নির্বাচন, রমজান এবং মূল্যস্ফীতি

যাদের বয়স ৩৫ বছর, সম্ভবত তাদের বেশির ভাগই জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেন গতকালকের নির্বাচনে। এ ধরনের তরুণ ভোটারের সংখ্যা কমবেশি চার কোটি। টগবগে এই ভোটাররা খইয়ের মতো ফুটছে আনন্দে, উত্তেজনায়, আবেগে, নতুন স্বপ্নে। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কিছু প্রার্থী বিপুল খরচ করেন। নির্বাচন আয়োজনে সরকারেরও বিপুল খরচ হয়। জনশক্তি নিয়োগ, প্রেষণ, ভোটের আনুষঙ্গিক খরচ, বিভিন্ন ধরনের ক্রয়, সবকিছু মিলিয়ে কয়েক হাজার কোটি টাকার ব্যাপার। ‘লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেনে’র মতো বর্তমান যুগে রয়েছে ব্যাংক। সরকার এসব কাজে ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। এর চাপ বর্তায় জনগণের কাঁধে। যারা নেন তারা খরচ করেই খালাস।

নির্বাচন ঘিরে দেশের অর্থনীতিতে আবর্তিত হয় কোটি কোটি টাকার নগদ অর্থ। এ অর্থের কোনো উৎপাদক ভূমিকা নেই। এটি বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করে। নির্বাচনের মৌসুমে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। ক্রেতাসাধারণ এবং সীমিত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে। সরকারি কর্মচারীরা সমস্যায় পড়ে না। বিভিন্ন ধরনের ভাতার ব্যবস্থা হয় তাদের জন্য। বিচিত্র সব বাহারি নাম এসবের। মহার্ঘ্য ভাতা-উৎসব ভাতা-বোনাস, চিকিৎসাভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা ইত্যাদি। প্রথম শ্রেণীর রাজকর্মচারীদের জন্য গৃহপরিচারক ভাতা।

গত সরকারের সময় থেকে শুরু হয়েছে নববর্ষ ভাতা। সরকার বাধ্যতামূলকভাবে তা আধা শাসিত স্বশাসিত এবং করপোরেট সংস্থাগুলোর ওপর চাপিয়ে দেয়; এসব সংস্থার লাভ-লোকসানের ব্যাপারটি আমলে না নিয়েই। বাজারমূল্যের ওপর ভাতার প্রভাবে সাধারণ জনগণের টানাপড়েন বাড়তেই থাকে।

রমজানকে সামনে রেখে অসৎ একটি গোষ্ঠী নানা ছুতায় দাম বাড়ায়। দেখা যায়, বন্দরে একধরনের কারসাজি করে। অতি প্রয়োজনীয় চাল, ডাল, তেল, চিনি— এগুলোর খালাস বিলম্বিত করে। যেন এর দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানো যায়। এবারের রমজানের বাজারে তেজিভাব সৃষ্টির আরেকটি উপকরণ যোগ হয়েছে, তা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উপযাচক হয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বেতন বাড়ানোর ঘোষণা। যদিও বলা হয়েছে, নির্বাচিত সরকার এ সিদ্ধান্ত নেবে; কিন্তু আগুন যেটুকু জ্বলবার তার নমুনা বাজারে শুরু হয়েছে। শুধু বেতন বৃদ্ধির খাতেই সরকারের বাড়তি খরচ হবে ১০৬ লাখ কোটি টাকা। এতে সাধারণ ক্রেতারা আরো কোণঠাসা হয়ে পড়বেন। কারো হাতে সঞ্চয় বলতে কিছু থাকবে না। মধ্যবিত্ত শ্রেণী নিঃসন্দেহে এতে আরো চাপে পড়বে।

নির্বাচন উপলক্ষে বাজারে লাখো কোটি টাকার লেনদেন, চট্টগ্রাম বন্দর কার্যত অচল করে রেখে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির মাধ্যমে দ্রব্যমূল্যের উল্লম্ফন, সবশেষে সরকারের নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা অনিবার্যভাবেই প্রভাব ফেলেছে দ্রব্যমূল্যে।

দৈনিক বণিক বার্তা এক প্রতিবেদনে (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) জানিয়েছে, দেশের সবচেয়ে বড় চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। ইতোমধ্যে সেখানে বেড়েছে সয়াবিন তেল, পাম তেল, ছোলা, বিভিন্ন ধরনের ডাল, চিনির পাইকারি মূল্য। এ বছর রমজানে যেন কোনো সরবরাহ সঙ্কট দেখা না দেয়, সে জন্য গত বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি আমদানি করা হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়, আমদানি বাড়িয়ে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর বাজারব্যবস্থাপনা ও তার কঠোর বাস্তবায়ন।

রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য স্থিতির জন্য প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা। নির্বাচন উপলক্ষে এবার আগে থেকেই এর ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ুক— এ রকমের কোনো ভাবনা এর পেছনে কাজ করছে কি না সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা দরকার।

রাজনৈতিক নেতারা যারা নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততায় দিন কাটান, এ ব্যাপারে তাদের কোনো খবর নেই। বেসরকারি সংস্থাগুলোরও মনে হচ্ছে, এ ব্যাপারে মনোযোগ নেই। রমজানের দ্রব্যমূল্যের স্ফীতিকে কেন্দ্র করে অচিরেই দেশ একটি সঙ্কটের মুখোমুখি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সবার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া জরুরি।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ

[email protected]