অনিল ত্রিগুনায়েত
সম্প্রতি ইউরোপ ও পররাষ্ট্রবিষয়ক ফরাসি মন্ত্রী জঁ- নোয়েল ব্যারো ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সাথে সাক্ষাৎকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন যে, ফ্রান্স জি৭-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে (যেখানে ভারত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী আমন্ত্রিত রাষ্ট্র) এবং ভারত ২০২৬ সালে ব্রিকসের সভাপতি, আর উভয় কৌশলগত অংশীদারের বহুপক্ষীয়তা শক্তিশালী করতে সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। উভয় দেশ এ বিষয়টিতে বিশ্বাস করে। সেই সাথে একে সমর্থন জানায়। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ আরো জোর দিয়ে বলেছেন, ‘ভারত ব্রিকসের সভাপতি হতে যাচ্ছে। আমি ভারতের সাথে কাজ করে সেতুবন্ধ বিনির্মাণ করতে চাই। ব্রিকস রাষ্ট্রগুলো যেন জি৭ বিরোধী না হয়। একইসাথে জি৭ যেন ব্রিকসবিরোধী না হয়ে ওঠে। এটি ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, উদীয়মান বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা এবং সঙ্ঘাতমূলক নয় বরং সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার স্বীকৃতি। একটি আদর্শবাদী প্রেক্ষাপটে প্রকৃতপক্ষে বাস্তব সম্মিলনের সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ জি৭ বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্য সংযোজিত পরিষেবাগুলোর ক্ষেত্রে প্রাধান্য বিস্তার করে। এ ছাড়া প্রধান প্রধান বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও মুদ্রাগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। অন্যদিকে ব্রিকস হতে পারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন কেন্দ্র, যেখানে রয়েছে পণ্য, ব্যবহার এবং উৎপাদন সক্ষমতা ও জনশক্তিসহ বিশাল বাজার। যেগুলো বৈশ্বিক মূল্য সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো শক্তিশালী হবে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর এবং ২০২৬ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে ইইউ নেতাদের সফরের মাধ্যমে; যা একটি বিশেষ সম্মান ও বিশেষ অংশীদারত্বের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি।
এই বিবৃতি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক আলোচনায় একতরফাবাদই প্রধান প্রবণতায় পরিণত হয়েছে, যার সাম্প্রতিক উদাহরণ ভেনিজুয়েলায় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। একইসাথে ৬৬টি আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সংস্থা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরে দাঁড়ানো। ট্রান্সআটলান্টিক জোটও নজিরবিহীন এক চাপের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ফলে, ক্ষুদ্র ও বহুপক্ষীয় জোটগুলোর মধ্যে এবং পারস্পরিকভাবে আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা অবাক করার মতো কিছু নয়।
যাই হোক না কেন, স্পেকট্রামের দু’টি বিপরীত প্রান্তে অবস্থানকারী বলে যাকে ধারণা করা হয়, সেই ব্রিকস ও কোয়াডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারত বিশ্বাস করে, ব্রিকস পশ্চিমাবিরোধী নয়। বরং একটি অপশ্চিমা বিকল্প, যা চীন ও রাশিয়াকে পি-৫ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে গ্লোবাল সাউথের প্রধান অর্থনীতি ও দেশগুলোর আন্তঃমহাদেশীয় আকাক্সক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে। ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’, অর্থাৎ ‘বিশ্ব একটি পরিবার’, এ বৈদেশিক নীতি কাঠামোর মধ্যে নিহিত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভারত পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের সাথে জুড়ে থাকা ভিন্নধর্মী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি বিশ্বাসযোগ্য সেতু ও সেতু নির্মাতা হিসেবে সহজে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
মার্কিন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার জিম ও’নিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সাথে প্রতিশ্রুতিশীল ও উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে ব্রিক গোষ্ঠীর ধারণা উপস্থাপন করার পর থেকে এটি দক্ষিণ আফ্রিকা, ইথিওপিয়া, মিসর, ইরান, ইন্দোনেশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ একাধিক মধ্যম শক্তিধর দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে দশ সদস্যে উন্নীত হয়েছে। সৌদি আরব আগ্রহ দেখিয়ে বৈঠকগুলোতে অংশগ্রহণ করছে। যদিও আর্জেন্টিনা নতুন যুক্তরাষ্ট্রপন্থী রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে এতে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাজান শীর্ষ সম্মেলনে, সহযোগী সদস্যদের অংশীদার রাষ্ট্র হিসেবে রাখার সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়েছিল। কারণ দুই ডজনেরও বেশি রাষ্ট্র ব্রিকসে যোগ দেয়ার ব্যাপারে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে; যা একটি অস্থিতিশীল বিশ্বব্যবস্থায় নতুন উচ্চতা অর্জন করেছে।
ব্রিকস বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে ব্যতিক্রমী মানবসম্পদের অধিকারী সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত। এ ছাড়াও এটি বিশ্বব্যাপী জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের অংশীদার, যা জি৭-এর সাথে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থান দেখায়। চীন ও ভারত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সেই সাথে ভারত সম্প্রতি জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠেছে। এটি জ্বালানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উৎপাদনকারী ও ভোক্তা রয়েছে এমন একটি গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। সেই সাথে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তিতে প্রশংসনীয়ভাবে প্রভাবশালী। এ গোষ্ঠী পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক স্বার্থে বিশ্বাস করে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভিন্নতর ব্যবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও এটি উচ্চ কূটনৈতিক গুরুত্ব ও বিপুল পরিসরের সুবিধা উপভোগ করে।
