গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী শব্দটি যদি হয় ‘জনগণ’, তবে তার সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রয়োগের নাম ‘গণভোট’। প্রতিনিধির মাধ্যমে নয়, সরাসরি জনগণের মতামত– রাষ্ট্রের কোনো মৌলিক সিদ্ধান্তে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’– এই সরল কিন্তু গভীর প্রক্রিয়াই গণভোট। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় জবভবৎবহফঁস। এটি কেবল ভোট নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে জনগণের সরাসরি রায়।
সাধারণ নির্বাচন ও গণভোটের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচন হয় প্রতিনিধি বাছাইয়ের জন্য– কে সরকার চালাবে, কে আইন প্রণয়ন করবে। কিন্তু গণভোট হয় নীতিগত বা সাংবিধানিক প্রশ্নে– রাষ্ট্র কোন পথে যাবে, কী ধরনের শাসনব্যবস্থা হবে, সংবিধানে কী পরিবর্তন আসবে। নির্বাচন নিয়মিত প্রক্রিয়া; গণভোট ঐতিহাসিক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত।
বাংলাদেশ এখন ঠিক সেই রকম একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
গণভোটের ধারণা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
গণভোট কোনো নতুন বিষয় নয়। বিশ্বের বহু দেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের আগে জনগণের সরাসরি মতামত নেয়া হয়েছে।
ব্রিটেনে ব্রেক্সিট–ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হবে কি না– এ প্রশ্নে গণভোট হয়েছে।
স্কটল্যান্ড স্বাধীন হবে কি না– গণভোট হয়েছে।
ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইতালি– নিয়মিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ নীতিতে গণভোটের আশ্রয় নেয়।
বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডে নাগরিকরা প্রায়ই সরাসরি ভোট দিয়ে আইন পরিবর্তন করে। অর্থাৎ গণতন্ত্রের সর্বোচ্চ রূপই হচ্ছে গণভোট , যেখানে জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা।
বাংলাদেশেও ইতিহাসে গণভোটের নজির আছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। সেটি ছিল রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্নে একটি বড় মুহূর্ত। ফলে গণভোট কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি এক ধরনের সামাজিক ঐকমত্য তৈরির পদ্ধতি।
নির্বাচন বনাম গণভোট
অনেকেই নির্বাচন আর গণভোটকে এক করে ফেলেন। কিন্তু এ দুটির চরিত্র আলাদা। নির্বাচনে আপনি একজন ব্যক্তি বা দলকে ভোট দেন। গণভোটে আপনি একটি নীতি বা প্রস্তাবে মত দেন।
নির্বাচনে জিতে কেউ সরকার গঠন করে। গণভোটে জিতে যায় জনগণের সিদ্ধান্ত। একটি প্রতিনিধিত্বমূলক; অন্যটি সরাসরি গণতন্ত্র।
তাই সংবিধান সংশোধন, শাসনব্যবস্থার কাঠামো বদল, জাতীয় স্বাধীনতা বা রাষ্ট্রের চরিত্রগত পরিবর্তনের মতো প্রশ্নে গণভোটের প্রয়োজন হয়।
জুলাই বিপ্লব ও গণভোটের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় গণভোটের প্রশ্নটি আরো তাৎপর্যপূর্ণ। জুলাই বিপ্লব শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর সংস্কারের দাবি। দীর্ঘদিনের দলীয়করণ, নির্বাচন ব্যবস্থার অনাস্থা, প্রশাসনিক পক্ষপাত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সঙ্কট– সব কিছুর বিরুদ্ধে একটি সামাজিক বিস্ফোরণ।
অনেকে একে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ বলছেন, কারণ এটি স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের লড়াই।
এই বাস্তবতায় শুধু নির্বাচন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কে ক্ষমতায় যাবে সেটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ– কোন ব্যবস্থায় ক্ষমতা পরিচালিত হবে।
এখানেই গণভোটের প্রয়োজনীয়তা।
প্রস্তাবিত গণভোটের প্রশ্নগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ
