প্রফেসর আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী
আজ ১ সেপ্টেম্বর এক ঐতিহাসিক দিন। ৪৭ বছর আগে আজকের দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে নতুন তারার আবির্ভাব ঘটে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রাথমিকভাবে পরিচিতি লাভকারী বিএনপি সূচনা লগ্ন থেকেই গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় অবদান রাখতে শুরু করে। বিএনপির উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোকে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে উন্নয়নের পথে নিয়ে যাওয়া। প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দেশের সব শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। মানুষ দলে দলে বিএনপির পতাকাতলে সমবেত হতে শুরু করে।
বিএনপি এমন সময় প্রতিষ্ঠিত হয় যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ধরনের সমস্যা ও জটিলতা বিরাজ করছিল। বাংলাদেশের মানুষ জন্মগতভাবেই গণতন্ত্রের পূজারি। তারা গণতন্ত্রহীনতায় বাঁচতে চায় না। ১৯৭১ সালে তারা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম চেতনা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সরকার গঠন করা এবং উপার্জিত রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টন। কিন্তু স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের প্রত্যাশার সাথে প্রতারণা করে। তারা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে। ফলে ১৯৭৪ সালে দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়। লাখ লাখ মানুষ খাবার না পেয়ে মৃত্যুবরণ করে। অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের পেছনে খাদ্যাভাব খুব একটা দায়ী ছিল না; বরং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ব্যাপক দুর্নীতি, সম্পদ পাচারই ছিল এই দুর্ভিক্ষের কারণ। এক সময়ের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তার দলের লুটেরাদের সংযত করতে পারেননি। তিনি এক সময় দুঃখ করে বলেছিলেন, সবাই পায় স্বর্ণের খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। তার এই মন্তব্য যথার্থ ছিল। দলীয় লুটেরাদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যাপক জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। জনপ্রিয়তা পতনের মুখে তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় বাকশাল গঠন করে বিরোধী পক্ষের রাজনীতি চর্চার পথ রুদ্ধ করেন। দেশ পরিচালনায় দৃশ্যমান ব্যর্থতা এবং সীমাহীন লুটপাটের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায় নেমে যায়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। কিন্তু তার সেই মৃত্যু সাধারণ মানুষকে তেমন ব্যথিত করেনি। প্রতিবাদ জানাতে কেউ রাস্তায় নেমে আসেনি। তার কন্যা শেখ হাসিনার পরিণতিও হয়েছে একই। সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনে জনপ্রিয়তা হারিয়ে শেখ হাসিনাকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়।
শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার কন্যা শেখ হাসিনার মধ্যে চমৎকার চারিত্রিক মিল রয়েছে। তারা মুখে যা বলেন কাজে ঠিক তার উল্টোটি করেছেন। শেখ মুজিবুর নিজ হাতে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেন। শেখ হাসিনা নিজেকে গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে পরিচয় দিতে খুব ভালোবাসতেন। কিন্তু তার হাতেই গণতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। তার অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। শেখ হাসিনা তার পিতার মতোই বিরোধিতা সহ্য করতে পারতেন না। উভয়েই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কঠোর হস্তে দমন করেন। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর সিরাজ সিকদারকে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে বিচারবহির্ভূত হত্যার সূচনা করেন। পরে বিরোধী দল জাসদের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়। সরকার-সমর্থক চারটি পত্রিকা রেখে অন্য সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়।
