মুসলিম প্রতিরক্ষা জোট : ভারতের অবস্থান

সার্বিকভাবে, এমন একটি জোট ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ তো বটেই, তবে তার বাস্তবায়নযোগ্যতা ও প্রভাব নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অবস্থান ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত সমীকরণের ওপর।

মো: রাশেদুল হাসান আমিন

৯ সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় আকস্মিক হামলা চালিয়ে বসে ইসরাইল। তেলআবিব এমন এক রাষ্ট্রের সার্বভৌত্বে আঘাত হানল যে কিনা বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এমনকি ইসরাইলের মদদদাতা যুক্তরাষ্ট্রের সাথেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তা ছাড়া কাতারে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অবস্থান। দেশটি ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সেখান থেকে ইসরাইলি বন্দীদের মুক্তির আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। সেই দেশে হামলা চালাল ইসরাইল!

আশ্চর্যের বিষয় হলো, হামলার পর এর দায় গোপনের কোনো চেষ্টা করেনি তেলআবিব। অথচ শত্রুজ্ঞান করে এমন দেশগুলোতে (ইরান-সিরিয়া-লেবানন) হামলার পর প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়ে দায় স্বীকারের রেওয়াজ ইসরাইলের নেই বললে চলে। হামলার পর বিবৃতিটি এমন ছিল- ইসরাইল এটি শুরু করেছে, ইসরাইল এটি পরিচালনা করেছে এবং ইসরাইল পূর্ণ দায় নিচ্ছে। এ হামলার মধ্য দিয়ে আবারো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়াতে একধাপ এগোলো ইসরাইল।

সাম্প্রতিককালে দেশটি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে, সিরিয়ার আরো ভূমি দখল করেছে, লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতাদের হত্যা করেছে আর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৬৫ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি হত্যা করেছে (মতান্তরে এ সংখ্যা এক লাখেরও বেশি)।

কাতারের মতো শান্তিপ্রিয় ও বন্ধুপ্রতিম একটি রাষ্ট্রে ইসরাইলের এ হামলা বিনা প্রতিক্রিয়ায় ছেড়ে দেয়া চলে না। সপ্তাহখানেকের মধ্যে হামলার প্রতিক্রিয়ায় দোহায় আরব লিগের সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি মুসলিম দেশগুলো সম্মেলন করেছে। মুসলিম দেশের নেতাদের দুই দিনের এ জরুরি সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল গাজায় প্রায় দুই বছর ধরে চলতে থাকা যুদ্ধ ও চলমান মানবিক বিপর্যয় থামাতে যুদ্ধবাজ ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা ও ইসরাইলের আগ্রাসনের মতো বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে এ সম্মেলনে।

তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এ সম্মেলন থেকে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সম্মেলন থেকে ন্যাটোর আদলে ‘জয়েন্ট আরব ফোর্সেস’ বা যৌথ আরব বাহিনী গঠনের তাগিদ উঠেছে। অর্থাৎ ন্যাটোভুক্ত প্রতিটি দেশ যেমন জোটের কোনো একটি দেশের নিরাপত্তা হুমকিতে পড়লে ওই দেশের নিরাপত্তায় সামরিক সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এই যৌথ আরব বাহিনীও সেভাবে কাজ করবে বলে প্রস্তাবে বলা হয়েছে।

ন্যাটোর মতো এ বাহিনীতেও বিমান, নৌ ও স্থলবাহিনী থাকবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। সহযোগী দেশগুলোর সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও আকৃতির ওপর নির্ভর করবে কোন দেশ এ বাহিনীতে কতটুকু অবদান রাখবে। বিশ্লেষকরা একে ‘আরব ন্যাটো’র তকমা দিয়েছেন।

কথা হলো- পাকিস্তানসহ ৪০টির বেশি আরব এবং ইসলামিক দেশের নেতারা দোহা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, যদি এ ধরনের সামরিক জোট গঠন করা হয় এবং তাতে পাকিস্তানও যুক্ত হয়- সেটি কি ভারতের জন্য পরোক্ষভাবে কোনো বিপদের সঙ্কেত বহন করে কি না? নাকি শুধু ইসরাইলি হামলা প্রতিরোধ উদ্দেশ্য? প্রশ্ন এ কারণে আসছে, যেহেতু ভারত ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। অন্য দিকে পাকিস্তান চিরশত্রু।

ভারতের সাথে ইসরাইলের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ- প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে। এ সম্পর্ক পাকিস্তান ও মুসলিম দেশগুলোর সম্ভাব্য জোটের চোখে ভারতের অবস্থানকে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তান যদি উপসাগরীয় ও মুসলিম দেশগুলোর সাথে একটি ইসরাইলবিরোধী সামরিক জোট গঠন করে- তাহলে তা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্যেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ভারতের জন্য এটি কৌশলগতভাবে উদ্বেগের কারণ; বিশেষ করে যখন ভারত-ইসরাইল সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গভীর ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছেছে।

ইসরাইল ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ, যার মধ্যে রয়েছে বারাক-৮ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, হেরন ড্রোন, ফ্যালকন রাডার এবং সাইবার নজরদারি প্রযুক্তি। ২৬/১১-এর পর থেকে সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়েও দুই দেশের সম্পর্ক গভীর হয়েছে।

এ প্রেক্ষাপটে যদি পাকিস্তান এমন একটি জোট গঠন করতে সক্ষম হয়, যার উদ্দেশ্য ইসরাইলকে মোকাবেলা করা এবং পরোক্ষভাবে ভারত-ইসরাইল সম্পর্ককে চাপে ফেলা, তাহলে তা ভারতের জন্য কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগতভাবে উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পাকিস্তান যদি এ জোটকে ভারতের বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে ব্যবহার করে- যেমন কাশ্মির ইস্যুতে সমর্থন আদায় বা ইসরাইল-ভারত যৌথ প্রযুক্তিকে ‘মুসলিমবিরোধী’ আখ্যা দেয়- তাহলে তা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ভাবমর্যাদা প্রভাবিত করতে পারে।

