প্রফেসর ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রচলিত এফপিটিপি ব্যবস্থা থাকবে, নাকি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু হবে। ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা করে দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে নিম্নকক্ষে প্রচলিত এফপিটিপি এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতির নির্বাচনের কথা বলেছে।
বড় দলগুলোর মধ্যে বিএনপি সংসদের দুই কক্ষেই প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচনের পক্ষে। বিএনপির প্রস্তাব অনুসারে সংসদের নিম্নকক্ষে প্রচলিত এফপিটিপি ও উচ্চকক্ষে নিম্নকক্ষের এমপি অনুপাতে আসন বণ্টনের মাধ্যমে (নারী আসনে প্রচলিত নির্বাচনের মতো) মনোনীত ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার পক্ষে মত দিয়েছে। অন্য বৃহৎ দল জামায়াতে ইসলামী সব কক্ষেই আনুপাতিক নির্বাচনের প্রস্তাব করেছে। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনও একই ধরনের প্রস্তাব করেছে। এনসিপি ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছে।
ঐকমত্য কমিশন সংসদের উচ্চকক্ষে যে আনুপাতিক নির্বাচনের প্রস্তাব করেছে আমি তা বজায় রাখার পক্ষে। সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে এই আসন দেয়া যেতে পারে। তবে নিম্নকক্ষের নির্বাচনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বে কিছু ভালো দিক থাকলেও এ সময়ে প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তন সঙ্গত হবে বলে মনে করি না। সংসদের নিম্নকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন অনেক দেশে অনুসৃত মডেল হলেও বাংলাদেশ বা অনুরূপ রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এর বাস্তবায়নে কিছু জটিলতা রয়েছে। কেন এটি কাঙ্ক্ষিত নাও হতে পারে, তার কিছু প্রধান কারণ বিশ্লেষণ করছি :
ভৌগোলিক প্রতিনিধিত্ব হারিয়ে যায় : বর্তমান পদ্ধতিতে (একক আসনভিত্তিক ঋরৎংঃ-চধংঃ-ঞযব-চড়ংঃ পদ্ধতি) প্রতিটি এলাকার জন্য নির্দিষ্ট একজন সংসদ সদস্য থাকেন, যিনি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হলে একটি জাতীয় ভোটে দলের মোট ভোটশেয়ার অনুযায়ী আসন ভাগ হয়। এতে স্থানীয় জনগণের নির্দিষ্ট একজন ‘এমপি’ থাকেন না, ফলে জনগণের সাথে সরাসরি যোগসূত্র দুর্বল হয়।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও খণ্ডিত সংসদ : আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বে সাধারণত বড় দু’টি দলের বাইরেও অসংখ্য ছোট দল সংসদে প্রবেশ করে। এর ফলে সরকার গঠনে জোট বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা, বারবার নির্বাচন ও প্রশাসনিক জট তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশে যেখানে ইতোমধ্যেই দলভিত্তিক বিভাজন তীব্র, সেখানে ছোট ছোট স্বার্থান্বেষী দল সংসদে ঢুকে রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি বাইরের হস্তক্ষেপের সুযোগও তৈরি হয়।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও দলীয় ক্ষমতা বৃদ্ধি : পিআর ব্যবস্থায় আসন বণ্টন দলীয় তালিকা থেকে হয়। এর মানে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বই ঠিক করবে কে এমপি হবে, জনগণ সরাসরি ব্যক্তিকে বেছে নিতে পারবে না। এতে জনগণের সাথে এমপির সরাসরি দায়বদ্ধতা কমে যায়, আর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কর্তৃত্ব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা : ভৌগোলিক আসন না থাকায় সীমান্তবর্তী বা প্রান্তিক এলাকার সমস্যাগুলো সংসদে তেমন করে প্রতিফলিত নাও হতে পারে। বড় শহরভিত্তিক ভোটই বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।
প্রশাসনিক ও কারিগরি জটিলতা : বাংলাদেশে নির্বাচনব্যবস্থা ও কমিশনের সক্ষমতা এখনো বিতর্কিত। পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়ন করলে জটিল গণনা, দলীয় তালিকা ব্যবস্থাপনা, আসন বণ্টন ইত্যাদিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এতে আবারো ‘কারচুপি’ বা ‘প্রভাব খাটানোর’ সুযোগ তৈরি হতে পারে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তবতা : আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বেশি কার্যকর হয় যখন দেশে দীর্ঘস্থায়ী গণতান্ত্রিক চর্চা, স্বচ্ছ দলীয় রাজনীতি ও জোট সংস্কৃতি বিদ্যমান থাকে। বাংলাদেশে এখনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ব্যক্তিনির্ভর ও মুখ্যত দ্বি-দলীয় মেরুকৃত। এই অবস্থায় পিআর পদ্ধতি কার্যকর হওয়ার চেয়ে অচলাবস্থা ও স্বার্থকেন্দ্রিক ছোট দলের ক্ষমতার দৌরাত্ম্য বাড়াতে পারে। এমনকি তাদের ২০-২৫ শতাংশ সমর্থন এবং মিত্র দলগুলোর সহযোগিতায় ফ্যাসিবাদের আবার ফিরে আসার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
ওপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে আমি নিচে নিম্নকক্ষে এফপিটিপি ও পিআর পদ্ধতির সুবিধা-অসুবিধার তুলনামূলক চার্ট উপস্থাপন করছি।
সংক্ষেপে বলা যায় : বাংলাদেশের মতো দেশে সংসদের নিম্নকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভৌগোলিক দায়বদ্ধতার অভাব এবং দলীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্ব বাড়িয়ে তুলতে পারে। এ জন্য সাধারণত নিম্নকক্ষে সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি রাখাই বেশি যৌক্তিক, তবে দ্বিকক্ষীয় সংসদ হলে উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের কিছু উপাদান রাখা যেতে পারে।
আরেকটি বিবেচনা গুরুত্বপূর্ণ- সেটি হলো আইনী বাধ্যবাধকতায় সংস্কারের মাধ্যমে এখন নিম্নকক্ষেও পিআর হলে সেটি কার্যকর করার পর দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতা নিয়ে নতুন করে সংশোধনী এনে আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমান অবস্থায় দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্টতা পাওয়া কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু পিআর পদ্ধতিতে সেটি এক প্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নিম্নকক্ষে এফপিটিপি রেখে উচ্চ কক্ষ যদি থাকে সেখানে পিআর বা মিশ্র পদ্ধতি দেয়া যেতে পারে যাতে বহুমতের প্রতিফলনও হয়, আবার স্থিতিশীলতাও থাকে। এটি করা হলে নির্বাচনপদ্ধতি নিয়ে বড় দুই দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে নির্বাচন নিয়ে যে অচলাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে তার মধ্যবর্তী একটি সমাধান বেরিয়ে আসতে পারে।
লেখক : ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স এবং সাবেক ডিন ও অধ্যাপক ডিপার্টমেন্ট অব ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



