ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব চিমনি প্রচলন

বাংলাদেশে বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় উৎসগুলোর একটি হলো ইটভাটা। শুষ্ক মৌসুম এলেই শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় এ জন্য কালো ধোঁয়ার স্তর নেমে আসে। এতে থাকা নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড ও সূক্ষ্ম বস্তুকণা মানুষের ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষতি করে, বাড়ায় হৃদরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা। একই সাথে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ে। এই বাস্তবতায় ঠাকুরগাঁওয়ে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজি (সিপিটি) কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন নয়, এটি বাংলাদেশের পরিবেশনীতির কার্যকারিতা যাচাইয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

দেশে বর্তমানে প্রায় সাত হাজার ইটভাটা সক্রিয় রয়েছে। পরিবেশ অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, শীত মৌসুমে শহরের বায়ুদূষণের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের জন্য সরাসরি ইটভাটা দায়ী। অধিকাংশ ইটভাটা এখনো পুরনো ফিক্সড-চিমনি বা আধা-যান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল। রাজনৈতিক প্রভাব, স্থানীয় অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং শ্রমবাজারের চাপের কারণে প্রশাসন অনেকসময় কঠোর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়।

এই প্রেক্ষাপটে ঠাকুরগাঁওয়ের একটি ইটভাটায় চালু হওয়া সিপিটি প্রযুক্তি একটি আশাব্যঞ্জক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। আট চেম্বার-ভিত্তিক এই চিমনিতে ধোঁয়া পানির স্প্রে চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে সাদা ও শীতল বাষ্পে রূপ নেয়। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও ফসলের ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করছেন। এটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তিগত সমাধান বাস্তবসম্মত এবং স্থানীয় প্রেক্ষাপটে কার্যকর।

প্রশ্ন হলো- এই সাফল্য কি নীতিগত কাঠামোর মাধ্যমে বিস্তৃত করা সম্ভব?

বাংলাদেশের ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বাস্তবে এই আইন প্রয়োগে তিনটি বড় সমস্যা দেখা যায়। প্রথমত, ইটভাটা মালিকদের জন্য প্রযুক্তি রূপান্তরের প্রাথমিক ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি। দ্বিতীয়ত, ব্যাংক ঋণ ও সরকারি প্রণোদনার প্রাপ্তি জটিল ও ধীর। তৃতীয়ত, পরিবেশ অধিদফতরের তদারকি সক্ষমতা সীমিত।

সিপিটি প্রযুক্তির বিস্তার ঘটাতে হলে রাষ্ট্রকে এখানেই নীতিগত হস্তক্ষেপ করতে হবে। যেমন পরিবেশবান্ধব চিমনি স্থাপনে কর ছাড়, স্বল্পসুদে ঋণ, ভর্তুকি এবং দ্রুত অনুমোদনব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একই সাথে দূষণকারী ভাটার ওপর জরিমানা ও লাইসেন্স বাতিলের বিধান কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কেবল উৎসাহ নয়, নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবায়ু দায়বদ্ধতা। বাংলাদেশ বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকির অন্যতম ভুক্তভোগী দেশ হলেও কার্বন নিঃসরণ কমানোর আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে এখনো কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে। ইটভাটা খাত থেকে নিঃসরণ কমাতে পারলে এটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভ‚মিকা রাখতে পারে। সিপিটি প্রযুক্তিকে জাতীয় জলবায়ু কর্মপরিকল্পনার সাথে যুক্ত করা হলে বিদেশী অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে প্রযুক্তি গ্রহণে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। ইটভাটা গ্রামীণ শ্রমবাজারের বড় অংশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। হঠাৎ করে ভাটা বন্ধ বা প্রযুক্তি পরিবর্তন শ্রমিকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নীতিতে পুনঃপ্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত থাকা জরুরি।

পরিবেশ নীতির আরেকটি দুর্বলতা হলো তথ্যের স্বচ্ছতা। বায়ুদূষণের প্রকৃত মাত্রা, ইটভাটার সংখ্যা, নিঃসরণ পরিমাপ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত, উন্মুক্ত ডেটাবেইস নেই। সিপিটি প্রযুক্তির মতো উদ্যোগগুলোর ফলাফল বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করে প্রকাশ করা গেলে নীতিনির্ধারণ আরো তথ্যভিত্তিক হবে।

এখানে স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটির ভ‚মিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিয়ন পরিষদ, কৃষক সমিতি এবং নাগরিক সংগঠনগুলো যদি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির পক্ষে সামাজিক চাপ তৈরি করে, তাহলে প্রশাসনিক উদ্যোগ আরো শক্তিশালী হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের অভিজ্ঞতা দেখায়- স্থানীয় মানুষ পরিবর্তনের সুফল প্রত্যক্ষ করলে তারা নিজেরাই প্রযুক্তির পক্ষে অবস্থান নেয়।

সিপিটি প্রযুক্তির আরেকটি কৌশলগত সম্ভাবনা হলো দেশীয় উদ্ভাবন সক্ষমতা। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশ শুধু বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়; স্থানীয় গবেষণা ও উদ্যোক্তারা কার্যকর পরিবেশ সমাধান তৈরি করতে পারেন। রাষ্ট্র যদি গবেষণা অনুদান, পেটেন্ট সুরক্ষা ও শিল্পবিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা বাড়ায়, তাহলে ভবিষ্যতে আরো পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবন সম্ভব হবে।

তবে আশঙ্কাও আছে। যদি এই প্রযুক্তি কেবল কয়েকটি প্রদর্শনী প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকে এবং জাতীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত না হয়, তাহলে এর প্রভাব লঘু হবে। বাংলাদেশে অতীতে অনেক ভালো প্রযুক্তি নীতিগত সমর্থন না পেয়ে হারিয়ে গেছে। তাই এখনই প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ। কোন সময়ে কত শতাংশ ইটভাটা আধুনিক প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হবে, কিভাবে অর্থায়ন হবে, কে তদারকি করবে। এসব নিরূপণ করতে হবে।

পরিবেশবান্ধব চিমনি কেবল ধোঁয়া কমানোর যন্ত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের পরিবেশ শাসনব্যবস্থার সক্ষমতার প্রতীক। ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্যোগ দেখিয়েছে পরিবর্তন সম্ভব। এখন প্রশ্ন হলো- রাষ্ট্র কি এই সম্ভাবনাকে জাতীয় রূপ দিতে পারবে? নাকি এটি আরেকটি বিচ্ছিন্ন সাফল্যের গল্প হয়ে থাকবে?

জলবায়ু সঙ্কটের এই শতকে বাংলাদেশের সামনে আর বিলাসিতা নেই। প্রযুক্তি আছে, অভিজ্ঞতা আছে, ক্ষতির প্রমাণ আছে। প্রয়োজন কেবল সাহসী নীতি সিদ্ধান্ত, কঠোর বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক