চার মাস আগে দেশের প্রধান প্রধান শিক্ষাঙ্গনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিপুল বিজয় রাজনীতিতে রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছে। তবে চব্বিশের দেশ বদলানো ও জগৎ কাঁপানো ফ্যাসিবাদবিরোধী সর্বাত্মক ছাত্র-জনতার গণবিপ্লবের একজন নীরব পেশাজীবী সমর্থক ও সমব্যথী মানুষ হিসেবে এই বিজয় আমাকে অবাক করেনি। ছাত্রশিবিরের জনসম্পৃক্ততা বা জনপ্রিয়তার একটু আধটু খবর আমাদের কাছে আসতো। আমার ভাগ্নে-ভাগ্নী, ভাতিজা-ভাতিজি, এমনকি নাতি-নাতনীদের সাথে দেখা হলে তাদের ক্যাম্পাসের খোঁজ নিতাম। তাদের অর্ধেকের বেশি ব্যয়বহুল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজে পড়ে। তাদের আবেগ অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করতাম। ৫৪ বছরে আওয়ামী-বাকশালী, রাম-বাম চক্র জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে খেয়ে না খেয়ে অপপ্রচার ও নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আসছে। এ অপপ্রচার ও উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা এবং তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন যত বেশি হয়েছে, নবীন প্রজন্ম ঠিক তত তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে ক্যাম্পাসের এই গণরায়ের প্রতিফলন যে কতকটা অব্যর্থ ও অনিবার্য, সেটি ঠাহর করতে এমফিল/পিএইচডি করতে হয় না। ঢাকায় তারা যে গণজমায়েত করেছে এবং এখন জেলায় জেলায় যে সমাবেশের গণজোয়ার তৈরিতে সক্ষম হয়েছে, এটি যেন অদূরভবিষ্যতে জামায়াতের জনপ্রিয়তার আগাম পূর্বাভাস দিচ্ছে। জামায়াতের এই নব-উত্থানে অনেকের মতো আমরাও অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করেছি, এ গণরায় দেশের নবীন প্রজন্মের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন।
এই গণজোয়ারের প্রধান উৎসমুখ হলো মূলধারার দাবিদার দলগুলোর আদর্শিক সঙ্কট। এ পরিস্থিতির একটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। পৃথিবীজুড়ে এখন নতুন মাত্রায় জেগে উঠেছে ইসলামের ছায়াতলে নৈতিক আশ্রয় তালাশের ব্যাকুলতা। বাংলাদেশে জামায়াতসহ ইসলামী দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলোর এই পুনর্জাগরণের পেছনে ইসলামের বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা অন্যতম প্রধান কারণ। মার্কস-লেনিনের ভাবনাধারা এখন জাদুঘরে। আর আমেরিকা-ইউরোপের অন্ধ ইহুদিপ্রীতির কারণের ধনতন্ত্র এখন মুক্তবাজার অর্থনীতি ও উদারপন্থী গণতন্ত্রের মূল আবেদন খুইয়ে বসে আছে। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে আরব বসন্ত এক নয়া যুগের সূচনা করেছিল। মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরশাসকরা যত জুলুম চালান না কেন, ওই আরব বসন্তের আবার ফিরে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র। এ দিকে বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের প্রেক্ষাপট একটু ব্যতিক্রমী। শাসকগোষ্ঠী জামায়াত-শিবিরের ওপর হত্যা, গুম, হামলা-মামলা পর্যায়ক্রমে যত তীব্র করেছে, যত বিচিত্র-বিষাক্ত ট্যাগিং দিয়েছে, জামায়াত-শিবিরের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও আস্থার জায়গা তত বেশি পোক্ত হয়েছে। চব্বিশের অসম্পূর্ণ গণবিপ্লবে তাদের সাংগঠনিক শক্তি এবং সংহতি ভারতের মতো একটি আগ্রাসী শক্তির কেনা গোলাম আওয়ামী-বাকশালীদের দমন ও দলনযজ্ঞকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
ছাত্রশিবির যে পরিমাণ ভোট ক্যাম্পাসে পেয়েছে, ওই সংখ্যক কর্মীও তাদের নেই। রাম-বাম চক্রের সাথে সুর মিলিয়ে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদপন্থী অনেকে যখন ‘মৌলবাদ এবং দক্ষিণপন্থীদের’ উত্থানে শঙ্কা প্রকাশ করছেন, তরুণ প্রজন্ম তখন বিবেক, দেশপ্রেম, সংস্কারের তাগিদে এবং সৎ মানুষের শাসনের আদর্শ আঁকড়ে ধরেছে। রাম-বাম চক্র ও ভারতের ভয় এখানে। জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা হলেন এ দেশের সেই ভাগ্যবিড়ম্বিত মুসলমান কৃষক-গৃহস্থের সন্তান, ইতিহাস যাদের প্রতি কখনো ন্যায়বিচার করেনি। তাদের অনেক দোষ! তারা ইতিহাস-সচেতন, শিক্ষিত, সত্যিকার আক্ষরিক অর্থে সভ্য ও সুশীল। রাজনীতির লক্ষ্য তাদের ক্ষমতা নয়; বরং একটি ইনসাফের দেশ ও সমাজ গড়ে তোলা। আল কুরআন তাদের ইশতেহার, আখলাক বা ব্যবহারিক আচার-আচরণ তাদের বৈশিষ্ট্য, সততা ও জবাবদিহিতে তারা অভ্যস্ত; মানবিক সেবা এবং দ্বীনের দাওয়াত তাদের মিশন। তাদের পূর্বপুরুষরা কোনো ভুল করেননি। তারা রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে, দিব্যদৃষ্টিতে অন্য যে কারো চেয়ে আগেই ভারতীয় আগ্রাসনবাদের নতিজা ঠাহর করতে পেরেছিলেন। যে স্বাধীনতার ঘোড়সওয়ারি হয়ে আগ্রাসী ভারত একটি গণতান্ত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠিত দেশকে দু’টুকরো করে ১৮ কোটি মানুষের বাজার দখল করতে চেয়েছিল, সেই ষড়যন্ত্রের সর্বনাশ থেকে তারা একটি বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে চেয়েছিল।
