেন, তাদের প্রায় শতভাগ বেসরকারি চিকিৎসাসেবা প্রদানের সাথে জড়িত। বেশির ভাগ চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত চিকিৎসা কার্যক্রম শেষে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বেসরকারি চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত থাকেন। অনেক রোগীর অভিযোগ, সরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসাসেবা প্রদানে চিকিৎসকদের আন্তরিকতার ঘাটতি রয়েছে। আবার বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে গেলে দেখা যায়, রোগীর সংখ্যা এত বেশি যে, ২-৫ মিনিটের মধ্যে একজন ডাক্তার চিকিৎসা কার্যক্রম শেষে রোগীকে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক টেস্টের নির্দেশনাসহ ব্যবস্থাপত্র ধরিয়ে দেন।
অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, সঠিক রোগ নির্ণয়ের অভাবে রোগী অহেতুক বিড়ম্বনার সম্মুখীন হন। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রোগ নির্ণয়ে ভুল করবেন, এটি প্রত্যাশিত না হলেও অনেকসময় দেখা যায়, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বেশি রোগী দেখায় সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন। এমনো শুনা যায়, একজন রোগী দুই-তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখানোর পর তারা রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থ হলে রোগী অনেকটা বাধ্য হয়ে পাশের রাষ্ট্র ভারতে পাড়ি জমান। সেখানে স্বল্প ব্যয়ে সঠিক চিকিৎসা নিয়ে স্বস্তির সাথে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
ভারতে চিকিৎসা ব্যয় আমাদের দেশের তুলনায় কম হওয়ায় এবং সেখানে স্বল্প ব্যয়ে সঠিক চিকিৎসা পাওয়ায় অনেক রোগী সেখানকার চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থাবান। কিন্তু ভিসা জটিলতায় এবং কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েনে এখন বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ভারতে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণে অনিশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে। এ কারণে অনেক রোগী থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও চীনে গিয়ে চিকিৎসা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও চীনে চিকিৎসা ব্যয় ভারতের তুলনায় বেশি, তাই অনেক রোগী ভারতে চিকিৎসা গ্রহণ বাধাপ্রাপ্ত হওয়া সত্ত্বেও উপরোক্ত তিনটি দেশে অর্থের ব্যয় বিবেচনায় চিকিৎসা গ্রহণে অক্ষমতা প্রকাশ করছেন।
আমাদের দেশের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা অনেকটা আস্থার সঙ্কটে এ দেশে চিকিৎসা গ্রহণে খুব একটা আগ্রহ দেখান না। তাদের বেশির ভাগই প্রায় সবধরনের চিকিৎসাসেবা গ্রহণে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, চীন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী। চীনে চিকিৎসাগ্রহণ উপরোক্ত অপরাপর দেশের তুলনায় সাশ্রয়ী বিবেচিত হওয়ায় অনেকে সেখানে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হলেও ভাষা জটিলতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভাষা জটিলতা বাংলা দোভাষী নিয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা গেলে চিকিৎসা গ্রহীতার সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়বে, এটি সহজে অনুমেয়।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর কী পরিমাণ রোগী বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে যান, এর সঠিক তথ্য না থাকলেও আনুমানিক ধারণা করা যায়, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১০-২৫ লাখ লোক বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। দেশে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা পেলে এত বিপুলসংখ্যক রোগী বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে দ্বারস্থ হতেন না। নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে আনুমানিক প্রতি বছর পাঁচ বিলিয়ন ডলার, যা টাকার হিসাবে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। এ বিপুল অর্থ ব্যয় রোধ করা গেলে এবং তা দেশের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে ব্যবহার করা গেলে রাতারাতি দেশের স্বাস্থ্য খাতের চেহারা পাল্টে যেত; কিন্তু পরিতাপের বিষয়, আমাদের একশ্রেণীর চিকিৎসকের সঠিক সময় ব্যয় করে রোগ নির্ণয়ে ব্যর্থতায় রোগীরা অনেকটা বাধ্য হয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন।
আমাদের দেশে মূলত উন্নতমানের স্বাস্থ্যসেবার অভাব, চিকিৎসায় আস্থার সঙ্কট, ভুল রোগ নির্ণয় এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনায় রোগীরা বিদেশের চিকিৎসা গ্রহণে পাড়ি জমান। দেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি যে মানের হাসপাতাল ও চিকিৎসক রয়েছে, তারা আন্তরিক হলে এবং সময় নিয়ে রোগী দেখলে উপরোক্ত প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীভূত হবে এমনটি অনুভূত হয়।
ভারতসহ অপরাপর দেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একজন চিকিৎসক এক দিনে ১০ জনের বেশি রোগী দেখেন না। আমাদের দেশের চিকিৎসকরা ভারত ও অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ রোগী দেখলে তারা রোগ নির্ণয়ে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারতেন। সেই সাথে সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করে প্রার্থিত চিকিৎসাসেবা প্রদান করে রোগীর আস্থা অর্জনে সমর্থ হতেন। কিন্তু দেশের বেশির ভাগ চিকিৎসকের ক্ষেত্রে অর্থের লোভ তাদের এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে, তারা স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বেশি রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিতে পারলেই সন্তুষ্ট।
বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ আমাদের অজান্তে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে আমাদের চিকিৎসা খাতে উন্নয়ন ব্যয়সহ সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিদেশে ব্যয়িত এ বিপুল পরিমাণ অর্থের ব্যবহার রোধ করা গেলে এক দিকে দেশে স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ত এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হতো।
আমাদের বেসরকারি হাসপাতালের চেয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও দেখা যায়, একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে রোগীদের চাহিদানুযায়ী সেবা দেয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে এমনো শোনা যায়, যন্ত্রপাতি আমদানির পর এগুলো ব্যবহারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তা ছাড়া আমদানির ক্ষেত্রে বেশি ব্যয়ে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি আমদানির কারণে তা কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে।
আমাদের দেশে একশ্রেণীর চিকিৎসকদের বেলায় দেখা যায়, বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে অযথা ব্যবস্থাপত্রে ওষুধের পরিধি বৃদ্ধি করছেন। এমনও দেখা যায়, চিকিৎসকের চেম্বার থেকে রোগী বের হওয়া পরবর্তী ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি রোগীকে চিকিৎসক প্রদত্ত ব্যবস্থাপত্র দেখাতে বলেন। সেই সাথে দেখানো পরবর্তী তিনি তার মোবাইল ক্যামেরায় এটির ছবি ধারণ করেন। ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি যদি দেখতে পান, তার কোম্পানির ওষুধ বিষয়ে ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়নি; তিনি পরবর্তী সময় চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে তার প্রতি রূঢ় আচরণ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসককে দেখা যায়, নতশিরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধির রূঢ় আচরণ মেনে নিচ্ছেন।
বাংলাদেশের নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে কিছু উন্নত রাষ্ট্র আগ্রহ দেখিয়ে আসছে। জাপান সম্প্রতি ঢাকার উত্তরায় একটি আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালটিতে চিকিৎসা ব্যয় দেশের বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় কম হওয়ায় রোগীরা সেখানে চিকিৎসা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। হাসপাতালটিতে বিদেশী চিকিৎসকের পাশাপাশি দেশীয় কিছু ডাক্তারেরও চিকিৎসা কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ফলে দেশীয় চিকিৎসকরাও জাপানি ডাক্তারদের কাছ থেকে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেয়ার কৌশল রপ্ত করছেন।
অন্য দিকে চীনের উদ্যোগে উত্তরবঙ্গের নীলফামারী জেলায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নতমানের আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে এই আধুনিক হাসপাতালের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে উত্তরবঙ্গসহ পাশের দেশের নাগরিকরাও এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে সুযোগ পাবেন। চীনের উদ্যোগে আরো একটি আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা চলছে। তা ছাড়া তুরস্কও বাংলাদেশে আধুনিক চিকিৎসাসংবলিত হাসপাতাল স্থাপনে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। চীন, তুরস্ক ও অন্যান্য রাষ্ট্র এ দেশে আধুনিক হাসপাতাল স্থাপনে এগিয়ে এলে নিঃসন্দেহে এখানকার রোগীরা দেশে থেকেই উন্নতমানের আধুনিক চিকিৎসা লাভে সমর্থ হবেন। এতে এক দিকে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্য দিকে দেশে উন্নত ও আধুনিক মানের চিকিৎসা প্রদানের সক্ষমতা বাড়বে।
আমাদের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা এবং পদস্থ কর্মকর্তাদের অনেকে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীল নন। তাদের অনেকে সাধারণ মেডিক্যাল চেকআপের ক্ষেত্রেও বিদেশে স্বাস্থ্যসেবা নিতে যান। সরকারি ব্যয়ে তাদের চিকিৎসাসেবা সম্পন্ন করা হয়। এতে করে আমাদের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়। আমাদের পাশের রাষ্ট্র ভারতসহ থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এমনকি পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা এবং পদস্থ কর্মকর্তারা স্বদেশে চিকিৎসাসেবা নিয়ে স্বস্তি পান।
এ দেশে কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, পদস্থ ব্যক্তিদের চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠনপূর্বক বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। এ সুপারিশের আলোকে সরকারি অর্থ ব্যয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা করা হয়। দেশে সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যেসব উন্নতমানের ও আধুনিক হাসপাতাল রয়েছে, এগুলো মানসম্মত চিকিৎসা প্রদানে সক্ষম হলেও অজানা কারণে ভুক্তভোগী রোগী ও চিকিৎসকরা বিদেশে চিকিৎসা নিতে বেশি আগ্রহী। এমন মনোভাবে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার সঙ্কুচিত হচ্ছে।
চিকিৎসক এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণকারী সবার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটিয়ে দেশে চিকিৎসা প্রদান ও গ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে পারলে আস্থার সঙ্কট দূর হবে।
লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: [email protected]