এটিও বাস্তব যে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ভারতের অর্থনৈতিক ও প্রবাসী সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এ জোটে সেই সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ভারতের জন্য কৌশলগত ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয়কর হবে। আরো লক্ষণীয় হলো, চীন-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা। যদি এ জোট চীনের সমর্থন পায়, তাহলে তা ভারত-চীন সম্পর্কের জটিলতা আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে চীন-ভারত নিজেদের সম্পর্কের তিক্ততা দূর করতে বেশ সচেষ্ট। বেইজিং সফরেও গিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি।

এসবের মধ্যে আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, কয়েকদিন আগে প্রতিবেশী পাকিস্তানের সাথে পারস্পরিক প্রতিরক্ষাচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরব। এ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো, কোনো এক দেশের ওপর হামলা হলে সেটি উভয়ের বিরুদ্ধে আগ্রাসন হিসেবে বিবেচিত হবে। চুক্তির পরপর এটি নিয়ে প্রতিক্রিয়াও দেখিয়েছে ভারত। দেশটির ভাষ্য, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের এ পারস্পরিক প্রতিরক্ষাচুক্তি জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে তা খতিয়ে দেখবে দিল্লি। এখন সৌদি আরবের মতো একটি আঞ্চলিক শক্তিধর রাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের যে সামরিক প্রতিশ্রুতি গড়ে উঠল, তা ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যেকোনো সঙ্ঘাতের সূত্রপাত ঘটালে দিল্লির ওপর কূটনৈতিক চাপ ফেলতে পারে। যদিও ভারত সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি সরবরাহকারী দেশ। এ ছাড়া সৌদি আরবে বিপুল ভারতীয় প্রবাসী কর্মরত। ফলে এ চুক্তি সৌদি আরবের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রতি সামরিক সমর্থনকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়ায়, দিল্লির সাথে রিয়াদের সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক লেখক এবং দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান ইতোমধ্যে মন্তব্য করেছেন- এ চুক্তি পাকিস্তানকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে চীন, তুরস্ক ও সৌদি আরব- তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি পাকিস্তানের পাশে রয়েছে। যদিও এটি ভারতের সামরিক সক্ষমতা সরাসরি প্রভাবিত করে না, তবে আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণে পাকিস্তানের অবস্থান দৃঢ় করে।

কয়েকদিন আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ‘কম্বাইন্ড কমান্ডারস কনফারেন্স’ শিরোনামে একটি আয়োজনে দেশটির নিরাপত্তা মহল প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভুটান ও মিয়ানমার ছাড়া বাংলাদেশ ও চীনসহ বাকি পাঁচটি দেশ থেকে নিরাপত্তাসংক্রান্ত হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেছে। কলকাতায় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড সদর দফরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তিন দিনব্যাপী দ্বিবার্ষিক এ সম্মেলন উপস্থিত ছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ভারতের প্রতিবেশী বিশেষ করে বাংলাদেশ, নেপাল ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেশটির জন্য নতুন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে- এমনটা ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মত।

অন্য দিকে চীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল ও দক্ষিণ চীনসাগরে সবসময় একটি আক্রমণাত্মক অবস্থান বজায় রেখেছে। তা ছাড়া লাদাখ, অরুনাচল ও সিকিম সীমান্তে চীনা সেনাদের সাথে চলমান অচলাবস্থা ভারতের জন্য পরোক্ষ হুমকি তৈরি করছে বলেও দ্য টেলিগ্রাফ ওই কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে।

সবকিছু ছাপিয়ে বাস্তবতা হলো, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা অগ্রাধিকার রয়েছে। যেমন, ইরান ও ইয়েমেন ঘিরে ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, সৌদি আরব- সবাই এখন ইসরাইলের সাথে কিছু ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ছে। ফলে পাকিস্তানের নেতৃত্বে একটি কার্যকর মুসলিম সামরিক জোট গঠনের সম্ভাবনা বাস্তবতার নিরিখে সীমিত হলেও রিয়াদ-ইসলামাবাদ চুক্তি অঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে কিছুটা হলেও পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

আর হ্যাঁ, পাকিস্তান যদি মুসলিম দেশগুলোর সাথে ইসরাইলবিরোধী সামরিক জোট গঠন করতে পারে, তাহলে তা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক কিংবা ইরানের মতো দেশগুলোর সামরিক সহযোগিতা অতীতে সীমিত থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। ভারতও পিছিয়ে নেই, ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো- দোহা সম্মেলনে ‘আরব-ইসলামিক টাস্কফোর্স’ গঠনের বিষয় তুলেছে পাকিস্তান। শুধু তা-ই নয়, জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে সৌদি আরবকে সমর্থন করার কথাও জানায় তারা। দোহা সম্মেলনে যে বিষয়টি ভাবনাকে নাড়া দিচ্ছে, তা হলো- সম্মেলনে পাকিস্তানের সক্রিয় অবস্থান কেবল আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না-ও থাকতে পারে। ইসলামাবাদ এ সম্ভাব্য জোটকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে পারে। সার্বিকভাবে, এমন একটি জোট ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ তো বটেই, তবে তার বাস্তবায়নযোগ্যতা ও প্রভাব নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অবস্থান ও আন্তর্জাতিক কৌশলগত সমীকরণের ওপর।