২০২৬ সালে সভাপতি হিসেবে ভারত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন এবং বাণিজ্য, সংযোগ, মুদ্রা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রম থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও ফিনটেক, শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা এবং যুব ও ক্রীড়া বিনিময় পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন খাতভিত্তিক বিপুলসংখ্যক বৈঠকের আয়োজন করবে। ব্রিকস ও ভারতের জন্য একটি প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ও অত্যাবশ্যকীয়তা, বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘ ও জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বেলায়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিজয়ী ও পরাজিতের মানসিকতায় আবদ্ধ পি-৫ (স্থায়ী পাঁচ) ভেটো ক্ষমতায় ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তদুপরি, এমএজিএ সমর্থকগোষ্ঠী দ্বারা প্রভাবিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃষ্টিতে, আর্থিক উপকরণগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাটা একটি একমুখী প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। সেটা তাদের নিজস্ব বিশেষাধিকার, আর ডি-ডলারাইজেশন হলো বড় রেডলাইন। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিশানায় রয়েছে পাঁচটি মূল ব্রিকস রাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা, যাদের উচ্চ ও অযৌক্তিক শুল্কের খেলায় চাপে রাখা হচ্ছে।
ব্রিকস চেষ্টা করছে, আধিপত্য ও নির্দেশনা থেকে মুক্ত একটি কার্যকর বিকল্প উপস্থাপনের; বিশেষ করে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে। যদিও এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বৃহত্তম গণতন্ত্র থেকে শুরু করে সর্বাত্মক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রও বিদ্যমান। কিন্তু বহুমেরুত্ব ও বিকল্পগুলো আরো শক্তিশালী করে তোলে এর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং আরো উপযোগী, সহযোগিতামূলক ও ঐকমত্যভিত্তিক একটি পরিসর দেয়। একটি নতুন ব্রিকস মুদ্রা তৈরির প্রচেষ্টা চলছে, যদিও একতরফা ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং আর্থিক উপকরণগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করায় এই প্রবণতা শুরু হওয়ায় রাষ্ট্রগুলোকে জাতীয় মুদ্রায় লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত করতে বাধ্য করা হয়েছে। তবু ভারতসহ কিছু রাষ্ট্র এ বিষয়ে এখনো এ ব্যাপারে পুরোপুরি আস্থাশীল নয়। এ প্রবণতা অনাগত সময়ে বহুমেরুত্বে একটি প্রধান গুণনীয়ক হিসেবে পরিণত হতে পারে।
একক বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তে, বহুমেরুত্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে: ব্রিকসের মূল পাঁচটি দেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা গতিশীলতায় ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা রয়েছে, রাশিয়া ইউরেশিয়ার নিরাপত্তা গতিশীলতাকে আকৃতি দেয়। চীন পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত হিসাব-নিকাশে আধিপত্য বিস্তার করে। ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাধারণভাবে বিশ্বব্যাপী দক্ষিণে প্রভাব বিস্তার করে ভারত। ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভূমিকা পালন করে। এ বিকেন্দ্রীকরণ বিশ্বব্যাপী অভিন্নতা কমায়। কিন্তু আঞ্চলিক ক্ষমতা প্রতিযোগিতা বাড়ায়। কখনো কখনো স্থানীয় অস্থিতিশীলতা তীব্র করে। এর একটি অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ, ব্রিকসের মতো একটি সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগী শক্তিগুলো একীকরণ প্রক্রিয়া ধীর করে দিতে পারে। সেই সাথে আধিপত্যবাদী প্রকল্পগুলো বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
চিত্তাকর্ষক বিষয় হলো, কিছু অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ভারতকেও ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সাথে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনকারী হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ভারতকে কিছু ভুল ধারণা দূর করার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করা দল ও শিবিরগুলোর মধ্যে আরো ভালো বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মাধ্যমে শূন্য অঙ্কের খেলায় সৃষ্ট ব্যবধান পূরণের একটি অনন্য সুযোগ দেবে। সারা বিশ্বের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী সংহতি প্রয়োজন।
ব্রিকস বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপনে কাজ করছে না, বহুমেরুবিশিষ্ট সহযোগিতামূলক কাঠামো পুনর্গঠনের আশা করছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া; কিন্তু একটি শক্তিশালী শক্তি; যা ততক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী হতে থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ভণ্ডামিতে লিপ্ত হবে। এ ছাড়া তাদের গড়ে তোলা নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করবে, যেগুলো তারা নিজেরা একতরফা ও এককেন্দ্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে নির্মাণ করেছিল। ভারত হলো যুক্তির একটি কণ্ঠস্বর, যে সংলাপ ও কূটনীতি এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের মাধ্যমে বিভেদ দূর করায় বিশ্বাস করে, প্রতিস্থাপনে নয়।
২০২৬ সালে ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্ব চলাকালীন এ নীতি অব্যাহত থাকবে। যেখানে বহুমেরুত্ব এবং বহুপক্ষীয়তায় কাজ করা হবে, যা গুরুতর হুমকির মুখে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ব্রিকসকে (বিআরআইসিএস) যথাযথভাবে পুনঃসংজ্ঞায়িত করেছেন, যার অর্থ হলো ‘সহযোগিতা ও স্থায়িত্বে প্রতিরোধ ক্ষমতা ও উদ্ভাবন বিনির্মাণ করা’ (বিল্ডিং রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড ইনোভেশন ফর কো-অপারেশন অ্যান্ড সাসটেইন্যাবিলিটি)। তিনি আরো বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদকে নিন্দা জানানো আমাদের নীতি হওয়া উচিত, কেবল সুবিধার জন্য নয়।’
লেখক : প্রাক্তন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এবং বর্তমানে বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন ভারতীয় থিংকট্যাংকের ফেলো



