সাধারণত কুরআন নাজিলের মাস হিসেবে রমজান মাসের পরিচিতি। বিশ্বব্যাপী বিশ্বাসীরা এই মাসে কুরআনের মর্যাদাকে কেন্দ্র করে তাদের জীবনাচারের বিন্যাস ঘটায়। সিয়াম পালনের সাথে সাথে দান-সাদাকা, ইফতার বিতরণ, প্রভৃতি কাজে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। গোটা সমাজ যেন কোনো জাদুবলে রাতারাতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। গোটা সমাজটিকেই ফেলে আসা ১১ মাসের সমাজের সাথে মেলানো যায় না। রমজানের বৈশিষ্ট্য এখানেই। ঘরে ঘরে কুরআন পড়ার যেন উৎসব শুরু হয়। যারা পড়তে পারেন না তারা মাসব্যাপী তারাবির সুযোগ নিয়ে কুরআনের চমৎকার তিলাওয়াতের ব্যঞ্জনা শোনার জন্য ব্যগ্রভাবে মসজিদে হাজির হন। মাসব্যাপী রোজা, সাদাকা, জাকাত, সাদাকাতুল ফিতর বিতরণ এবং ঈদুল ফিতর নামাজের মাধ্যমে রোজার মাসের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু এর রেশ থেকে যায় পরবর্তী ১১ মাসেও।
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের এমন কোনো বিষয় নেই, যা কুরআনে কারিমে আলোচিত হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই মানবজীবনের ব্যক্তিগত পর্যায়ে থেকে শুরু করে সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের কোনোটিই বাদ পড়েনি, যা কুরআনে আলোচিত হয়নি। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান— যা মানুষকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে তার সবই কুরআনের আলোচনার পরতে পরতে পাওয়া যায়। বাদ পড়েনি ব্যবসায়-বাণিজ্যের নীতিমালা, শ্রমিকের অধিকার, নারী অধিকার ও সমাজের পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের কথাও। দারিদ্র্য দূরীকরণ, সামাজিক পরিমণ্ডলে নেতৃত্বাদেশ ও শিক্ষকের গুরুত্ব, বৃদ্ধ মা-বাবার অধিকার— সবই আলোচিত হয়েছে প্রত্যাদিষ্ট মহাগ্রন্থে।
স্বাভাবিকভাবেই রোজার মাসে ইসলামী সাংস্কৃতিক চেতনার একটি সুস্পষ্ট অবয়ব দেখা যায় সমাজে। কোনো ব্যক্তি ব্যবসায়-চাকরি, যাই করুন না কেন, যেকোনো পেশায় ব্যস্ত থাকুন না কেন, রমজান মাসে পড়ন্ত বিকেলে ছুটে চলেন বাড়ির দিকে, পরিবারে সাথে মিলিত হওয়ার প্রত্যাশায় ইফতারে অংশগ্রহণের জন্য। ইফতার কেবল খাবারের আয়োজন নয়; এটি পরিবারের সবাইকে একসাথে বসার, আনন্দ ভাগাভাগি করার ও পারিবারিক বন্ধনকে আরো দৃঢ় করার এক অপূর্ব মুহূর্ত। ইফতারের সামগ্রী যাই হোক না কেন, প্রতিটি বাড়িতে ইফতারের আগ মুহূর্তে বাড়ির ছোট-বড়, মা-বাবা, ভাইবোন, আয়া-খালা সবাই মিলে একসাথে বসে ইফতার-পূর্ব মুনাজাতের দৃশ্য বছরের অন্য কোনো সময়ে কল্পনাও করা যায় না। ইফতারের সৌন্দর্য এখানেই। ইফতার শেষে বাড়ির একদম ছোট্ট শিশুটিও, ঠিকমতো হয়তো কথাও বলতে পারে না, সেও বড়দের সাথে ছুটে নামাজে। ইফতারের টেবিলে ছোটখাটো বিষয়ে আলোচনা, ইসলামের বিভিন্ন বিধি-বিধান, সামাজিকতা— এসব সম্পর্ক আলোচনার মতো আর সময় ও সুযোগ কোথায়? ইফতারের আগ মুহূর্তকে তাই পারিবারিক মিলনমেলা বলা চলে। পারিবারিক মেলবন্ধনের যে সংস্কৃতি তা শুধু এ সময়েই দেখা যায়। অন্য কোনো ধর্মবিশ্বাসের আচার-অনুষ্ঠানে সাধারণত এ দৃশ্য দেখা যায় না জাত-বিজাতের বিভাজনে। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’-এর বাস্তবতার প্রমাণ মেলে রমজানের ইফতারে। পারিবারিক জীবনের বাইরে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ইফতারের সময় সামাজিক মর্যাদার বিভাজনকে ভুলে একসাথে এক পাতে ভাগাভাগি করে ইফতারের যে অপূর্ব দৃশ্য, তা শুধু রমজানেই দেখা যায়। এটিই ইসলামী সমাজের মূল ভিত্তি। আল্লাহর দৃষ্টিতে ছোট-বড় আশরাফ-আতরাফ বলে কিছু নেই। সবাই রোজাদার; আল্লাহর সন্তুষ্টির পথিক।
আজকাল বড় বড় পাঁচতারকা-সাততারকা হোটেলে ইফতারের আয়োজন করা হয় বেশ জাঁকজমকের সাথে। এতে একজনের জন্য যা ব্যয়, বাইরে তা দিয়ে ১৫-২০ জনের চমৎকার ইফতারের আয়োজন করা যায়। ইসলামী সংস্কৃতির সংযমের নীতিমালা এতে কতটুকু রক্ষিত হয়— বিবেচনার দাবি রাখে। এতে রোজার ইফতার তার শিক্ষা এবং বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে এর রাজনীতিকরণের মাধ্যমে।
ইসলামী সংস্কৃতির মৌলিক কেন্দ্রবিন্দু মানুষ ও পরিবার। রমজানে এর প্রকাশ দেখা যায় সব পরিবারেই। পরিবার গড়ার পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করার ক্ষেত্রে এক আল্লাহর আদেশে সাহরি ও ইফতার প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারকে নতুন করে পূর্ণতা দান করে আলোকিত মানুষে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে দেয়। সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা কল্যাণমুখী সমাজগঠনের একটি মৌলিক শর্ত। রমজানে সালাত, সাদাকা, সাদাকাতুল ফিতর ছাড়াও গরিব আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের আর্থিক সহযোগিতার যে চিত্র তা কল্যাণমুখী সমাজের একটি বাস্তব রূপ। এটি রোজার সময়েই শুধু দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সাহরি খাওয়ার জন্য রোজাদারদের জাগিয়ে দেয়ার উদ্দেশে গ্রাম-শহর নির্বিশেষ যে কাসিদা গাওয়ার রেওয়াজ তা ইসলামী সংস্কৃতির আরেক প্রকাশ। বর্তমান আধুনিকতার কল্যাণে পারিবারিক ও সামষ্টিক ইফতারের রেওয়াজ ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে রমজানের সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশ। পরিবার ও সমাজকেন্দ্রিক মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ক্রমশই বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্বাসীদের এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ



