গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অবস্থা

দুঃখজনক হচ্ছে, আগস্টের পর এই ঘুষ-দুর্নীতিও কমেনি। আগের মতোই চলছে।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার নির্দেশে তার দোসররা পুলিশ-র‌্যাবের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমে তিন সপ্তাহ ধরে তাণ্ডব চালিয়ে দেড় সহস্র মানুষকে হত্যা এবং ২৫ সহস্রাধিককে পঙ্গু করেছে। এ দমন অভিযানে এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদের ১৪ দলীয় এমপিরা। তাদের নির্দেশে দলীয় ক্যাডাররা অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমেছিল। সুবিধাভোগী সরকারি কর্মকর্তা ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারদলীয় শিক্ষকরা এ দমন অভিযান সমর্থন করেছিলেন।

রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যেমন জানেন তাদের দলীয় এমপি ও সহযোগীদের কতটি বাড়ি, কতটি ফ্ল্যাট এবং কত একর জমি কোথায় আছে, তেমনি প্রতিটি ব্যাংকের ম্যানেজারেরও জানা তার শাখায় আওয়ামী লীগ নেতাদের ও তাদের পরিবারের এবং দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের কতটি হিসাবে কত টাকা জমা আছে। সরকার নির্বাহী আদেশে তাদের সব সম্পদ এবং ব্যাংক হিসাবগুলো ১০ আগস্টে জব্দ করলে ৫ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতাকে ওই সব নেতার বাড়িঘর ভাঙচুর করতে হতো না এবং সরকারের ভাবমর্যাদাও ক্ষুণ্ণ হতো না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে সব তফসিলি ব্যাংকের এমডিকে এ মর্মে নির্দেশ দেয়া যে, তাদের অধীনস্থ ব্যাংক শাখাগুলোতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও তাদের পরিবারের এবং দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারীদের ও তাদের পরিবারের নামে পরিচালিত সব অ্যাকাউন্টের লেনদেন স্থগিত রেখে হিসাবের তালিকা ও বিবরণীসহ দ্রুত নিজ নিজ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকে দাখিল করতে। যাচাই-বাছাই শেষে যেসব হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেন ছিল না সেসব হিসাবের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেয়া যেত। অবশ্য অর্থপাচার বন্ধে সন্দেহজনক লেনদেন হওয়া হিসাবের বিবরণী মাসিক ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর স্থায়ী চলতি নির্দেশ ২০০১ সাল থেকে কার্যকর থাকলেও স্বৈরাচারের সাড়ে ১৫ বছর বাংলাদেশ ব্যাংক তা পরিপালন না করায় এস আলম ও বেক্সিমকোসহ বিশেষ গোষ্ঠী হাজার কোটি টাকা নগদ উত্তোলনের সুযোগ পেয়েছিল। স্বৈরাচারের দোসরদের সম্পত্তি ও ব্যাংক হিসাব জব্দ করার পর তা যে তারা বৈধভাবে অর্জন করেছে তা প্রমাণ করতে পারলে তাদের সম্পত্তি ফেরত পেত; কিন্তু তা না করে তাদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার নামে দুদক-কে প্রমাণ করতে হচ্ছে- এ সম্পত্তি তারা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। কত বছরে দুদকের পক্ষে এ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে তা অনুমান করা সত্যিই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। চিহ্নিত টাকা পাচারকারীদের দেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করে বিদেশে পাচার করা অর্থ সেই দেশ থেকে ফেরত আনার প্রচেষ্টা সফল না-ও হতে পারে।

প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা স্বৈরাচারের দোসর সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং তফসিলি ব্যাংকের শীর্ষ পদে আসীন কর্মকর্তারা তাদের নিজেদের গা বাঁচাতে একজনও নিজেদের মন্ত্রণালয়/ব্যাংকে সংঘটিত অবাধ দুর্নীতির সঠিক চিত্র প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদের কাছে তুলে ধরেননি। অথচ খড়ের গাদায় লুকিয়ে থাকা সুচ খোঁজার দায়িত্ব তাদের দেয়া হয়েছে, যারা এই সুচ খড়ের গাদায় লুকিয়ে রেখেছেন।

সরকারি কোষাগার শূন্য করে দেশকে ঋণভারে জর্জরিত করে ব্যাংকগুলো দেউলিয়া বানিয়ে পতিত স্বৈরাচার দেশ ছেড়ে পালিয়েছ। সঠিক তথ্য প্রধান উপদেষ্টাকে অবহিত করা হলে তিনি তার ভাষণে জনগণের দাবি পূরণে নির্দিষ্ট সময়সীমা চেয়ে নিতে পারতেন; তাহলে ঢাকা শহর দাবি পূরণের মিছিলের নগরীতে পরিণত হতো না।

সমাজের সবচেয়ে সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা, অসৎ ব্যবসায়ী ও মতলববাজ রাজনীতিবিদ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মূল্যস্ফীতির চাপে ৩০ মাস ধরে পিষ্ট হতে থাকা জনগণ এ থেকে মুক্তি পেতে আন্দোলন করে স্বৈরাচারকে বিতাড়িত করেছে; কিন্তু পরবর্তী আট মাসেও দ্রব্যমূল্য জনগণের নাগালে না এলে তারা ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেও সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর আর তর সইছে না। সাধারণ জনগণ আশা করেছিল, সবার আগে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের একটি টেকসই কর্মকৌশল ঘোষণার দাবি উঠবে সর্বমহল থেকে; কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, স্বৈরাচারের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনৈতিকসহ দেশের সব খাত সংস্কারের চেয়ে ক্ষমতার পালাবদলের দিকেই কিছু রাজনৈতিক দলের দৃষ্টি আটকে আছে।

সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যে বাক্যবিনিময় হচ্ছে তা এবং চাঁদাবাজি নিয়ে যে অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে তা ৫০ দশকে প্রচলিত দু’টি গল্পের সাথে কাকতালীয়ভাবে মিলে যাচ্ছে। কারণ গত ৭০ বছরে আমরা একটুও বদলাইনি। ৫০ দশকের মাঝামাঝি আদালত নিয়ে একটি গল্প লোকমুখে প্রচলিত আছে। ঘটনাটি এমন, এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলার বিচারের শেষপর্যায়ে বাদি-বিবাদির আইনজীবীরা তাদের নিজ নিজ মক্কেলের পক্ষে ইংরেজি ভাষায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করছিলেন। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো নিরক্ষর আসামির কাছে তার উকিলের যুক্তির মধ্যে নিজের নাম ব্যতীত কিছু বোধগম্য না হওয়ায় ইশারায় উকিলকে কাছে ডেকে বলেছিলেন, ‘স্যার, আপনি যা বলছেন আমি তার কিছুই বুঝতে পারছি না’। উকিল সাহেব বিরক্তিসহকারে বলেছিলেন, ‘আপনার বুঝার দরকার নাই, জজ সাহেব বুঝতে পারলেই হলো’। আসামির প্রশ্ন ‘রায় আমার বিপক্ষে গেলে কী হবে’। উকিলের জবাব ছিল, ‘এক বছর জেল হতে পারে’। তখন আসামি বলেছিলেন, ‘জেল যখন আমাকে খাটতে হবে তাহলে আমার বুঝার দরকার নাই কেন’? তাদের এ কথোপকথন জজ সাহেব শুনতে পাওয়ায় তিনি বাংলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের আদেশ দিয়ে আসামির উৎকণ্ঠার নিরসন ঘটিয়েছিলেন। ভোটাধিকারসহ সংবিধান প্রদত্ত অন্যান্য মৌলিক অধিকারগুলো ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার মতো কোনো শাসক যাতে আর হরণ করতে না পারে তার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের যে অভিযান চলছে জনগণ তার মর্মার্থ ওই নিরক্ষর আসামির মতো অনুধাবন করতে চান। এর কারণ, শেখ হাসিনার মতো দ্বিতীয় স্বৈরাচারের আবির্ভাব ঠেকাতে সংস্কার অবশ্যই হতে হবে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ছিল- পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানের ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর মার্শাল ‘ল’ জারির পরের। বরাবরের মতো এক ব্যক্তি একটি মামলার আর্জির নকল কপি পেতে পেশকারের কাছে গিয়ে কানে কানে বলেছিলেন, ‘স্যার আপনাকে দু’টি টাকা দিচ্ছি আমাকে ওমুক মামলার আর্জির একটি নকল কপি দেয়ার ব্যবস্থা করেন’। এ কথা শুনে পেশকার রেগে বলেছিলেন, ‘ঘুষ-দুর্নীতি উচ্ছেদের জন্য আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করেছেন। আর তুমি আমাকে ঘুষ দিয়ে আমার চাকরি খেতে চাচ্ছ। তোমাকে এখনই মিলিটারির হাতে সোপর্দ করব।’ দূর থেকে একজন মোক্তার ওই কথা শুনতে পেয়ে ওই ব্যক্তিকে পেশকারের হাত থেকে মুক্ত করে এনে জানতে চেয়েছিলেন- নকলটি কি তার খুব প্রয়োজন? ভিলেজ পলিটিক্সের মামলার শিকার ওই ব্যক্তি বলেছিলেন, নকলটি পাওয়া খুব প্রয়োজন। শুধু ফৌজদারি মামলা পরিচালনার যোগ্য মোক্তাররা উকিলদের চেয়েও বেশি ধড়িবাজ ছিলেন। তাই পেশকারের সাথে পাঁচ টাকায় দফা করে আর্জির সিলমোহর করা নকলের কপি এনে ওই ব্যক্তির হাতে দিয়ে বলেছিলেন, ১০ টাকা লেগেছে। তেমনিভাবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, জুলাই ৩৬ আন্দোলনের পর চাঁদাবাজির অশুভ প্রতিযোগিতা উপরিক্ত ঘটনার মতো খানিকটা হয়েছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। সরকারি অফিসে এখনো অনেক কাজ করতে গিয়ে আগের মতো মানুষকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। যেমন- বন্দুকের লাইসেন্স নবায়ন ফি পাঁচ হাজার টাকা অপরিবর্তিত থাকলেও এলআর ফান্ডের নামে ডিসি অফিসের চাঁদা ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে চার হাজার টাকা করা হয়েছে। অথচ এ টাকা কোনো সরকারি খাতে জমা না হয়ে ডিসির নামে খোলা হিসাবে জমা হওয়ায় তা এজির নিরীক্ষার আওতাভুক্ত হয় না। অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রার অফিস, উপজেলা ভূমি অফিস, উপজেলা ভূমি জরিপ অফিস এবং ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ঘুষ-দুর্নীতির কারণে ভূমির মালিকানা ও রেকর্ড-সংক্রান্ত সব মামলার উদ্ভব হয়। দুঃখজনক হচ্ছে, আগস্টের পর এই ঘুষ-দুর্নীতিও কমেনি। আগের মতোই চলছে।