স্বাধীনতার পর দেশের মানুষ যেখানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতির অগ্রগতি সাধনে বদ্ধপরিকর ছিল তখন আওয়ামী লীগ সরকার দেশের মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে নিজেদের ক্ষমতা শক্তিশালী করার চেষ্টা করে। একদিকে সাধারণ মানুষের হাহাকার, অন্যদিকে সরকার-দলীয় সমর্থকদের ব্যাপক লুটপাট এবং দেশজুড়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির ফলে সাধারণ মানুষ তাদের প্রতি যারপরনাই বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে সরকার গঠিত হয় তার সব সদস্যই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। একই বছর ৩ নভেম্বর জেনারেল খালেদ মোশাররফ পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। কিন্তু সাধারণ সৈনিকরা খালেদ মোশাররফকে মেনে নিতে পারেনি। তারা ৭ নভেম্বর আবারো পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটান। ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক জেনারেল জিয়াউর রহমানকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করে। জেনারেল জিয়া তার সাংগঠনিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে উন্নয়নের পথে ধাবিত করেন।
সেই সময় জিয়াউর রহমান অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আওতায় পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারলে উন্নয়নের পথ সুগম হবে না। আর এ জন্য রাজনৈতিক দল গঠনের কোনো বিকল্প ছিল না। ১৯৭৮ সালে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পর ১ সেপ্টেম্বর জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর মহৎ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গঠন করেন। বিএনপি ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয়লাভ করে। ১৯৮১ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের হাতে নির্মমভাবে নিহত হলে তার স্ত্রী গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরেন। তার যোগ্য নেতৃত্বে অল্প দিনের মধ্যেই বিএনপি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। নব্বইয়ের দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আপসহীন ভূমিকার কারণে বেগম জিয়াকে আপসহীন নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এরশাদ আমলে বিএনপিকে নানাভাবে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা চলে। কিন্তু বেগম জিয়ার যোগ্য নেতৃত্বে বিএনপি সব প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সমর্থ হয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের সাথে গোপনে সমঝোতা করেন; ফলে এরশাদবিরোধী আন্দোলন বারবার গতি হারায়। নিশ্চয়ই মনে থাকার কথা, ১৯৮৭ সালের সংসদীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, যারা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন তারা জাতীয় বেঈমান। অথচ কিছু দিন পরই শেখ হাসিনা এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় শেখ হাসিনা যদি জাতীয় প্রত্যাশার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করতেন তাহলে এরশাদের পতন ১৯৯০ সালের আগেই সম্পন্ন হতো। কথায় বলে, ডাক্তারের ভুলে একজন রোগীর মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু নেতার ভুলে পুরো জাতি বিপর্যস্ত হয়। আমাদের কোনো কোনো নেতার অপরিণামদর্শী কাজের ফলে মাঝে মধ্যেই জাতি বিপদের মুখে পড়েছে।
রাজনৈতিক দল হচ্ছে একটি বিমূর্ত ধারণামাত্র। রাজনৈতিক দল কোনো ব্যক্তি বা নেতাকে মহিমান্বিত অথবা কলুষিত করতে পারে না। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা তাদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে দলকে কলুষিত করতে পারেন। বিগত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা শুধু দেশের ক্ষতি করেননি, তার দলেরও সর্বনাশ করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে বেশ কয়েকবার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু কখনই সাবেক প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীকে তার কর্মীদের ফেলে রেখে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হয়নি। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে ঠিকই কিন্তু শাসক হিসেবে তিনি ছিলেন চরম ব্যর্থ। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপতি জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং সফল রাষ্ট্রনায়ক। তিনি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বীরত্বের পরিচয় দেন। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও তার অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। আওয়ামী লীগ নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী হিসেবে দাবি করে। তারা মনে করে, মুক্তিযুদ্ধে আর কারো অবদান নেই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যে ১১টি সেক্টর গঠিত হয়েছিল তার কমান্ডারদের মধ্যে একজনও আওয়ামী লীগের ছিলেন না। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের একজনও আওয়ামী লীগের নন। ক্ষমতায় এলেই আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। একটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কখনোই দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করতে পারেন না। কিন্তু বিগত সরকার আমলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারীরা রাষ্ট্রের অর্থ বিদেশে পাচার করেছে।
স্বাধীনতার পর বিগত ৫৪ বছরে আমরা অনেক ক’জন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী পেয়েছি। কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক পেয়েছি খুবই কম। সার্বিক বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি জিয়া ছিলেন একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক। তার নামাজে জানাজায় যে লোক সমাগম হয়েছিল তা ছিল নজিরবিহীন। রাষ্ট্রপতি জিয়া ধীরে ধীরে জাতীয় নেতা থেকে আঞ্চলিক নেতায় পরিণত হচ্ছিলেন। জিয়া স্বপ্ন দেখতেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মের আওতায় এনে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করে নিজেদের মধ্যে স¤প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলার। মূলত এ উদ্দেশ্যেই তিনি সার্ক গঠনের উদ্যোগ নেন। রাষ্ট্রপতি জিয়া সার্ক গঠনের প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার নির্মম মৃত্যুর কারণে সার্ক গঠন প্রক্রিয়া থেমে যায়। পরে ১৯৮৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মেলনের মাধ্যমে সার্ক গঠন করা হলেও ভারতের দেয়া শর্তের কারণে সার্ক মূলত কার্যকারিতা হারায়। ভারত শর্ত দিয়েছিল, সার্কে কোনো দ্বিপক্ষীয় ইস্যু আলোচনা করা যাবে না।
রাষ্ট্রপতি জিয়ার মতো সৎ এবং কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তি আর কখনোই বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হননি। জিয়া রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় তার কোনো আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে সামান্যতম দুর্নীতির অভিযোগ কেউ উত্থাপন করতে পারেনি। তিনি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গঠন করেছিলেন। এটি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। রাষ্ট্রপতি জিয়া সৌদি আরব সফরকালে সৌদি বাদশাহকে নিমগাছের চারা উপহার দিয়েছিলেন। এখনো সৌদি আরবে গেলে সেই নিমগাছ দেখতে পাওয়া যায়। সৌদিরা সেই নিমগাছকে জিয়া গাছ বলে উল্লেখ করে। জিয়া মাটি ও মানুষের রাজনীতি করতেন। তার মধ্যে কোনো অহংবোধ ছিল না। মাঝে মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি প্রচারিত হয়। ছবিতে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি জিয়া কোনো এক গ্রামে গেছেন। সেখানে একজন খালি গায়ে লুঙ্গি পরা একজন কৃষক জিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। একজন রাষ্ট্রপতি একজন খালি গা কৃষকের সাথে আলাপ করছেন, এটি কি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভাবা যায়? জিয়া একবার বলেছিলেন, আই উইল মেক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ানস। তার এই বক্তব্য নানাভাবে বিকৃত করে মহল বিশেষ সমালোচনা করে থাকে। এই কথায় জিয়া এটিই বুঝতে চেয়েছিলেন, রাজধানীর অভিজাত বাড়িতে বসে গ্রামের দরিদ্র কৃষকের কথা বলার দিন শেষ। কৃষকের কথা বলতে হলে রাজনীতিবিদদের গ্রামে যেতে হবে। জিয়া দিনের পর দিন বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন। জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী কার্যক্রম। কারণ গ্রামে পানি সেচের ব্যবস্থা না করা গেলে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়।
