নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ

যেমন আরো বলা যায়, ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগ বিষয়ে কোনো দেশ বা অর্থনীতি বা আর্থিক খাতের পারস্পরিক রেষারেষির কারণে প্রতিপক্ষ প্রতিযোগীকে লোকসানে ফেলতে নিজের পণ্যের দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও কমিয়ে দেয়, নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার বাড়ায়, ডাম্পিং করে— এতে প্রতিযোগী হয়তো বাজার হারায়; কিন্তু ওই দেশ অর্থনীতি বা ব্যবসায়িক খাতে নিজেও দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। রাজনীতি বা খেলাধুলার ক্ষেত্রে অনেকসময় দেখা যায়, নিজের দল জিততে পারবে না জেনে অন্য এক দলকে জেতানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের দলের ক্ষতি করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকে সঙ্কটে ফেলে। স্বৈরাচার পতনে অয়োময় ঐক্যের মাধ্যমে জয়লাভের পর গণতন্ত্রকে দাঁড় করানোর কাজে নিজেরাই অনৈক্যের মহড়ায় মাতামাতি করলে লাভ হবে কার?

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের (১৮২৪-৭৩) মেঘনাদবধ কাব্যে (১৮৬১ রাবণের বোন শূর্পনখাকে ঘিরে এমন একটি উপাখ্যানমূলক কাহিনী আছে, যেখানে নিজের নাক কেটে তার যাত্রা ভঙ্গ করার কথা ইঙ্গিত আকারে এসেছে। উপাখ্যানটি হলো— এ কাব্যে শূর্পনখাকে শুধু রামায়ণে উল্লিখিত এবং পরিচিত চরিত্র হিসেবে নয়; বরং অপমান, প্রতিশোধ ও আত্মদহন-মানসিকতার প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে। রাম-লক্ষ্মণের হাতে নাক কাটা যাওয়ার পর শূর্পনখা অপমান ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে লঙ্কায় ফিরে রাবণকে রামের বিরুদ্ধে উসকানি দেয়, এই অপমান ঘিরে লঙ্কা-অযোধ্যার যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ‘নিজের নাক কেটে যাত্রা ভঙ্গ’- কথাটির ব্যাখ্যা আক্ষরিক ঘটনার চেয়ে রূপক ও উপাখ্যানধর্মী। নিজের নাক কাটার অর্থ হলো চরম আত্মঅপমান ও সামাজিক লজ্জার প্রতীক। পরের যাত্রা ভঙ্গ রাম-সিতার নির্বিঘ্ন বনবাস ও যাত্রার শান্তি নষ্ট করা, অর্থাৎ— নিজের অপমানকে অস্ত্র বানিয়ে শূর্পনখা অন্যদের সর্বনাশের পথ খুলে দেয়। মধুসূদন এখানে বোঝাতে চান, একজন নারীর অপমান কিভাবে ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। শূর্পনখা এখানে কেবল খলনায়িকা নন, তিনি ট্র্যাজিক চরিত্র, যার ব্যক্তিগত বেদনা থেকে জন্ম নেয় মহাযুদ্ধ।

মধুসূদন শূর্পনখার নাক কাটা ঘটনাকে সরাসরি নাটকীয় দৃশ্যে না এনে তার পরিণতি ও মানসিক অভিঘাতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কাব্যে শূর্পনখা অপমানিত, ক্ষতবিক্ষত, আত্মসম্মানে আঘাতপ্রাপ্ত প্রতিশোধপরায়ণ ভাবটি ফুটে ওঠে তার রাবণের কাছে আর্তি ও ক্রোধমিশ্রিত অভিযোগে। ‘ভগ্ন নাসা, রুধিরাক্ত, লজ্জায় অবনত শির,/লঙ্কাধিপ নিকটে এল ভগ্ন-প্রাণ ভগিনী’। শূর্পনখার নাক কাটা ঘটনা নয়; বরং ঘটনার অভিঘাত কাব্যের চালিকাশক্তি। একজন নারীর অপমান হয়ে ওঠে রামায়ণের ইতিহাস-ভাঙা মোড়।

নিচের ক্ষেত্রগুলোতে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ প্রবাদটি সাধারণত ব্যবহৃত হয় : যেমন— প্রতিহিংসা : কারো ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে মানুষ যখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং নিজের বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। ঈর্ষা : অন্যের উন্নতি সহ্য করতে না পেরে তাকে আটকাতে নিজের সংস্থান বা সুযোগ নষ্ট করা। অদূরদর্শিতা : তাৎক্ষণিক রাগের বশে এমন কাজ করা যার ফল নিজের জন্য বেশি ভয়াবহ হয়। সহজ কথায়— এটি পরশ্রীকাতরতা ও বোকামির একটি চরম বহিঃপ্রকাশ।

প্রচলিত আছে, প্রাচীনকালে শুভ কাজে যাত্রা করার সময় সামনে কোনো ‘নাককাটা’ বা ক্ষতবিক্ষত চেহারার মানুষ পড়লে তাকে অমঙ্গল মনে করা হতো।

গল্পটি এমন, এক ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর ওপর খুব ক্ষুব্ধ ছিল। প্রতিবেশী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাকে আটকানোর কোনো উপায় না পেয়ে ওই ব্যক্তিটি হিংসারবশে নিজের নাক নিজে কেটে ফেলে এবং প্রতিবেশীর যাত্রাপথের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বাংলা লোককথায় প্রচলিত এ গল্পে দেখা যায়, লোকটি নিজের নাক (সম্মান ও অঙ্গ) চিরতরে হারিয়ে ফেলল কেবল প্রতিবেশীর এক দিনের যাত্রা নষ্ট করতে। এখান থেকে নিজের বড় ক্ষতি করে অন্যের সামান্য ক্ষতি করা বোঝাতে প্রবাদটি চালু হয়।

আসলেই আমাদের আশপাশে হরহামেশা এমন ঘটনা ঘটছে। সবাই বলে কারো উপকার করা নাকি ভালো কাজ। হ্যাঁ, ঠিক আছে। কিন্তু কারো ক্ষতি না করাটাও তাহলে মহান কাজ। ধরা যাক, কারো বাড়িতে আগুন লেগেছে— কেউ পানি দেয়ার সুযোগ নাও পেতে পারেন। অন্য সবাই যেটুকু পারুক পানি দিচ্ছে, এমন সময় সে গিয়ে যদি তাতে কেরোসিনের তেল ঢেলে দেয় তাহলে লোকজন তাকে নিশ্চয়ই পাগল ভাববে, সাথে গণধোলাইটাও।

হজরত আলী রা:-এর একটি মহান উক্তি, ‘যখন দেখবে দরিদ্ররা ধৈর্যহারা হয়ে গেছে, ধনীরা কৃপণ হয়ে গেছে, মূর্খরা মঞ্চে বসে আছে, জ্ঞানীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে, শাসকরা মিথ্যা কথা বলছে— তখন বুঝবে, একটি দেশ ও সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে।’ মাত্রা অতিক্রম করলে অনেক ভালো জিনিস মন্দরূপ বা আকার ধারণ করতে পারে। যেমন মাত্রা অতিক্রম করলে সাহস হঠকারিতায়, আত্মোৎসর্গ আত্মহত্যায়, প্রতিযোগিতা হিংসায়, ধর্মভীরুতা ধর্মান্ধতায় পরিণত হতে পারে। অবস্থাবিশেষে সমালোচনা পরচর্চায়, প্রশংসা চাটুবাদে, তেজ ক্রোধে, দেশপ্রেম দেশদ্রোহিতার স্তরে নেমে আসতে পারে। নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রা যেমন সবার পছন্দ, তেমনি সুরের মধ্যে পঞ্চম স্বর মিষ্ট ও শ্রেষ্ঠ। প্রত্যেকের উচিত খাওয়াদাওয়া, চাওয়াপাওয়া, চিন্তাচেতনা, আশা-প্রত্যাশা, আগ্রহ-আকাঙ্ক্ষায় একটি পরিমিত বোধ মেনে চলা। অধিক ভোজন অধিকাংশ রোগবালাইয়ের কারণ। পরিমিত আহার শরীর ও মনের জন্য অপরিহার্য। মাত্রাতিরিক্ত চাহিদা সরবরাহে সমস্যা সৃষ্টি করে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। অধিক পরিশ্রমে মন ও শরীর ভেঙে পড়ে। অতিকথনে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। অতিরিক্ত সবকিছু খারাপ। সবার জানা থাকা দরকার, অতিভক্তি চোরের লক্ষণ নামে একটি প্রবাদ এখনো চালু আছে।

