মো: সহিদুল ইসলাম সুমন
গত দেড় দশকের রাজনৈতিক শ্বাসরোধের পর এক নতুন সামাজিক বন্দোবস্ত প্রয়োজন। এরই মধ্যে আমাদের নদীগুলো শুকিয়েছে, আমাদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা হয়েছে এবং আমাদের জাতীয় পরিচয়কে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থের শিকলে বন্দী করা হয়েছিল। আজ ২০২৬ সালের এই নতুন ভোরে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখি কেবল লুণ্ঠন, বিচারহীনতা আর হাহাকারের ইতিহাস। এই ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি ‘ইশতেহার-২০২৬’ দৃপ্ত ঘোষণা দিয়েছে এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নামে এক বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনা ও স্লোগান জাতির সামনে হাজির করেছে।
এই দর্শনের মূল নিহিত রয়েছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর মধ্যে। ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে যখন দেশ এক গভীর পরিচয় সঙ্কটে ভুগছিল, তখন তিনি এই ভূখণ্ডের মাটির গন্ধ ও মানুষের আবেগ মিলিয়ে এক নতুন পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি শিখিয়েছিলেন, আমাদের প্রথম ও শেষ পরিচয় আমরা বাংলাদেশী। বিএনপি আজ সেই দর্শনকেই আধুনিকায়ন করেছে। অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যখনই জাতীয় স্বার্থকে বাদ দিয়ে দলীয় বা গোষ্ঠীস্বার্থকে বড় করে দেখা হয়েছে, তখনই দেশ পিছিয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দেয়। গত দেড় দশকে আমরা দেখেছি, প্রধানমন্ত্রীর হাতে অসীম ক্ষমতা থাকায় রাষ্ট্রীয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপির প্রস্তাবিত রাষ্ট্র মেরামত রূপরেখায় বলা হয়েছে— রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। যার মধ্যে অন্যতম হলো— একই ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এটি বাংলাদেশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের চিরস্থায়ী অবসান ঘটাবে। এর ফলে নেতৃত্বে স্থবিরতা আসবে না এবং নতুন প্রজন্মের মেধাবী নেতৃত্বের পথ সুগম হবে।
এ ছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে, যাতে সংসদ কেবল রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত না হয়। ক্ষমতার এই বিকেন্দ্রীকরণ সরাসরি বিনিয়োগের পরিবেশকে স্থিতিশীল করে। যখন একটি দেশে ক্ষমতার পালাবদল সুনিশ্চিত এবং গণতান্ত্রিক হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদি দেশী ও বিদেশী পুঁজি সেই বাজারে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার প্রস্তাবটি এই ভারসাম্যেরই আরেকটি স্তম্ভ। আমাদের জাতীয় সংসদে একটি ‘উচ্চকক্ষ’ থাকবে, যেখানে দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী, বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তিবিদ ও বিভিন্ন পেশার বিজ্ঞ ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত হবেন। রাজনৈতিক ডামাডোলে অনেক সময় মেধাবীরা আড়ালে পড়ে যান; এই ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে তাদের মেধা ও অভিজ্ঞতা সরাসরি কাজে লাগানো যাবে। সবার আগে বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধার কোনো বিকল্প নেই।
বিপর্যস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠন নিয়ে ইশতেহারটিতে যে গভীরতা দেখা যায়, তা বর্তমানের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। গত এক দশকে খেলাপি ঋণের নামে যেভাবে জনমানুষের আমানত লুণ্ঠন করা হয়েছে এবং বিদেশে অর্থ পাচারের যে মহোৎসব চলেছে, তাকে রুখতে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কেবল করের হার কমানো বা বৃদ্ধি নয়; বরং জাতীয় অর্থনীতির পুরো ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘লুটেরা পুঁজিবাদ’ বা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসেছিল। মেগা প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, অথচ সাধারণ মানুষের পাতে ভাত জোটেনি। মুদ্রাস্ফীতির যন্ত্রণায় পিষ্ট মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত। এক দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয়িষ্ণু দশা আরেক দিকে বহিঃস্থ ঋণের পাহাড়। এ ঋণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছুঁইছুঁই, তা থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত আনা অপরিহার্য। আগামীর অর্থনীতি হতে হবে উৎপাদনমুখী ও সুষম বণ্টনের অর্থনীতি। এ ছাড়া শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য বেকার ভাতার প্রবর্তন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তাদের রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনা হবে। মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রণোদনা দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার যে পরিকল্পনা, তা জিডিপির গুণগত প্রবৃদ্ধিতে মৌলিক পরিবর্তন আনবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পাহাড় সবসময়ই কেবল এক ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, যেখানে মানুষের আবেগ আর অধিকার গৌণ ছিল। কিন্তু এই ইশতেহারে ‘আমরা সবাই বাংলাদেশী’ এই পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য গড়ার যে ডাক দেয়া হয়েছে, তা পাহাড় এবং সমতলের মধ্যকার দীর্ঘদিনের আস্থার সঙ্কট ঘোচাতে সহায়তা করতে পারে। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার যে কথা রয়েছে, তা সরাসরি পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের কার্যকারিতা বৃদ্ধির সাথে সম্পৃক্ত। উন্নয়ন যখন ঢাকাকেন্দ্রিক না হয়ে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি বা বান্দরবানের স্থানীয় নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, তখনই পাহাড়ের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। এই ইশতেহারে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় যে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, তা বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের পথে একটি বড় ধাপ। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে পাহাড়ের ঝরনা আর সমতলের পলিমাটি একই অধিকারের সূত্রে গাঁথা থাকবে।
বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র টেকসই হতে পারে না। যে দেশে বিচার নেই, সে দেশে মানুষের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। অতীতের শাসকরা বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের যন্ত্র হিসেবে। আয়নাঘর আর গুমের সংস্কৃতির সেই বিভীষিকা আমরা ভুলিনি। বিএনপি অঙ্গীকার করেছে, নিম্ন আদালতকে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে ন্যস্ত করা হবে। বিচারক নিয়োগে দলীয়করণের পরিবর্তে একটি স্বচ্ছ জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে। বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন না হয়, তবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কথাটি কেবল কাগুজে বুলি হয়ে থাকবে। আমাদের লক্ষ্য হলো— দেশের সাধারণ মানুষ যেন আদালতে এসে বলতে পারে, ‘আমি ন্যায়বিচার পাবোই’। এর পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকে বা দুদককে প্রকৃত অর্থেই একটি স্বাধীন বাঘে পরিণত করা হবে। দুর্নীতির ক্যান্সার এই রাষ্ট্রকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সরকারি প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিংব্যবস্থা জোরদার করা এবং ‘লোকপাল’ নিয়োগের প্রস্তাবটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক সংযোজন হতে পারে। এটি প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে পিয়ন পর্যন্ত সবার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রদান করবে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান সুস্পষ্ট এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অনুগত। আমরা কারো সাথে বৈরিতা চাই না; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আমরা হিমালয়ের মতো অটল। অতীতে আমরা দেখেছি কিভাবে নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে আমাদের সীমান্ত রক্তাক্ত হয়েছে, আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হবে— ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে নয়’। প্রতিটি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ’ থাকবে সবার ওপরে। আমরা বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব— কারো করুণাপ্রার্থী হয়ে নয়; বরং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র হিসেবে। সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা আমাদের অন্যতম লক্ষ্য। ভারতের সাথে তিস্তা পানি বণ্টনসহ অভিন্ন নদীগুলোর অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানে দৃঢ় অবস্থানের ঘোষণা জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুরক্ষায় অত্যন্ত জরুরি।
তরুণ প্রজন্ম ও তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব নিয়ে ইশতেহারটিতে যে আধুনিক চিন্তা প্রতিফলিত হয়েছে, তা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সহায়ক। আজকের তরুণরা কেবল স্বপ্ন দেখতে চায় না, তারা স্বপ্নের বাস্তবায়ন চায়। তারা ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে কোনো শিকল চায় না, তারা চায় ফ্রিল্যান্সিং ও উদ্ভাবনের অবাধ সুযোগ। ইন্টারনেটের দাম কমিয়ে প্রতিটি গ্রামে উচ্চগতির নেটওয়ার্ক পৌঁছে দেয়া হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিই হবে অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে ইশতেহারটিতে জাতীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয়ের যে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা মূলত একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের প্রধান শর্ত। মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনে কোচিং সেন্টারনির্ভর শিক্ষার বদলে সৃজনশীল ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো হবে।
অতীতের শাসকরা কালো আইন দিয়ে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেছিল। বিএনপি ঘোষণা করেছে, ক্ষমতায় গেলে সব কালো আইন বাতিল করা হবে। সংবাদমাধ্যম হবে রাষ্ট্রের দর্পণ। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা। শহীদ পরিবার এবং আহতদের পুনর্বাসনের জন্য আলাদা বিভাগ গঠনের প্রস্তাবটি ইতিহাসের এক ধরনের দায়মুক্তি। এই অভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে, রাষ্ট্র যদি জনগণের না হয়, তবে সেই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশে গত দেড় দশকে গুম, খুন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিপুল ঘটনা ঘটেছে, তার বিচার প্রয়োজ ।
আমরা অনেক রক্ত দিয়েছি, অনেক জুলুম সহ্য করেছি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিনাবিচারে কারারুদ্ধ রাখা হয়েছিল, তারেক রহমানকে নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। এই ত্যাগ কেবল ক্ষমতার জন্য নয়; বরং এই দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এই স্লোগানকে ঘিরে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের একটাই পরিচয় হোক— আমরা বাংলাদেশী। জিয়ার স্বপ্নের সেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ, যেখানে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত হবে, সেই লক্ষ্যেই আমাদের পথচলা। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র সংস্কার কোনো এক দিনের কাজ নয়, এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের প্রকৃত সার্থকতা।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষক।