বিএনপিকে দু’জন ব্যক্তি এ পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়া। বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিত। এ পরিচিতি যথার্থ। কারণ তিনি কখনোই অপশক্তির সাথে আপস করেননি। বারবার নির্যাতন ভোগ করেছেন, কখনোই দেশত্যাগ করেননি। বেগম জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য একাধিকবার বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তিনি যাননি। বলেছেন, বাংলাদেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। বেগম জিয়া সাধারণ গৃহবধূ থেকে এখন একজন পরিণত রাজনীতিবিদ। একজন অত্যন্ত দূরদর্শী নেত্রী। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণত ভুল করেন না। বেগম খালেদা জিয়ার একটি দূরদর্শী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। এর মাধ্যমে প্রমাণ হবে, বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন নেত্রী হলেও তিনি জাতির স্বার্থে আপস করতে দ্বিধা করতেন না। তিনি অঙ্গীকার ভঙ্গকারী নেত্রী নন। ১৯৯৬ সালে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। প্রথম দিকে সরকার তত্ত¡াবধায়ক সরকারের ব্যাপারে সম্মত ছিল না। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলন করতে থাকলে বেগম জিয়া তাদের দাবি মেনে নেন। এই সময় খালেদা জিয়ার সরকার ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করেন। বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এই নির্বাচনের কিছু দিন পর আরো একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ছিল তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর অল্প কিছু দিনের মধ্যেই সংসদ ভেঙে দিয়ে সরকার নতুন নির্বাচনের আয়োজন করে। এর মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়া তার অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন। আর শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, এটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। অচিরেই আবারো নির্বাচন দেয়া হবে কিন্তু তিনি কথা রাখেননি।
তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়ে নতুন করে নির্বাচন দেয়া হয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আদালতকে ব্যবহার করে তত্ত¡াবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংবিধান থেকে বাতিল করে।
আমরা যদি বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার ব্যক্তিত্বের তুলনা করি তাহলে বোঝা যাবে কে ভালো কে মন্দ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে শেখ হাসিনার মতো অশ্রাব্য গালিগালাজ কোনো নেতা বা নেত্রী করতে পারেন তা ভাবলেও লজ্জাবোধ হয়। জাতীয় সংসদ অথবা যেকোনো সভায় বক্তব্য উপস্থাপনকালে শেখ হাসিনা যেভাবে বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান অথবা জিয়াউর রহমান সম্পর্কে অশ্লীল গালিগালাজ করেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। অথচ বেগম খালেদা জিয়া শেখ হাসিনা নয়, কারো বিরুদ্ধেই কখনো কটু কথা বলেননি। তিনি ভুয়া মামলায় জেল খেটেছেন কিন্তু কারো বিরুদ্ধে কোনো বাজে মন্তব্য করেননি। এটি একজন জাতীয় নেত্রীর সৌজন্যবোধের পরিচায়ক। শেখ হাসিনার প্রধান শত্রু তার মুখ।
আগেই বলেছি, রাজনৈতিক দল ব্যক্তিকে মহিমান্বিত বা কলুষিত করে না; বরং ব্যক্তিই রাজনৈতিক দলকে মহিমান্বিত অথবা কলুষিত করে। আর তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-নেত্রীরা শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের অনুসরণ করে। আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ স্থানীয় পর্যায়ের নেতার মধ্যেও কুৎসিত ভাষার ব্যবহার ও আচরণ লক্ষ করা যায়। এই অসৎ গুণ তারা তাদের নেত্রীর কাছ থেকেই পেয়েছে। শেখ হাসিনা কথায় কথায় জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের চর বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর উত্তম রাষ্ট্রীয় খেতাব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। পাকিস্তানি চরকে বীর উত্তম খেতাব দেয়ার জন্য তো তৎকালীন সরকারের শাস্তি পাওয়া উচিত।
শেখ হাসিনা কথায় কথায় বলেন, বিএনপি ক্যান্টনমেন্ট থেকে তৈরি রাজনৈতিক দল। দল কোথা থেকে গঠিত হলো সেটি মুখ্য বিষয় নয়। দলটি গণতন্ত্রের জন্য কতটা অবদান রাখছে, মানুষের কল্যাণে কি করছে- সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমান সেই ব্যক্তি যিনি সামরিক বাহিনীর লোক হয়েও বাকশাল-উত্তর দেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির সূচনা করেন। জিয়াউর রহমান সেদিন বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা না করলে আওয়ামী লীগসহ কোনো রাজনৈতিক দলেরই অস্তিত্ব থাকত না।
বিএনপি সেই রাজনৈতিক দল যারা দেশের মানুষকে বাংলাদেশী জাতীয়তা বোধে উদ্বুদ্ধ ও একতাবদ্ধ করেছে। বিএনপি এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জনসমর্থিত রাজনৈতিক দল- এটি কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত



