ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে স্মরণীয় নৌ-বিদ্রোহ

আট দশক আগে ১৯৪৬ সালের ১৮ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি, এই পাঁচটি উত্তাল দিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। এই চ্যালেঞ্জ কোনো রাজনৈতিক আলোচনার টেবিল থেকে আসেনি; বরং এসেছিল সেসব লড়াকু মানুষদের কাছ থেকে, যারা সাম্রাজ্যের যুদ্ধজাহাজগুলো পরিচালনা করতেন। ১৯৪৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বোম্বে শহরের নৌ-প্রশিক্ষণ জাহাজ ‘তলোয়ার’ এ শুরু হওয়া এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে ছিলেন এম এস খান (সিনিয়র সিগন্যালম্যান) এবং মদন সিং (পেটি অফিসার টেলিগ্রাফিস্ট)।

১৮ ফেব্রুয়ারির সেই সকালে বোম্বে হারবারে যখন সূর্য উদিত হচ্ছিল তখন আরব সাগরের বাতাসে নোনা জলে স্বাভাবিক শান্ত আবহ ছিল না; বরং সেখানে ছিল বিপ্লবের এক বৈদ্যুতিক উত্তেজনা। আমাদের ইতিহাসের বইগুলো প্রায়ই ১৯৪৭ সালের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক দর কষাকষির ওপর আলোকপাত করে কিন্তু তারা সেই সত্যটিকে এড়িয়ে যায় যে এই নৌ-বিদ্রোহই লন্ডনকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিল, তাদের পায়ের তলার মাটি সরে গেছে।

বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছিল বোম্বের নৌ-ঘাঁটি এইচএমআইএস তলোয়ারে। এর মূলে ছিল মর্যাদার জন্য এক মৌলিক মানবিক আর্তনাদ। ভারতীয় নৌসেনা বা রেটিংদের ব্রিটিশরা অত্যন্ত তুচ্ছজ্ঞান করত। তাদের অখাদ্য খাবার পরিবেশন করা হতো এবং ব্রিটিশ অফিসারদের তীব্র বর্ণবাদী গালিগালাজ সহ্য করতে হতো। সময়টা ছিল ১৯৪৬। বিশ্ব তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বড় বড় সাম্রাজ্যের পতন দেখেছে এবং ভারতীয় আত্মা তখন আর পদদলিত হতে রাজি ছিল না।

আজাদ হিন্দ ফৌজের (INA) বিচার এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর সেই জাদুকরী কিংবদন্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে এম এস খান এবং মদন সিংয়ের নেতৃত্বে নাবিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, দাসত্বের যুগ আর চলতে দেয়া যায় না। মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই ধর্মঘট দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বোম্বে করাচি কলকাতা এবং ভাইজাগজুড়ে ২০ হাজার এরও বেশি নৌসেনা, ৭৮টি জাহাজ এবং ২০টি উপকূলীয় স্থাপনা এই সংগ্রামে যোগ দেয়। উপমহাদেশে তখন কোনো সাম্প্রদায়িক বা রাজনৈতিক বিভেদ ছিল না। জাহাজের ডেকে তখন কোনো হিন্দু মুসলিম বা শিখ ছিল না— সেখানে ছিল একতাবদ্ধ সহযোদ্ধারা। তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কংগ্রেসের তেরঙা মুসলিম লীগের সবুজ পতাকা এবং কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকা একসাথে উড়িয়ে দিয়েছিল।

স্থলপথের শক্তি একটি বিভ্রম মাত্র যদি সমুদ্র অরক্ষিত থাকে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরাক্রমশালী মুঘল সাম্রাজ্য রাজতন্ত্র এবং সামন্ততান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে কেবল স্থলযুদ্ধের ওপর মনোনিবেশ করেছিল। তারা দিগন্তের দিকে তাকাতে ব্যর্থ হয়েছিল। মুঘলরা সমুদ্রকে অবহেলা করায় ব্রিটিশরা— যারা ছিল একটি নৌশক্তি, ভারত মহাসাগরের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়। এর ফলে তারা পুরো উপমহাদেশকে শ্বাসরুদ্ধ করে ফেলে এবং এদেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে।

১৯৭১ সালের আগের বছরগুলোতে জেনারেল আইয়ুব খান এই মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ তত্ত্বকে সমর্থন করেছিলেন যে (The defence East Pakistan lies in the west) পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা নিহিত রয়েছে পশ্চিমে। পশ্চিম পাকিস্তানে সামরিক শক্তি কেন্দ্রীভূত করে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে ন্যূনতম নৌঅবকাঠামো দিয়ে অরক্ষিত রেখে রাষ্ট্র কার্যত তার সামুদ্রিক ডানাটি কেটে ফেলেছিল।

১৯৬৫ সালের যুদ্ধ ছিল একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট। হাজার মাইল সমুদ্রপথ এবং বৈরী ভূখণ্ড দ্বারা বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তান যখন অরক্ষিত হয়ে পড়ে তখন বাঙালি জনগণের আস্থা ভেঙে যায়। সমুদ্রের এই নিরাপত্তা ব্যর্থতা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। এটি চিরতরে প্রমাণ করে দিয়েছিল, যে জাতি তার জলপথকে অবহেলা করে সে তার ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা বজায় রাখতে পারে না। সমুদ্র কেবল একটি সীমানা নয়; এটি একটি প্রবেশদ্বার যা খোলা রাখলে বিপর্যয় অনিবার্য।

আধুনিক বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগরের ঝুঁকি
আজ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের মুঘলদের ভুল বা ১৯৬০ এর দশকের কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি করা চলবে না। আমাদের বুঝতে হবে যে ২১ শতকে শত্রুর সবচেয়ে মারাত্মক আক্রমণটি সরাসরি স্থল সীমান্ত দিয়ে না-ও হতে পারে বরং তা হতে পারে সমুদ্রপথে।

এই সামুদ্রিক শ্বাসরোধ পদ্ধতিটি ১৭০০-এর দশকে ব্রিটিশরা ব্যবহার করেছিল এবং একাত্তরে স্বাধীনতাযুদ্ধেও একই অবরোধ কৌশল দেখা গিয়েছিল। একাত্তরে লজিস্টিক সাপ্লাই বা যুদ্ধসরঞ্জাম ও রসদ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে পাকিস্তানি বাহিনী লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল।

বঙ্গোপসাগরে আমাদের সি লাইন অব কমিউনিকেশন (SLOC) বা সামুদ্রিক যোগাযোগপথ যদি কোনো বিদেশী শক্তি অবরুদ্ধ করে দেয় তবে স্থল সীমান্তে একটি গুলি না ছুড়েই তারা আমাদের অর্থনীতিকে শ্বাসরুদ্ধ করে দিতে পারবে। বিশ্বরাজনীতিতে আমরা প্রতিদিন ক্ষমতার এই প্রয়োগ দেখতে পাই। সমুদ্র ব্যবহার করে, মার্কিন নৌবাহিনী ভেনিজুয়েলার উপর তার আধিপত্য জোরদার করছে এবং ইরানের উপরও একই কাজ করার চেষ্টা করছে। ক্ষমতা প্রদর্শন এখন আর কেবল জমি দখলের বিষয় নয়; এটি এখন গভীর সমুদ্রে পণ্য সরবরাহ জ্বালানি এবং নিরাপত্তার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়। বঙ্গোপসাগর যখন আবারো উদীয়মান শক্তিগুলোর, বিশেষ করে চীনা নৌবাহিনীর বিশাল বিস্তারের, একটি হট বেড হয়ে উঠছে তখন বাংলাদেশ কেবল একজন নিষ্ক্রিয় দর্শক হয়ে থাকতে পারে না।

সেই মহান বিশ্বাসঘাতকতা এবং নীরব প্রতিধ্বনি
১৯৪৬ সালের বিদ্রোহে নাবিকদের আত্মসমর্পণ না করলে নৌবাহিনী ধ্বংস করার হুমকি দেন অ্যাডমিরাল গডফ্রে তখন বিদ্রোহীরা আরো সাহসিকতা দেখায়। বোম্বে এবং করাচির রাস্তায় সাধারণ মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে নাবিকদের জন্য খাবার নিয়ে আসে এবং বিদ্রোহীদের সমর্থনে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে। ব্রিটিশদের বন্দুক তখন এই নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের দিকে ঘুরে যায় ৩০০ মানুষের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়।

অথচ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাবিকদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানায়। রাজনীতিবিদদের, সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল মূলত অন্তঃসারশূন্য। অস্ত্র নামিয়ে রাখার পরপরই বিদ্রোহীদের বরখাস্ত করে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে স্বাধীনতার সরকারি ইতিহাস থেকেও তাদের নাম মুছে ফেলার চেষ্টা হয়। স্বাধীনতা কেবল আলোচনার টেবিলে আসেনি; বরং তা এসেছিল বিদ্রোহের মাধ্যমে ঠিক যেভাবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা দেখিয়েছে, অধিকার আদায় করে নিতে হয়।

আমাদের নৌবাহিনী সাধারণ মানুষের কাছে এবং রাজধানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে থাকা নীতিনির্ধারকদের কাছে দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছে। এই সামুদ্রিক সচেতনতার অভাব একটি কৌশলগত ক্ষতি তৈরি করে। আমাদের নৌবাহিনীর মনোবল বাড়াতে এবং আমাদের কষ্টার্জিত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে ১৮ ফেব্রুয়ারি নৌ-বিদ্রোহকে যথাযথ সম্মানের সাথে স্মরণ করতে হবে।

সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে একজন সাধারণ নাবিক সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বব্যাপী জোয়ারের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। একটি দেশের শক্তি কেবল তার সীমান্তে নয়; বরং তার দিগন্তে পরিমাপ করা হয়। ১৯৪৬ সালের নৌ-বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কফিনে শেষ পেরেক।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ- উপাচার্য বিইউপি