আসন্ন গণভোটে যে বিষয়গুলো উঠছে, সেগুলো সরাসরি রাষ্ট্রের ভিত্তি বদলে দিতে পারে। প্রথমত, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠন– এটি ভোটের বিশ্বাসযোগ্যতার পূর্বশর্ত। জনগণ যদি ভোটেই আস্থা না পায়, তা হলে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা– উচ্চকক্ষ থাকলে আইন প্রণয়নে ভারসাম্য আসে। তাড়াহুড়া করে সংবিধান সংশোধন করা যায় না। অনেক দেশে এই ব্যবস্থা কার্যকর।
তৃতীয়ত, নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দলের ক্ষমতায়ন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ– এ সবই ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙার প্রস্তাব। অর্থাৎ এক ব্যক্তিনির্ভর শাসন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শাসনে রূপান্তর। চতুর্থত, জুলাই সনদের সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা– এটি ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য এক ধরনের সামাজিক চুক্তি।
এই প্রস্তাবগুলো কেবল আইনগত নয়; এগুলো গণতন্ত্রকে টেকসই করার নকশা।
রাজনৈতিক দল ও কৌশলগত বিতর্ক
কিছু দল চেয়েছিল আগে গণভোট, পরে নির্বাচন– কারণ একই দিনে দুই প্রক্রিয়া ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে পারে। আবার কেউ বলছে, একসাথে করলে অংশগ্রহণ বাড়বে। এটি রাজনৈতিক কৌশলের বিতর্ক।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো– জনগণের রায় কী?
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ থাকা স্বাভাবিক। গণতন্ত্রে ভিন্নমত থাকবে। তবে ভোটারদের উচিত তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেয়া, দলীয় আবেগে নয়। গণভোটকে যদি কেবল দলীয় প্রচারণার অস্ত্রে পরিণত করা হয়, তা হলে এর নৈতিক শক্তি নষ্ট হবে। এটি কোনো দলের জেতা-হারার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
এখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, সরকারি কর্মচারীদের প্রচারণা থেকে দূরে রাখা, পরিষ্কার নির্দেশনা– এসব নিশ্চিত না হলে গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গণভোটের ফল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন জনগণ বিশ্বাস করবে– তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হয়েছে।
স্বাধীন নির্বাচন কমিশন ছাড়া গণভোট অর্থহীন।
গণভোট কেন ঐতিহাসিক
ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতি নিজেকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল তেমন একটি মুহূর্ত। জুলাই বিপ্লব আরেকটি।
এই সময়ে নেয়া সিদ্ধান্ত কয়েক দশকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। গণভোট সেই সিদ্ধান্তকে জনগণের হাতে তুলে দেয়।
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি ব্যক্তিনির্ভর থাকবে, নাকি প্রতিষ্ঠাননির্ভর হবে? ক্ষমতা কি কেন্দ্রীভূত থাকবে, নাকি ভারসাম্যপূর্ণ হবে? নির্বাচন কি বিশ্বাসযোগ্য হবে, নাকি বিতর্কিত? এসব প্রশ্নের উত্তর সংসদ নয়– জনগণ দেবে।
শেষ কথা
গণভোট কেবল একটি ব্যালট পেপার নয়; এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার। এখানে ভোট মানে মতামত, মতামত মানে ভবিষ্যৎ। তাই গণভোটে অংশগ্রহণ মানে শুধু ভোট দেয়া নয়– রাষ্ট্রের চরিত্র নির্ধারণে নিজের দায়িত্ব পালন করা।
গণতন্ত্রের আসল মালিক জনগণ। গণভোট সেই মালিকানার প্রকাশ।
বাংলাদেশ আজ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে গণভোট হতে পারে নতুন রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা। সঠিক সিদ্ধান্তই পারে জুলাইয়ের ত্যাগকে অর্থবহ করতে এবং একটি জবাবদিহিমূলক, ভারসাম্যপূর্ণ ও স্থিতিশীল গণতন্ত্র গড়ে তুলতে।
সুতরাং প্রশ্নটি সহজ– গণভোট কী ও কেন? উত্তরও সহজ– জনগণের হাতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ তুলে দেয়ার জন্যই গণভোট।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



