গণতন্ত্রের অঙ্গীকার : ফল মেনে জাতীয় সরকার

এইচ আর এম রোকন উদ্দিন
আজ দেশ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের মুখোমুখি। জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার— ভোটাধিকার প্রয়োগ করে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব কার হাতে দেবে, সে সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা, দায়িত্ববোধ ও গণতন্ত্রের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারের একটি বড় পরীক্ষা।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় আমরা কিছু বিচ্ছিন্ন ও ছোটখাটো ঘটনা লক্ষ করেছি। এসব ঘটনা হয়তো আলাদাভাবে খুব বড় নয়; কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে— সতর্কতা শিথিল হলে ছোট আগুন থেকেই বড় অগ্নিকাণ্ডের জন্ম হতে পারে। এই সংবেদনশীল সময়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, কিছু স্বার্থান্বেষী মহল— ভেতর থেকে কিংবা বাইরে থেকে নির্বাচনকে ব্যর্থ করার জন্য বড় ধরনের নাশকতার চেষ্টা করতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য গণতন্ত্রকে দুর্বল করা, অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা এবং দেশকে ভুল পথে ঠেলে দেয়া।

এই বাস্তবতায় আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সতর্কতা, সংযম ও ঐক্য। আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে রাখতে হবে— আমরা সবাই এই দেশের সন্তান। রাজনৈতিক দলগুলো মতাদর্শ, নেতৃত্ব ও কৌশলে ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু কেউই দেশের বাইরে নয়। প্রতিটি রাজনৈতিক দল, প্রতিটি প্রার্থী, প্রতিটি কর্মী এই জাতীয় পরিবারেরই অংশ। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কখনোই রাজনৈতিক নির্মূলের রূপ নিতে পারে না। বিরোধী দলকে ধ্বংস করার চেষ্টা, ভিন্নমতকে দমন করা বা কাউকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।

গণতন্ত্র টিকে থাকে বাদ দেয়ার মাধ্যমে নয়; বরং সহাবস্থানের মাধ্যমে। এ মুহূর্তে আমাদের একমাত্র ও সর্বোচ্চ লক্ষ্য হওয়া উচিত— একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। এই লক্ষ্য দলীয় স্বার্থ, আসনসংখ্যা বা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের ঊর্ধ্বে। ভয়ভীতি, কারসাজি বা সহিংসতার মাধ্যমে অর্জিত কোনো বিজয় কখনো প্রকৃত বিজয় হতে পারে না। আবার জনগণের রায় মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করাও কোনো দলের জন্য পরাজয় নয়। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রকৃত বিজয়ী হলো দেশ ও তার মানুষ। রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতাদের উচিত আবেগ নয়, প্রজ্ঞা দিয়ে কর্মীদের পরিচালিত করা; উসকানি নয়, শৃঙ্খলা শেখানো। নির্বাচনী ভাষণ ও বক্তব্য যেন বিভাজন উসকে না দেয়, ঘৃণা না ছড়ায়। মতভেদ থাকবে— এটিই স্বাভাবিক : তা প্রকাশ পাবে যুক্তি, নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে; হুমকি, গুজব বা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। রাজপথ হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের জায়গা, সংঘর্ষের ময়দান নয়।

সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো সাধারণ সমর্থক ও নাগরিকদের ভূমিকা। গণতন্ত্র শুধু প্রতিষ্ঠান দিয়ে রক্ষা হয় না; নাগরিকদের আচরণ দিয়েও রক্ষা হয়। প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব গুজব প্রত্যাখ্যান করা, মিথ্যা তথ্য যাচাই করা এবং পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলায় পা না দেয়া। ভুয়া খবর, অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রমূলক বয়ান হলো সেসব শক্তির প্রধান অস্ত্র, যারা একটি সফল নির্বাচন দেখতে চায় না। তারা বিভ্রান্তি ছড়াতে চায়, আস্থা নষ্ট করতে চায় এবং এমন প্রতিক্রিয়া উসকে দিতে চায়; যা অস্থিতিশীলতার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের সেই ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় ঐক্যই হওয়া উচিত আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঢাল। ঐক্য মানে মতের একরূপতা নয়; ঐক্য মানে জাতীয় স্বার্থে একমত হওয়া। ঐক্য মানে ফলাফল যা-ই হোক, প্রক্রিয়াকে রক্ষা করা। ঐক্য মানে দেশকে দল, ব্যক্তি ও প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রাখা।

আর নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ফলাফল যা-ই হোক, আমাদের সামনে আরেকটি বড় পরীক্ষা আসবে। জনগণের রায় মেনে নেয়াই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি। যারা জয়ী হবে, তাদের মনে রাখতে হবে— জয় মানে দম্ভ, প্রতিহিংসা বা বর্জনের অধিকার নয়। জয় মানে সব নাগরিকের জন্য শাসন করার দায়িত্ব, এমনকি যারা তাদের ভোট দেয়নি তাদের জন্যও। আর যারা পরাজিত হবে, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা রাজনৈতিক পরিপক্বতা, সংবিধানসম্মত ও শান্তিপূর্ণ পথে অবস্থান নেয়া, ভবিষ্যতের জন্য গঠনমূলক প্রস্তুতি নেয়া। দেশ বারবার এমন এক চক্রে আবদ্ধ থাকতে পারে না, যেখানে প্রতিটি নির্বাচনের ফলাফলই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, অস্বীকার করা হয় বা অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়া হয়। সেই পথ কেবল অচলাবস্থা ও অবনতির দিকেই নিয়ে যায়।

এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় সরকার বা জোট সরকার গঠনের ধারণাটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, সামাজিক মেরুকরণ এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জটিলতার এ সময়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা দেশকে স্থিতিশীলতা ও আস্থা দিতে পারে। স্বেচ্ছায় ও সদিচ্ছার ভিত্তিতে গঠিত একটি জাতীয় বা বিস্তৃত জোট সরকার বিভাজন কমাতে, রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত করতে এবং জরুরি জাতীয় ইস্যুগুলোতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে সহায়ক হতে পারে। এ ধরনের সহযোগিতা একটি শক্ত বার্তা দেবে— দেশের স্বার্থে প্রয়োজনে রাজনৈতিক নেতারা দলীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে একসাথে কাজ করতে সক্ষম।

জাতীয় চ্যালেঞ্জ কোনো দলীয় সীমানা মানে না। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় নিরাপত্তা— সব কিছুর জন্য দরকার ধারাবাহিকতা, ঐকমত্য ও সহযোগিতা। বিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে একটি দেশকে কঠিন সময় পার করা যায় না; মতভেদ থাকা সত্ত্বেও ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বই পারে জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে। একই সাথে আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে দেশের ভেতরের ও বাইরের শত্রুদের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়গুলোই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অস্থিতিশীলতা থেকে যারা লাভবান হয়, তারা বিভাজন উসকে দেয়, গুজব বাড়িয়ে তোলে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা নষ্ট করতে চায়।

জাতীয় ঐক্য ও স্পষ্ট জাতীয় লক্ষ্যই এসব হুমকির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্ত প্রতিরক্ষা। এই ঐক্য গড়ে উঠতে হবে সুস্পষ্ট জাতীয় উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে— সার্বভৌমত্ব রক্ষা, গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা। রাজনৈতিক বিতর্ক হওয়া উচিত— এসব লক্ষ্য কিভাবে সবচেয়ে ভালোভাবে অর্জন করা যায় তা নিয়ে; কে কাকে কতটা ক্ষতি করতে পারল, তা নিয়ে নয়। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশকে একটি নতুন ও উন্নত মানে নিয়ে যাওয়া, যেখানে নির্বাচন হবে নিয়মিত, শান্তিপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য; যেখানে বিরোধী মতকে সম্মান করা হবে; যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং যেখানে নাগরিকরা নিরাপদ, মর্যাদাবান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী থাকবে।

এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজনৈতিক দল ও নেতাদের সচেতনভাবে প্রতিশোধের বদলে সংযম, দমন নয়-সংলাপ আর সঙ্ঘাত নয়— সহযোগিতার পথ বেছে নিতে হবে। পুরনো বিভাজন, অতীতের ক্ষোভ ও ব্যক্তিগত শত্রুতা পেছনে ফেলে বড় জাতীয় স্বপ্নকে সামনে আনতে হবে। অতীতের দ্বন্দ্বে বন্দী থাকলে কোনো জাতি সামনে এগোতে পারে না। এই নির্বাচন কেবল পরবর্তী সরকার গঠনের বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি রেখে যাচ্ছি, তারও নির্ধারণ। আমরা কি ভয় ও চিরস্থায়ী বৈরিতার রাজনীতি চাই, নাকি দায়িত্বশীল প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি চাই? আমরা কি বিভাজনে দুর্বল রাষ্ট্র চাই, নাকি ঐক্যে শক্তিশালী রাষ্ট্র চাই?

আগামী দিনগুলোতে আমাদের আচরণই এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে। আসুন, আইন ও নিরাপত্তার পাশাপাশি বিবেক, দেশপ্রেম ও প্রজ্ঞা দিয়ে এই নির্বাচনকে রক্ষা করি। আসুন, প্রমাণ করি— আমরা গণতান্ত্রিকভাবে পরিপক্ব একটি জাতি। আসুন, দেখাই— দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা যেকোনো দল বা ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্যের চেয়েও বড়। আমরা যদি এতে সফল হই, তাহলে বিজয়ী যেই হোক না কেন, দেশই হবে প্রকৃত বিজয়ী। আর সেটিই হবে আমাদের সবার জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।

লেখক : ভূরাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

[email protected]