কয়েক দিন পরই নির্বাচন। কমপক্ষে ১৪ শ’ জীবনের বিনিময়ে এই নির্বাচনের পথ খুলেছে। এতগুলো জীবন না দিলে হয়তো এই নির্বাচনের জন্য আগামী ২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। তবে যারা জীবন দিয়ে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিতাড়িত করেছিলেন তারা যেমন নির্বাচন চেয়েছিলেন, সেই নির্বাচন কি আমরা পাচ্ছি? আর তারা কি কেবল একটি নির্বাচনের জন্যই জীবন দিয়েছিলেন? না, তারা চেয়েছিলেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। আধিপত্যবাদমুক্ত রাজনীতির চর্চার জন্যই জীবন দিয়েছিলেন। তারা চেয়েছিলেন বৈষম্য দূর করে সমাজে ও দেশে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে।
কিন্তু বিপ্লবের দেড় বছর পর আমরা দেখতে পাচ্ছি— সেই ১৪ শ’ শহীদের রক্ত এবং ২০ সহস্রাধিক আহতের আর্তনাদ অনেকটাই বিফলে যেতে বসেছে। আমলাতন্ত্র, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থাসহ রাষ্ট্রযন্ত্র এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনেকটাই ফ্যাসিস্ট আমলের মতো রয়ে গেছে। পরিবর্তন হয়েছে ব্যক্তি এবং স্লোগানের। বিজ্ঞ অথচ অনভিজ্ঞ লোকজন বসেছে সরকার পরিচালনায়। অন্যদিকে, স্বাধীনতার চেতনার সাথে যোগ হয়েছে চব্বিশের চেতনা। এর বাইরে তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হ্যাঁ, তবে একটি উপকার পেয়েছে জাতি। সেটা হলো দেশ ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল আওয়ামী সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার সেই ধ্বংসপ্রায় রাষ্ট্র ও জাতিকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে যেতে দেয়নি।
এমন পরিস্থিতিতেই একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার না করেই নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছে। সেই একই গোষ্ঠীর কারণেই সংস্কার করা যায়নি বলে মনে করা হচ্ছে। মূলত সব মৌলিক সংস্কারেই সেই গোষ্ঠী নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। তাদের আকাঙ্ক্ষা এবং উদ্দেশ্য একটিই ছিল, সেটা হলো— যত দ্রুত নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা কব্জা করা যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সক্ষমতা যতটুকুই থাকুক না কেন, তারা প্রকাশ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিজ্ঞা করছেন। তারা ইতিহাসের সেরা নির্বাচন করার অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, গণমাধ্যম, ব্যবসায়ী মহল— সবাই একদিকে প্রকাশ্যে ঝুঁকে পড়েছে। সেখানে কি নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব?
টিআইবির প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫ সালে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০২ জন নিহত হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছে ১৩৩৩টি অস্ত্র, যেগুলো অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হয়েছিল। অন্যদিকে, প্রতিবেশী দেশ থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ করছে বলে খবর প্রকাশ হয়েছে। এসব অস্ত্র নির্বাচনের সময় ব্যবহার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গত দেড় বছরে ৬০০ রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব সঙ্ঘাতের ৫৫০টিতে বিএনপি (৯১.৯ শতাংশ), আওয়ামী লীগ ১২৪টিতে (২০.৭ শতাংশ) এবং জামায়াত ৪৬টিতে (৭.৭ শতাংশ) সংশ্লিষ্ট ছিল। তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যন্ত সারা দেশে ৩৬ দিনে ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ হয়েছে।
২২ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর সাথে সাথেই শেরপুরে একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। ইউএনওর ডাকা সভায় চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক থেকে সংঘর্ষ এবং খুনের ঘটনা ঘটে। জামায়াত নেতার এই হত্যাকাণ্ডটি ভিডিওতে ভাইরাল হয়েছে। প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতে এই হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অক্ষম ছিল না বলে মনে হয়। সেখানে সেনাবাহিনীর টিমও ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু কিভাবে এই হত্যাকাণ্ড হতে পারল? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসন এতে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে! এর পর এই ঘটনার মামলার পর আসামিদের জামিনপ্রাপ্ত হতে দেখা যায়! এসব কিসের আলামত?