বাড়াবাড়ি কখনো সুখকর হয় না। অতি উত্তেজিত ব্যক্তির হার্টবিট ও রক্তের চাপ বাড়ে। অতি দ্রুত চলাচলকারী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সমূহ বিপদের কারণ ঘটাতে পারে। চলনে-বলনে, আচার-ব্যবহারে, কর্মকাণ্ডে মধ্যম পন্থা অবলম্বন সেরা অভ্যাস বলে বিবেচিত। আনন্দ-সর্বনাশের অধিক উচ্ছ্বাস কিংবা অতিশোকে কাতর হতে নেই। আনন্দের পরে বিষাদ আসছে আর বিষাদের পর আনন্দ আসবে— এ বোধ ও বিশ্বাসে সবপর্যায়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা বা রাখার উপকারিতা অস্বীকার করা যায় না। ভগবদ গীতার (অধ্যায়-২ শ্লোক-১৫) যেমন বলা হয়েছে, best (Arjuna), the person who is not disturbed by happiness and distress and is steady in both is certainly eligible for liberation. [শ্রেষ্ঠ (অর্জুন), যিনি সুখে-দুঃখে বিচলিত হন না এবং উভয় ক্ষেত্রে অবিচল থাকেন, তিনি অবশ্যই মুক্তির যোগ্য।]

মধ্যপন্থা অবলম্বনে ঝুঁকি কম। মধ্যম অবস্থানে থাকলে উঁচু মাত্রায় উঠতে যেমন সুবিধা হয়, নিচু মাত্রায় নামতেও অসুবিধা হয় না। অথচ অতি নিম্ন মাত্রায় থাকলে তাকে মধ্যপন্থা পেরিয়ে উচ্চ পন্থায় যেতে বেশ বেগ পেতে হয়। আবার উচ্চ পন্থা থেকে মধ্যপন্থা হয়ে নিম্ন পন্থায় নামতেও বেশ বিব্রতকর হতে হয়। বিশ্বাস ও বয়ানে মধ্যপন্থা নিরাপদ ও সুশ্রাব্য। কোকিলের স্বর পঞ্চম ও মধ্যমানের তাই এত মিষ্ট। পক্ষান্তরে কাকের স্বর সপ্তম, কর্কশ সুশ্রাব্য নয়। মধ্যপন্থার সুর বা স্বর সহজে অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। পক্ষান্তরে উচ্চ গ্রামের গান বা কথাবার্তা অশ্রাব্য ও ঝগড়া বাদানুবাদের ভাষা। চরম অবস্থান গ্রহণে সহজে সমঝোতা হয় না। সমাধান খুঁজে পাওয়া কষ্টকর হয়। মিষ্টি সুরের গান বা কথা সবসময় মোলায়েম ও কোমল প্রশান্তির পরিচয় তুলে ধরে, আনন্দ ও উপভোগের সুযোগ সৃষ্টি করে।