স্বাধীনতাযুদ্ধের বা আন্দোলনের বিপক্ষে অনেকে ছিলেন। স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান দুই নৌকায় পা রেখেছিলেন। পাকিস্তান টিকে গেলে তিনি অভিলাষী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী হতে। তাই তো যুদ্ধের ঘোষণা না দিয়ে, যুদ্ধের নেতৃত্ব না দিয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছিলেন পাকবাহিনীর হাতে। একই সাথে যথেষ্ট শান্তি ও নিরাপদে তিনি এবং তার পরিবারপরিজন পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাতা খেয়েছে। তার শখের ‘এরিনমোর’ তামাকের ডিব্বাও জোগান দিয়েছে পাকিস্তান সরকার! রাজনৈতিকভাবে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের পাতা ফাঁদে ধরা দিতে মানা করেছিলেন অনেকে। নেজামে ইসলাম, পিডিপি, মুসলিম লীগ, ন্যাপের একটি অংশ, বাংলা জাতীয় লীগ, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপি) এমএল, বাংলাদেশের সমাজবাদী দল (তোয়াহা), পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি- এরা কেউ স্বাধীনতার সুড়ঙ্গ ধরে ভারতীয় নব্য উপনিবেশে পরিণত করতে চায়নি বাংলাদেশকে। মওলানা ভাসানীকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল ভারতে। কারণ ভারতের নীলনকশা তিনি জানতেন। তাহলে শুধু জামায়াত এবং তখনকার ইসলামী ছাত্র সংঘকে কেন স্বাধীনতাবিরোধী ‘ট্যাগ’ লাগানো? কারণটি অতি সোজা। জামায়াত-শিবির বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সজাগ, সক্রিয় সংগঠক ও রাজনৈতিক শক্তি-বিশেষ করে ইতিহাস-সচেতন।
স্বাধীনতার রাজনৈতিক বিরোধিতা এক জিনিস এবং হত্যা, নির্যাতন, লুট বা ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধ সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। তা ছাড়া তখন যাবতীয় ক্ষমতা ও দায়িত্বে ছিল পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাবাহিনী, যাদের ৯৬ হাজারকে ভারত পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়। মূল আসামি পার করে দিয়ে তাদের সহযোগীদের যুদ্ধাপরাধী বানাল এবং ফাঁসি দেয়া হলো। এটি কী ধরনের সুবিচার, তাও আবার বানোয়াট সাক্ষী-সাবুদ ডেকে এনে? সঙ্গে থাকলে সঙ্গী এবং স্বার্থে ঘা লাগলে জঙ্গি, এ দ্বিচারিতা থেকে ইতিহাস কাউকে রেহাই দেবে না। আজ যেমন করে বলা হচ্ছে ক্ষমতায় আসতে গেলে জামায়াতকে একাত্তরের ভূমিকার জন্য মাফ চাইতে হবে, তখনো এমন দাবি এবং ২০০৬ সালে জরুরি অবস্থা জারির মতো অবস্থা সৃষ্টির জন্য অর্থাৎ, ওয়ান-ইলেভেন ঘটানোর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে অনেককে।
জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে আওয়ামী জমানার সেই বাম-রাম ভারতীয় বয়ান আজ ফ্যাসিবাদবিরোধী অনেকের মুখে। অথচ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রদর্শনের ভাবনা-ভিত্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ইসলামী মূল্যবোধের মিশেলে। তাই ওই কথাটা প্রসঙ্গক্রমে আবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ‘আওয়ার চিলড্রেন আর ওয়াইজার দ্যান এলডারস’ (শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান)। আজকের তরুণদের হঠকারী ও বানোয়াট তকমা দিয়ে কেউ যত কদর্য করার চেষ্টা করা হোক না কেন, তারা তত বেছে নেবে সততা, সুবিচার, বিনয়, উদ্ভাবন ও সম্ভাবনাকে। চব্বিশে একটি পৈশাচিক স্বৈরাচারের করুণ পতন থেকেও কি আমরা কিছুই শিখব না? এই নবীনরা আজ ভোটার। অপেক্ষা করুন তাদের নির্বাচনী ম্যান্ডেটের জন্য। এই তরুণরা আগামীর বাংলাদেশ। তাদের কাছে কোনো জারিজুরি ঠাঁই পাবে না। কয়েক মাস আগে শিক্ষাঙ্গনের যে গণরায়, তা প্রতিফলিত হবে জাতীয় রাজনীতির গণিতে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



