ড. মাহবুবুর রাজ্জাক
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় মেধাবীদের একটি পছন্দের বিষয় প্রকৌশল বিদ্যা। রাষ্ট্র তাদের পেছনে জনগণের করের টাকা খরচ করে এই আশায় যে, পড়াশোনা শেষে তারা দেশের কাজে লাগবেন, দেশের উন্নয়নে হাল ধরবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। প্রকৌশলীদের একাংশ দ্রুতই বিদেশে পাড়ি জমান। যারা চাকরিতে যোগ দেন, তারাও একসময় আর দেশে থাকতে চান না।
এমন অনেকে রয়েছেন, যারা নির্বাহী প্রকৌশলী বা তার চেয়েও উপরের পদে চাকরিরত অবস্থায় দেশ ছেড়ে যান। এ বয়সে বিদেশে গিয়ে চাকরি পাওয়া কঠিন- টিকে থাকা কষ্টকর। তারপরও যারা যান তাদের সংখ্যা কম নয়। অনেকে হয়তো দুর্নীতিতে জড়িয়ে, নয়তো দুর্নীতির শিকার হয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে প্রকৌশল খাতের সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া না হলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
কোথায় সংস্কার দরকার : প্রথমে পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রকৌশলীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। একটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানিতে চাকরিরত এক প্রকৌশলীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি। একসময় তিনি দেখতে পান, একটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান অবৈধ গ্যাস সংযোগের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার গ্যাস চুরি করছে। উপরের মহলের নির্দেশে লাইন কেটে দেয়া হলো, কত টাকার গ্যাস চুরি হয়েছে তার তদন্ত শুরু হলো। মন্ত্রণালয় থেকে আমলাদের নেতৃত্বে কমিটি হলো। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী টের পেলেন, সব লোকদেখানো। শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির প্রভাবশালী মালিকপক্ষ উপরের লোকদের হাত করে ফেলেছে। এবার সেই প্রভাবশালী গ্রুপ এই প্রকৌশলীর পেছনে লাগল। ফোন করে তাকে হুমকি দেয়া শুরু করল- সন্তানদের ক্ষতি করার ভয় দেখাল। একপর্যায়ে সেই প্রকৌশলী দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেন। এমন কাহিনী অনেক পাওয়া যাবে। কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আদেশ দিচ্ছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দিচ্ছে না।
টেন্ডার বাটোয়ারাও এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। নিরাপত্তার অভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পেশাদারত্ব রক্ষা করা যায় না। একজন অত্যন্ত সজ্জন পরহেজগার প্রকৌশলী ছিলেন। তিনি হালাল-হারাম বেছে চলেন, কারো সাথে বিরোধে জড়ান না। বুয়েট থেকে যন্ত্রকৌশলে পিএইচডি করা এই ভদলোককে দিয়ে কোনো অনৈতিক কাজ করানো যায় না। দেখা গেল, এটিই তার দোষ হয়ে গেল। টেন্ডার ভাগাভাগির সিন্ডিকেটের লোকেরা এসে অস্ত্র ধরল। তার সহকর্মীরা দয়াপরবশ হয়ে একটি উপায় বের করলেন। তাকে ডেপুটেশনে একটি প্রকল্পে পাঠিয়ে দিলেন যেখানে শুধু গবেষণা হয়, টেন্ডারের ঝামেলা নেই। প্রকৌশলী বেঁচে গেলেন, বেঁচে গেলেন তার সহকর্মীরাও। তাদের হরিলুটে ঝামেলা করার কেউ থাকল না। যেসব প্রকৌশলী মাঠপর্যায়ে কাজ করেন, নিরাপত্তার সঙ্কট তাদের বেশি। স্থানীয় রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের হাতে প্রকৌশলীদের কারণে-অকারণে অপদস্থ হতে হয়।
ইদানীং প্রকৌশলীদের নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা এবং দক্ষতার চেয়ে দলবাজিকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অনেক দফতরে পেশাগত শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। কাজেকর্মে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। যোগ্য ব্যক্তি পদোন্নতি বঞ্চিত হলে তার হতাশ হওয়া স্বাভাবিক। এমন কেউ চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে গেলে তাকে দোষ দেয়া যায় না। প্রকৌশল খাতে উন্নত বিশ্বের মতো পেশাগত নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং পথা চালু করে জ্যেষ্ঠতা, যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হলে দলবাজির প্রভাব কমবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের অধীনে দক্ষতাভিত্তিক পেশাগত নিবন্ধন ও লাইসেন্সিংয়ের ব্যবস্থা চালু থাকলেও দেশের প্রকৌশল খাতে এর তেমন গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। একটি স্বতন্ত্র লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করে স্নাতক প্রকৌশলীদের নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং অত্যাবশ্যকীয় করা দরকার। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্যও যথোপযুক্ত প্রফেশনাল লাইসেন্সিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
একজন প্রকৌশলী- যিনি নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও নৈতিকতার মান পূরণ করেছেন তাকে পি-ইঞ্জ হিসেবে নিবন্ধন ও লাইসেন্স দেয়া হবে। এরা প্রকৌশলগত স্বাক্ষর, ডিজাইন অনুমোদন ও নিরীক্ষণ করলে ধরে নেয়া যাবে যে, পেশাগত দায়িত্বশীলতা এবং মানদণ্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। পি-ইঞ্জদের জন্য একটি কোড অব ইথিক্স অনুসরণ বাধ্যতামূলক থাকে। এতে দুর্নীতি, পক্ষপাত, গাফিলতি থেকে বিরত থাকা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার শপথ থাকে। তারা আইনগতভাবে দায়বদ্ধ থাকেন। পেশাগত ত্রুটির ক্ষেত্রে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়।
প্রকৌশল সংস্থাগুলোর ব্যবস্থাপনা গতিশীল নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তা সংস্থার প্রধান হয়ে থাকেন। তাদের অনেকে প্রকৌশলী নন বলে প্রকৌশলীদের পেশাগত সমস্যার প্রতি সুবিচার করতে পারেন না। প্রকৌশল সংস্থাগুলোর কাজের গতিশীলতা আনতে স্বতন্ত্র প্রকৌশল প্রশাসন ক্যাডার গঠন করা যেতে পারে। এতে দেশের প্রকৌশল খাতে উন্নততর নেতৃত্ব তৈরি হবে। সঠিক নেতৃত্ব ছাড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সুষ্ঠু বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। প্রকৌশলীদের নিয়মিত পেশাগত উন্নয়ন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেন তারা সর্বশেষ প্রযুক্তি ও নীতিমালা সম্পর্কে হালনাগাদ থাকেন।
সর্বোপরি, প্রকৌশলীদের পেশাগত মর্যাদা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সাধারণ জনগণ ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে প্রকৌশলীদের পক্ষে নিরাপত্তা, সম্মান ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন সহজ হবে।
লেখক : অধ্যাপক, যন্ত্রকৌশল বিভাগ, বুয়েট