যারা বুদ্ধিমান তারা আজকের ঘটনা নিয়ে আজ ভাবেন না। এটি তারা ভেবেছিলেন বেশ কিছুদিন আগে এবং আজ যা ভাবছেন, তা আজকের জন্য নয়, ভাববেন বেশ কিছুদিন পরের জন্য। যারা তাৎক্ষণিক ঘটনায় আপ্লুত, বিমোহিত, বিমর্ষ কিংবা উৎফুল্ল হন, তারা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে খুব একটা স্বচ্ছ ধারণা পোষণ করতে সক্ষম বলে মনে হয় না। সময় যেহেতু দ্রুত পরিবর্তনশীল, সেহেতু তাৎক্ষণিক বলে কিছু নেই এবং তাৎক্ষণিকের ঘটনায় চূড়ান্ত সবকিছু ভাবাও সঠিক নয়। তবে তাৎক্ষণিকের ঘটনা কিন্তু তাৎক্ষণিক নয়, এটি সময়ের ধারাবাহিকতার একটি অংশ। সে কারণেও তাৎক্ষণিক চূড়ান্ত নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা বর্তমানের কার্যকারণকে এবং ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। সুতরাং বর্তমানের ঘটনাকে সতর্ক, সংহত ও সংযমের সাথে গ্রহণ করা উচিত; পরবর্তী সময়ে কী ঘটে তার জন্য। প্রতিশোধস্পৃহা থেকেও বাড়াবাড়ি ব্যক্তি ও সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে অসম্ভব করে তুলতে পারে। কেউ অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণের প্রশ্ন আসে; কিন্তু এ প্রতিশোধ গ্রহণে সাম্যের সীমা লঙ্ঘিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণও অত্যাচারে পর্যবসিত হতে পারে। প্রতিশোধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘিত হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে বাধ্য এবং যা সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অতি বর্ষণে বন্যা হয়, অধিক শীতে কাতর হয়, অতি গরমে হাঁসফাঁস করে সবাই। সবার স্বপ্ন থাকে বসন্তের বাতাস, নাতিশীতোষ্ণ নিরপেক্ষ পরিবেশ, পরিমিত বর্ষা আর মধ্যম বা পঞ্চম সুরের গান।

নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের ছোট-বড় দু-একটি উদাহরণ দিয়ে আজকের লেখা শেষ করা যায়। কর্র্তৃপক্ষের বা পরিস্থিতির ওপর দোষ চাপিয়ে রাগ করে যদি শিক্ষার্থীরা নিজেদের পড়াশোনা, পরীক্ষা দেয়া বন্ধ করে দেয় কিংবা অটো পাসের দাবি তোলে, তাতে দেশ জাতির ওপর আপাতত সাময়িক প্রতিশোধ নেয়া হলো; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার্থীদের জীবন নষ্ট হয়ে যায়।

যেমন আরো বলা যায়, ব্যবসাবাণিজ্যে বিনিয়োগ বিষয়ে কোনো দেশ বা অর্থনীতি বা আর্থিক খাতের পারস্পরিক রেষারেষির কারণে প্রতিপক্ষ প্রতিযোগীকে লোকসানে ফেলতে নিজের পণ্যের দাম উৎপাদন খরচের চেয়েও কমিয়ে দেয়, নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার বাড়ায়, ডাম্পিং করে— এতে প্রতিযোগী হয়তো বাজার হারায়; কিন্তু ওই দেশ অর্থনীতি বা ব্যবসায়িক খাতে নিজেও দেউলিয়া হয়ে যেতে পারে। রাজনীতি বা খেলাধুলার ক্ষেত্রে অনেকসময় দেখা যায়, নিজের দল জিততে পারবে না জেনে অন্য এক দলকে জেতানোর জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের দলের ক্ষতি করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত নিজের অস্তিত্বকে সঙ্কটে ফেলে। স্বৈরাচার পতনে অয়োময় ঐক্যের মাধ্যমে জয়লাভের পর গণতন্ত্রকে দাঁড় করানোর কাজে নিজেরাই অনৈক্যের মহড়ায় মাতামাতি করলে লাভ হবে কার?

লেখক : অনুচিন্তক, কলাম লেখক