সাইবার যুদ্ধ এই নির্বাচনের প্রধান কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই যুদ্ধে জামায়াত মারাত্মক আক্রমণের শিকার হয়েছে। জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল দুইজনই সাইবার হামলার শিকার হয়েছেন। জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমানের এক্স হ্যান্ডেলে হ্যাক করে নারীদের বিষয়ে মারাত্মক কটূক্তি প্রকাশ করা হয়েছে। হ্যাক করা টুইট ভাইরাল করে আমিরের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী মিছিল করেছে বিএনপি। এটি কি পরিকল্পিত ছিল? অবশ্য দেরিতে হলেও জামায়াতের আইটি টিম হ্যাক হওয়ার বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেটিও বিএনপির শীর্ষ নেতারা আমলে না নিয়ে জামায়াতের আমিরের বিরুদ্ধে বিষোদগার চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ইতোমধ্যে হ্যাকের সূত্রপাতকারী বঙ্গভবনের এক কর্মকর্তাকে ডিবি আটক করেছে। তবে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের হ্যাকের বিষয়ে জামায়াত এখনো কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। এই সাইবার আক্রমণের প্রাথমিক সূত্রপাত ভারত থেকে হয়েছে বলে দাবি করেছে জামায়াত।
গত ৬ জানুয়ারি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে ঢাকা সেনানিবাসে। জামায়াতের ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা: খালিদুজ্জামান অস্ত্রধারী একজন নিরাপত্তারক্ষীসহ সেনানিবাসে নিজস্ব যানবাহনে প্রবেশ করতে চান। কর্তব্যরত মিলিটারি পুলিশ সেনা আইন অনুযায়ী তাকে প্রবেশে বাধা দিলে তিনি তাদের সাথে অসদাচরণ করেন, উত্তেজিত হন এবং অসৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলেন। পরবর্তীতে ঘটনাটি নিয়ে সেনা কর্তৃপক্ষের সাথে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ না করার অঙ্গীকার করেন। এভাবে সুরাহা হওয়ার পরও হঠাৎ গত ৪ ফেব্রুয়ারি এই ঘটনাটি কাটছাঁট করে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করা হয়। জানা যায়, ঘটনাটি কর্তব্যরত সেনা সদস্যের বডিক্যামেরার মাধ্যমে ভিডিও করা হয়েছিল। ভিডিওতে দেখা যায়, ডা: খালিদুজ্জামান ঘটনার ছবি তুলতে চাইলে তাকে নিবৃত করা হয়। এমন অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে— কে এই ভিডিও সেনা পরিমণ্ডলের বাইরে প্রকাশ করল? অর্থাৎ— এ সময়ে এই ভিডিওটি নিঃসন্দেহে জামায়াতের বিরুদ্ধে এবং বিএনপির পক্ষে জনমত গঠনে প্রভাব ফেলেছে।
সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো— ভোটকেন্দ্র দখলের শঙ্কা। সারা দেশে ৫৯ শতাংশ ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ ২৫ হাজার ৩২৮টি ভোটকেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, এর মধ্যে ৮ হাজার ৭৮০টি কেন্দ্র অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে ১৩ জনের মতো আনসার দায়িত্ব পালন করবেন। সেনাদল থাকবে টহলে বা স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে। আর একজন আনসার গানম্যান থাকবেন প্রিজাইডিং অফিসারের নিরাপত্তায়। বাকি ১২ জন আনসারের সবাই একযোগে ডিউটি করবেন না। তারা ভাগ করে নিজেদের টার্ন মোতাবেক চার-পাঁচজন করে ডিউটিতে থাকতে পারবেন বলে মনে হয়। এই ফোর্স দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার মতো নয়। তা হলে দেখা যাচ্ছে, ৫৯ শতাংশ কেন্দ্র দখল বা ভোট রিগিংয়ের ঝুঁকিতেই থেকে গেছে।
এখন ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনটি কেমন হয়, সেটা দেখার জন্য। আমরা এখনো আস্থা রাখতে চাই রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সরকারের ওপর। তারা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি নিরপেক্ষতার পরিচয় দেবেন, সেটাই আশা করছি। দিন শেষে দেশটি আমাদের সবার। আমাদের ওপরই নির্ভর করবে কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক



