ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে আমরা। নির্বাচন নিয়ে আলোচনা সর্বত্র। কেউ বলছেন, এটি ক্ষমতা বদলের নির্বাচন। কেউ বলছেন, এটি জাতির বাঁক বদলের নির্বাচন। কেউ আবার মনে করছেন, এটি রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণের নির্বাচন।
এই তিনটি ব্যাখ্যার ভেতরে একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে। আমরা কী ধরনের রাষ্ট্র হতে চাই? গণতান্ত্রিক? নাকি কেবল নির্বাচনী? রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন, ‘একটি নির্বাচন তখনই টার্নিং পয়েন্ট হয়, যখন তা কেবল সরকার বদলায় না; বরং রাজনৈতিক আচরণের নিয়ম বদলে দেয়।’ এই সংজ্ঞা সামনে রাখলে এবারের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু দলবদলের প্রশ্ন নেই। এখানে নিয়ম বদলের প্রশ্ন আছে। ‘টার্নিং পয়েন্ট নির্বাচন’ কাকে বলে? রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ‘টার্নিং পয়েন্ট ইলেকশন’ বলতে বোঝায় এমন নির্বাচন, যা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস ঘটায়। নির্বাচনী জোট বদলে যায়। বদলে যায় ভোটার। বদলে যায় রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য। বদলে যায় রাজনীতির ভাষা। রবার্ট ডাল বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের শক্তি নির্বাচন নয়; বরং নির্বাচনের অনিশ্চয়তা।’ অর্থাৎ ফল আগে থেকে জানা থাকলে সেটি নির্বাচন হলেও গণতন্ত্র নয়। এবারের নির্বাচনের ফলাফল কার পক্ষে যাবে তা আগেভাগে বলা যাচ্ছে না। এর মানে অনিশ্চিত? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে টার্নিং পয়েন্টের সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘ দিন ধরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। নেতার নামেই দল। দলের পরিচয় নেতার ভেতর সীমাবদ্ধ; কিন্তু এবারের নির্বাচনে ভিন্ন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দলীয় পরিচয় আবার সামনে আসছে। ইশতেহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। নীতির প্রশ্ন উঠছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ দলকেন্দ্রিক রাজনীতি গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকতা দেয়। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি গণতন্ত্র দুর্বল করে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গুইয়ের্মো ওডোনেল বলেছেন, ‘প্রতিষ্ঠান শক্ত না হলে গণতন্ত্র ব্যক্তির দয়ায় টিকে থাকে।’ বাংলাদেশ কি ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠানমুখী হতে যাচ্ছে? এই নির্বাচন তার ইঙ্গিত দিতে পারে।
বিএনপি দীর্ঘ দিন ক্ষমতার বাইরে। রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ছিল; কিন্তু এখন তারা আবার কেন্দ্রে। এটি শুধু একটি দলের প্রত্যাবর্তন নয়। এটি দুই-দলীয় রাজনীতির পুনরুজ্জীবন। চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর কেউ কেউ ধরে নিয়েছিলেন এবারের নির্বাচনে হবে একচেটিয়া— বিএনপি হেসে খেলে বিজয়ী হবে, ক্ষমতায় যাবে; কিন্তু সেই অবস্থাটি নেই। পরিস্থিতি বদলে গেছে। শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সামনে এসে গেছে জামায়াতে ইসলামী। ভোটের হিসাব বদলে গেছে। পুরনো হিসাব মিলছে না। গণতন্ত্রের স্বার্থে এটি ভালো হয়েছে। দুই শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। প্রতিযোগিতা না থাকলে জবাবদিহি থাকে না। আদাম প্রজেভর্স্কি বলেছেন, ‘গণতন্ত্র হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে শাসকরা নির্বাচনে হারতে পারে।’ এখানে ‘শাসক’ বিএনপি, ক্ষমতায় যাওয়ার তারাই সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার। যদি হারার সম্ভাবনা বাস্তব হয়, তবেই গণতন্ত্র অর্থবহ।
জামায়াতে ইসলামীর শক্তিবৃদ্ধি একটি বাস্তবতা। এটি অস্বীকার করা যাবে না। প্রশ্ন হলো, এ দিয়ে কী বোঝায়? ভোটার মেরুকরণ? নাকি আদর্শিক পুনর্গঠন? ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত রাজনৈতিক সঙ্কটে শক্তিশালী হয়েছে। নব্বইয়ের পর। ২০০১ সালের আগে এবং এখন। এটি বলে দেয়, বাংলাদেশের সমাজে একটি অংশই বদলে গেছে। তরুণরা জামায়াতকে পছন্দ করছে। পছন্দ করছে নারীরাও। উদাহরণ পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের ভূমিধস বিজয়। তরুণরা মনে করেন চব্বিশের জুলাইকে জামায়াত ধারণ করেছে, এর পক্ষে তারা। নারীরা মনে করছেন জামায়াত তাদের কাছে নিরাপদ। ৫ আগস্টের পর দেশের মানুষ বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের কাজ দেখেছে। এই সময়ে কে কী করেছে তার আমলনামা ভোটারদের সামনে। ভবিষ্যতে কে কী করবে সেটি বুঝতে রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই। দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। আরেকটি বিষয়, দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলিম। বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি বোঝা অসম্ভব।
একটি প্রশ্ন উঠেছে যে, এই নির্বাচন রাষ্ট্রকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা দেবে, না দুর্বল করবে? দীর্ঘ দিন একই ধরনের রাজনীতি দেখে ভোটাররা ক্লান্ত। তারা পরিবর্তন চান। কিন্তু কী ধরনের পরিবর্তন? শুধু মুখ বদল? নাকি শাসনের ধরন বদল? এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেবল মুখ বদল হয়, তবে এটি ক্ষমতা বদলের নির্বাচন। যদি শাসনের ধরন বদলায়, তবে এটি রাষ্ট্র রূপান্তরের নির্বাচন। এবার রাষ্ট্র মেরামতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চার কোটি ৩০ লাখ তরুণ ভোটার। ১৮ থেকে ৩৮ বছর বয়স। এই সংখ্যাটি বিশাল। এই ভোটারদের অনেকেই কখনো ভোট দিতে পারেননি। এরা ডিজিটাল প্রজন্ম। তথ্যপ্রবাহে অভ্যস্ত। তারা প্রশ্ন করেন। তারা নেতা মানেন না, তারা ব্যাখ্যা চান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রোনাল্ড ইঙ্গলহার্ট বলেছেন, ‘নতুন প্রজন্ম অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পর রাজনৈতিক মর্যাদা চান।’ এই তরুণরা শুধু চাকরি নয়, সম্মান চান। স্বাধীনতা চান। ন্যায়বিচার চান। তারা যদি সংগঠিতভাবে ভোট দেন, তবে সমীকরণ বদলাতে পারে।
এই নির্বাচন কি কেবল ক্ষমতার প্রশ্ন? না। এটি রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রশ্ন। রাষ্ট্রের চরিত্র কেমন হবে, নির্বাচন-নির্ভর কর্তৃত্ববাদী? নাকি নাগরিক-নির্ভর গণতান্ত্রিক? রাষ্ট্র কি হবে দলীয় রাষ্ট্র? নাকি সাংবিধানিক রাষ্ট্র? রাষ্ট্র কী হবে-নেতাকেন্দ্রিক? নাকি প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ভোটে নির্ধারিত হবে।
এই নির্বাচন যদি ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করে, তবে এটি সফল। সংসদ শক্তিশালী হবে। বিরোধী দল কার্যকর হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীন হবে। মিডিয়া সাহস পাবে। এটাই ব্যালান্স অব পাওয়ার।
নির্বাচনের ফল যা-ই হোক সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তিনটি— এক. গ্রহণযোগ্যতা। পরাজিত পক্ষ ফল মেনে নেবে কি না। দুই. সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ। রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা। তিন. সংস্কার। নির্বাচনের পর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করা। সংস্কার ছাড়া কোনো পরিবর্তন টেকসই হয় না।
এবারের নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রতিযোগিতা নয়। এটি ক্ষমতার পুরনো কাঠামো ভাঙার পরীক্ষা। এটি রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা টিকে থাকার লড়াই। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ একটি দল হিসেবে চূড়ান্তভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। এই ধারণা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ রাজনীতিতে টিকে থাকতে হলে তিনটি জিনিস দরকার— জনসমর্থন, নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা। এই তিনটির কোনোটিই আওয়ামী লীগের নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন বলেছেন, ‘রাজনৈতিক দল টিকে থাকে তখনই, যখন তারা পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আওয়ামী লীগ কখনো পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি; বরং তারা পরিবর্তনকে দমন করেছে। এটাই তাদের ধ্বংস করেছে।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে এটি কোনো গোপন তথ্য নয় যে, আওয়ামী লীগের ক্ষমতার বড় ভরকেন্দ্র ছিল ভারত। ৫ আগস্ট শুধু একটি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন নয়; এটি একটি ভারতনির্ভরতারও পতন। অনেকের চোখে, এটি ভারতের আধিপত্যের ওপর রাজনৈতিক ধাক্কা। ভারত এখনো এই বাস্তবতা মানতে পারছে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্টিফেন ক্রাসনার বলেছেন, ‘যখন একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়ে পড়ে।’ আওয়ামী লীগ ভারতকে ত্রাতা ভেবে দেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদা বিকিয়ে দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের এই দুর্বলতা শুধু তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, দেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছিল।
বাংলাদেশের জনগণ আর এই দুর্বলতা মেনে নিতে চায় না। মানবে না।
ভারতপন্থী তকমা নিয়ে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দল কি টিকবে? খুব সরল উত্তর, না। এ দেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে শক্তিশালী আবেগ হলো জাতীয় মর্যাদা। যে দল জনগণের চোখে ভারতনির্ভর বলে পরিচিত হবে, সে দল বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে ভোট হারাবে। ভোট হারালে রাজনীতি শেষ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ডেভিড ইস্টন বলেছেন, ‘রাজনৈতিক ব্যবস্থার টিকে থাকার ভিত্তি হলো জনসমর্থন।’ এই জনসমর্থন ভারতপন্থী অবস্থান দিয়ে আর পাওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে এখন দু’টি পক্ষ। জনগণ এবং রাজনৈতিক এলিট। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে জনগণ। কারণ নির্বাচন জনগণের হাতেই। রাজনৈতিক এলিটরা কৌশল করতে পারে। জোট বানাতে পারে। বক্তৃতা দিতে পারে; কিন্তু ব্যালট বাক্সে তারা কিছু করতে পারে না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘গণতন্ত্র মানে জনগণের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ বণ্টন।’ এই বণ্টনের দিনে জনগণই বিচারক। এই নির্বাচন একটি লিটমাস টেস্ট। কে কার পাশে দাঁড়ায় সেটিই বিবেচনা করবে ভোটাররা। কে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে আর কে ভারতের স্বার্থের পক্ষে— তা ভোটাররা লক্ষ করবে। যদি কোনো দল ভারতঘেঁষা বলে প্রতীয়মান হয়, তারা শাস্তি পাবে। যদি কোনো দল সার্বভৌমত্বের পক্ষে দৃঢ় থাকে, তারা পুরস্কৃত হবে। এটিই রাজনীতির নতুন বাস্তবতা। ভবিষ্যতের বাংলাদেশে ভারতনির্ভর রাজনীতি নয়, ভোটনির্ভর রাজনীতি টিকবে। এই নির্বাচন সেই দিকনির্দেশনা দেবে। ফল যাই হোক, একটি বিষয় পরিষ্কার, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন থেকে টিকে থাকার শর্ত একটাই। জনগণের পক্ষে থাকা। এর বাইরে কোনো পথ নেই।
এবারের নির্বাচন কেবল ব্যালটে সিল দেয়ার দিন নয়। এটি একটি সিদ্ধান্তেত্মর দিন। ইতিহাস বলে, যখন জনগণ চায়, অসম্ভবও সম্ভব হয়। প্রমাণ আমাদের সামনে। ৫ আগস্ট। এই নির্বাচন যদি জনগণের সেই চাওয়ার প্রতিফলন হয়, তবে এটি সত্যিকারের টার্নিং পয়েন্ট হবে। না হলে, এটি আরেকটি সংখ্যা হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়। পছন্দ আমাদের। দায়িত্বও আমাদের।
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন



