১৯৭১ থেকে ২০২৬ : ন্যায়, জবাবদিহি ও নতুন সামাজিক চুক্তির আহ্বান। ক্ষমতার নয়, ন্যায়ের রাজনীতির পথে বাংলাদেশের পুনর্জন্ম। বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের শেখায়- এই জাতি কখনো স্থির থাকে নাই এবং থাকবেও না। যখন অন্যায় বেড়েছে, জনগণের সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে; তখন মানুষ জেগে উঠেছে। ক্ষমতা জনগণ থেকে দূরে গেছে, তখন ইতিহাস নতুন অধ্যায় লিখেছে। ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। ২০২৪ সালে আমরা জবাবদিহির দাবি তুলেছি। ২০২৬ সালে আমরা আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড়িয়েছি। এ তিন অধ্যায় মিলিয়ে এখন সময় এক মৌলিক প্রশ্নের সামনে সবাইকে দাঁড় করিয়েছে :
রাষ্ট্র কী ক্ষমতার যন্ত্র থাকবে, নাকি ন্যায়ের প্রতিষ্ঠান হবে? স্বাধীনতার অঙ্গীকার ছিল রাষ্ট্র জনগণের। তাই মুক্তিযুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতার জন্য লড়াই ছিল না, মুক্তিযুদ্ধ ছিল মর্যাদা ও সমতার সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনার কেন্দ্রে ছিল একটি নৈতিক ঘোষণা- রাষ্ট্র কোনো গোষ্ঠীর নয়; জনগণের। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও যখন নাগরিক প্রশ্ন তোলে- আইন কি সবার জন্য সমান? ক্ষমতা কি আমানত হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? তখন আমাদের বুঝতে হবে- স্বাধীনতার কাজ এখনো শেষ হয়নি। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে- স্বাধীনতা অর্জিত হয় একদিনে; ন্যায় প্রতিষ্ঠা হয় প্রতিদিনে।
জুলাইয়ের চেতনা হলো আবেগ থেকে প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর। ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই বিপ্লব দেখিয়েছেÑ মানুষ ন্যায় চায়, স্বচ্ছতা চায়, মর্যাদা চায়। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আবেগ দীর্ঘস্থায়ী হয় না; প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী করতে হয়। যদি আমরা জুলাইয়ের চেতনা টিকিয়ে রাখতে চাই, তবে প্রয়োজন: বিচারব্যবস্থার প্রকৃত স্বাধীনতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা ও আইনের পক্ষপাতহীন প্রয়োগ। প্রতিবাদ তখনই অর্থবহ হয়, যখন প্রতিবাদ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর ভোটের ভাষা হলো নির্বাচন গণতন্ত্রের সাম্প্রতিক সময়ে সর্বশেষ পরীক্ষা। ভোট কেবল ক্ষমতার হিসাব নয়- এটি আস্থার পরিমাপ। যেখানে আস্থা কমে, সেখানে স্লোগান নয়- আত্মসমালোচনা দরকার। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর ভোটের নির্বাচন আমাদের শিখিয়েছে : নৈতিক ভাষণ যথেষ্ট নয়; বাস্তব সমাধান প্রয়োজন, তরুণ প্রজন্মের ভাষা না বুঝলে ভবিষ্যৎ হারাতে হয়, নারী ও সংখ্যালঘু অধিকার প্রশ্নে অস্পষ্টতা আস্থা নষ্ট করে। একই সাথে ইতিহাসের বিতর্ক এড়িয়ে গেলে সন্দেহ বাড়ে। তাই পরাজয় যদি আমাদের বিনয়ী না করে, তবে তা কালের আবর্তে অযোগ্য প্রমাণ করবে।
ইসলামী নৈতিকতা ও গণতন্ত্র কখনো সঙ্ঘাত সৃষ্টি করে না, বরং তা সমন্বয় করে। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেখানে ধর্মীয় নৈতিকতা ও গণতন্ত্রকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখানো একটি কৃত্রিম দ্বন্দ্ব। ইসলামের তিনটি মৌলিক শিক্ষা- আদল (ন্যায়), আমানাহ (দায়িত্ব) ও শূরা (পরামর্শ) যা একটি জবাবদিহিমূলক ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি। গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়- ন্যায়সিদ্ধ সিদ্ধান্তে। ক্ষমতার স্থায়িত্ব ভয় থেকে আসে না, আসে আস্থা থেকে।
নারী ও সংখ্যালঘু হলো একটি ন্যায়রাষ্ট্রের আয়না বা প্রতিবিম্ব। একটি রাষ্ট্রের নৈতিক মান নির্ধারিত হয় তার দুর্বলতম নাগরিকের নিরাপত্তায়। নারীর শিক্ষা, সম্পত্তি, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা কেবল একটি জাতীর উন্নয়ন নয়, তা ওই জাতীর ন্যায় প্রতিষ্ঠার মানদণ্ড। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল সহনশীলতা নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সমাজে বহু মত-পথের অন্তর্ভুক্তি কোনো রাষ্ট্রের দুর্বলতা নয় বরং তা ওই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
দুর্নীতিমুক্ত শাসন শুধু কথায় না রেখে কাঠামোয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতি নির্মূলের স্লোগান বহুবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু স্লোগান দিয়ে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। দুর্নীতি নির্মূল করতে হলে প্রয়োজন : বাধ্যতামূলক সম্পদ ঘোষণা, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন তদন্ত কাঠামো ও সরকারি ক্রয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা। সারকথা হলো- আইন সবার জন্য সমান না হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। বরং আরো ভঙ্গুর হয়।
ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি : উৎপাদন ও দায়িত্বের ভারসাম্য। অর্থনীতি শুধু প্রবৃদ্ধির হিসাবে দেখলে হবে না। তা ন্যায়ের কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কর-ব্যবস্থা হতে হবে : উৎপাদনবান্ধব, স্বচ্ছ ও সরল এবং ভোগের স্তরভিত্তিক ভারসাম্যপূর্ণ একটি শক্তিশালী ও কার্যকরী ব্যবস্থা। মৌলিক চাহিদায় দিতে হবে স্বস্তি। পক্ষান্তরে বিলাসী পণ্যে দিতে হবে উচ্চ দায়; যা হবে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার যুক্তি। কিন্তু যে নীতি দরিদ্রকে সুরক্ষা দেয় না, সে নীতি কখনো ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না।
রাজনৈতিক সংস্কৃতিই একটি আধুনিক জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রের শক্তির আসল পরীক্ষা। সবচেয়ে বড় বিপ্লব হয় মননে। যে রাজনীতি বিরোধী মতকে শত্রু ভাবে, সে রাজনীতি অস্থায়ী হয়। তা কখনো সময়ের সাথে ঠিকে থাকতে পারে না। যে রাজনীতি বিরোধীর ভালো প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে, সেই রাজনীতি জনমানসে ঠিকে থাকে। সবাই যদি মনে রাখেন ভুল স্বীকার করা দুর্বলতা নয়; তা হলে তা নেতৃত্বের শক্তি বলে বিবেচিত হয়। সমালোচনা সহ্য করা অপমান নয়, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
নতুন সামাজিক চুক্তির সময় : ১৯৭১ আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে, ২০২৪ আমাদের বিবেক জাগিয়েছে ও ২০২৬ আমাদের বিনয় শিখিয়েছে। তাই এখন প্রয়োজন এক নতুন সামাজিক চুক্তি তৈরি করা, যেখানে ন্যায় হবে কেন্দ্রবিন্দু, ক্ষমতা হবে আমানত, গণতন্ত্র হবে সংস্কৃতি, ধর্ম হবে নৈতিক শক্তি- বিভাজনের অস্ত্র নয়; নাগরিক হবে সেখানে রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক। আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে : রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্রে নয়- বিচারে, রাজনীতির সাফল্য আসনের সংখ্যায় নয়, আসে আস্থায় আর স্থায়ী বিজয় ভোটে নয়, তা আসে নৈতিকতায়।
বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ- ক্ষমতার সংক্ষিপ্ত পথ অথবা ন্যায়ের দীর্ঘ কিন্তু স্থায়ী পথ। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে- এ জাতি শেষ পর্যন্ত ন্যায়ের পথ বেছে নিয়েছে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য



