ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ২০২৬ সালের নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের একটানা শাসনের অবসান ঘটেছে এবার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি-বিজেপি ২০৭টিতে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস ৮০টি আসন পেয়েছে। ২০২১ সালে দলটি ২১৫টি আসনে জিতেছিল। উগ্র সাম্প্রদায়িক বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও নির্বাচনে সুবিধা করতে পারছিল না। এবারে বেশ মরিয়া হয়ে জয়ের জন্য মাঠে নামে। এরূপ বিপুল বিজয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মহাখুশি হয়ে বলেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুল ফুটেছে’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, ‘ভয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে বিশ্বাসের জয় হয়েছে।’ বিজেপি নেতারা এ জয়কে নিছক নির্বাচনী সাফল্য হিসেবে দেখছেন না; বরং একে একটি আদর্শিক বিজয় হিসেবে দেখছেন। স্মরণযোগ্য যে, নির্বাচনে বিজেপি ৪৬ শতাংশ এবং তৃণমূল কংগ্রেস ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এতে বামপন্থীদের প্রাপ্ত ভোট ৬ শতাংশ এবং কংগ্রেসের ৩ শতাংশ। অথচ কমিউনিস্ট পার্টি দীর্ঘ ৩৪ বছর এবং কংগ্রেস দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। এ দুটো দল এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করেছে। মানে- পশ্চিমবঙ্গের ভোটাররা ১৯৪৭ সালের পরে স্বাধিনতার নেতৃত্বদানকারী কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে। দলটির অপশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে দীর্ঘদিন পর্যন্ত বামপন্থীদের ভোট দিয়েছে তারা। এরপর তাদের ওপর নাখোশ হয়ে উদারপন্থী তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে। কিন্তু ১৫ বছর পরে তারা চরম দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে সমর্থন দিলো। আসলে কী সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটে মমতা ও তার দল পরাজিত হয়েছে?
তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘শতাধিক আসন কার্যত চুরি করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও কেন্দ্রীয় সরকারের যোগসাজশে ‘গণতন্ত্রের হত্যাকাণ্ড’ সংঘটিত হয়েছে’। উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনে আগে থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন পদক্ষেপ বিতর্কের মুখে পড়েছিল। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো- এসআইআর (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিউ) নামে কথিত ভোটার তালিকা পরীক্ষা করে ৯১ লাখ ভোটারকে বাদ দেয়া। সংখ্যাটি মোট ভোটারের ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছিল, এর মাধ্যমে তাদের ভোটারদের ষড়যন্ত্র করে বাদ দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ২৯ দিনে এতগুলো ভোটারের নাম পরীক্ষা করা হয় এবং ২৭ লাখ ভোটারের আবেদন বিবেচনাই করা হয়নি। এর মধ্যে প্রায় মুসলিম ভোটার ও দলিত শ্রেণীর মতুয়া সম্প্রদায়ের লোক আছেন, যারা সাধারণত তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে থাকেন। তবে বিজেপি নেতারা বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের নেতা শুভেন্দু অধিকারী এ বাদ পড়া ভোটারদের ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী’ বলেছেন। তবে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই, তৃণমূল কংগ্রেসও সমালোচনার ঊর্র্ধ্বে ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিক মাফিকুল ইসলাম লিখেছেন, ‘তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জনঅসন্তোষও বিজেপির উত্থানের বড় কারণ। নিয়োগ দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, সিন্ডেকেট সংস্কৃৃতি, পঞ্চায়েত নির্বাচনে সহিংসতা, দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক মানুষের মধ্যে প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছিল।’ মমতা ব্যানার্জি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, তিনি পরাজিত হননি, তাকে পরাজিত করানো হয়েছে। তিনি রীতি অনুযায়ী পদত্যাগ করবেন না। তিনি তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারকে বাতিল করে গভর্নরের শাসন জারি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিজেপিকে সরকার গঠনে আহ্বান জানানো হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচনে বিজেপির বিজয়কে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা তীব্র সমালোচনা করেছেন। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বিজেপি সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচনে ভারতের মুসলমানদের ওপর বিশেষ প্রভাব পড়েছে। শুভেন্দু অধিকারী পরিষ্কার বলেছেন, মুসলমানরা তাকে ভোট দেয়নি। চার মে নির্বাচনের ফল ঘোষণার সাথে সাথে কিছু জায়গায় মুসলমানদের ওপর হামলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচনের প্রভাব বাংলাদেশের জনগণ বিশেষ করে রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতির মিল থাকায় এবং সেখানকার হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে এ দেশের অনেকের আত্মীয়-স্বজন থাকায় স্বাভাবিক কারণে তারা উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। বিজেপির মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা দেয়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিজেপি সবসময় অহিন্দুবিদ্বেষী তথা হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী। বিশেষ করে ভারতের মুসলমানদের তারা বহিরাগত বলে বিবেচনা করে। সুতরাং তারা মনে করে, মুসলমানদের ভারতে বাস করার কোনো অধিকার নেই। ভারতের লেখক সুপ্রতীম দাশ ২০০২ সালে লিখেছেন, ‘এটি অনস্বীকার্য যে, সাম্প্রতিককালের ভারতবর্ষে উগ্র, হিংস্র সাম্প্রদায়িকতার মূল স্তম্ভ হলো হিন্দুত্ববাদ। এটি এমন এক রাজনৈতিক সুবিধাবাদী-মতাদর্শ যা এ মূহূর্তে এ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির সামনে সবচেয়ে বড় বিপদ। এই হিন্দুত্বের স্বঘোষিত অভিভাবক ‘সঙ্ঘপরিবার’ গত এক দশকে যাদের দাপাদাপি ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এরা ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা, উদারতা বা শোভনতার ধার ধারে না।’ তিনি আরো লিখেন, ‘হিন্দুধর্মের সাথে হিন্দুত্ববাদের কোনো সম্পর্ক নেই। হিন্দুত্ববাদ রাজনৈতিক ধারণা। তা শুধু হিন্দুরাষ্ট্রকেই অনুমোদন করে। আরএসএসের গুরু গোলওয়ালকার বলেছিলেন, হিন্দুস্তানে জাতীয়তাবাদ মানে হিন্দুধর্ম। ...হিন্দুধর্মের ঐতিহাসিক শক্তি বলে আজ আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তার রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রসঙ্গটি আলাদা। সেটি বিজেপির গোপন অ্যাজেন্ডায় জ্বলজ্বল করতে পারে, আমার আপনার কাছে তার মূল্য কানাকড়িও নয়।’ তার সাথে একই সুরে কথা বলেছেন ভারতের আরেক লেখক জ্যোতিপ্রকাশ চট্টেধাপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘ধ্বংসে, ধর্ষণে, হত্যায় অহিন্দুদের আতঙ্কগ্রস্ত করে, ভীত, ত্রস্ত, অসহায় করে তাদের হীনম্মন্য করে তোলাই ওদের মতাদর্শ, ওদের লক্ষ্য। তাতেই অহিন্দুরা আপনিই দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে যাবে। ঠিক তাই ছিল আরএসএস নেতা তাত্ত্বিক গোলওয়ালকারের স্বপ্ন। আজো আরএসএস সেই স্বপ্ন রূপায়ণে কাজ করে যাচ্ছে পরিকল্পিতভাবে।’ ভারতের আরেক লেখক কুনাল চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘১৯৪৮ সালে গান্ধী হত্যার পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ নিষিদ্ধ হয়েছিল। রাজনীতি করব না- এই মুচলেকা দিয়ে গোলওয়ালকার যখন বেরোলেন তখন তারা নতুন রণকৌশল স্থির করেছিলেন। প্রথমে তৈরি সংসদীয় এলাকার রাজনীতির জন্য ভারতীয় জনসঙ্ঘ। এরই নতুন সংস্করণ ভারতীয় জনতা পার্টি, বিজেপি।’ লেখক শুভঙ্কর ঘোষ লিখেছেন, ‘বিজেপি সদ্যোজাত শিশুশক্তি নয়। ১৯৮০-তে এই দলের জন্ম। কাগজে-কলমে এটি সত্য। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক বিকাশের মধ্য দিয়ে এই হিন্দুত্ববাদী ধর্মান্ধ দলের উত্থান। ১৯১৩ সালে সারা ভারতে হিন্দু মহাসভার প্রতিষ্ঠা। ১৯২৫-এ স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের জম্ম। ১৯৫১-য় জনসঙ্ঘ, ১৯৬৪-তে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, ১৯৬৬-তে শিবসেনা এবং ১৯৮০-তে বিজেপির জন্ম।’ অমিতাভ চন্দ্র বলেছেন, ‘হিন্দুত্ববাদের ভয়াল পৈশাচিক রূপ আমাদের প্রত্যক্ষ করিয়েছে গুজরাট। হিন্দুত্ববাদ সক্রিয় নানাভাবে- তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজে। স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে গৈরিক ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি, ...বর্বর পশুশক্তি প্রয়োগ করে সমস্ত ভিন্নমত দমনের মাধ্যমে নিজস্ব মত ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার সাথেই মানুষের মননের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এবং তার মগজ ও চেতনাকে দখলদারির প্রয়াসটিকে মিশিয়ে দিয়ে হিন্দুত্ববাদ রচনা করে চলেছে গৈরিক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পটভূমি।’ উগ্র হিন্দুত্ববাদ সম্পর্কে জানতে হলে পশ্চিম বাংলার লেখক গোলাম আহমাদ মোর্তজা রচিত ‘ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়’ পড়ে দেখতে পারেন।
আমরা বাংলাদেশের বিশিষ্ট লেখক ফিরোজ মাহবুব কামালের সাম্প্রতিক একটি লেখার সংক্ষিপ্তসার তুলে ধরছি। তিনি বলেছেন, হিন্দুত্ববাদের জন্ম নরেন্দ্র মোদির গুজরাট বা শিবাজির জন্মস্থান মহারাষ্ট্রেও হয়নি। অথবা রাম মন্দিরের তীর্থভূমি উত্তর প্রদেশেও নয়। হিন্দুত্ববাদের জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতার হিন্দু কবি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা ‘হিন্দুত্ব’ পরিভাষাটি প্রথমে তুলে ধরা হয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে। এটি ছিল মুসলিমবিদ্বেষী উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানোর একটি গ্রন্থ। এ উপন্যাসেই স্থান পেয়েছে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দেমাতরম’। এটিকে মুসলমানরা কখনো গ্রহণ করেনি; কারণ এতে পৌত্তলিকতার প্রশস্তি গাওয়া হয়েছে। মুসলমানদের এ গান গাইতে বাধ্য করা হচ্ছে। এমনকি ব্রিটিশ আমলেও কলকাতার বাবুরা এ গানকে অবিভক্ত বাংলার স্কুলে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তখনকার মুসলিম নেতাদের চাপে তা সম্ভব হয়নি।
আগের উদ্ধৃতি থেকে জানা গেল, হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি শুরু হয় হিন্দু মহাসভার হাত দিয়ে। ওই সংগঠনটির জন্ম হয়েছিল কলকাতায়। এর প্রথম সভাপতি ছিলেন বাঙালি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ মুখার্জির পুত্র। তিনি নিজেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। সুতরাং দেখা যায়, হিন্দুত্ববাদের জন্ম কোনো সাধু-সন্যাসীর গৃহে হয়নি; বরং হয়েছে বাঙালি কুলিন হিন্দুর গৃহে। সেখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চেতনা পুরো ভারতবর্ষে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন বাঙালি হিন্দু লেখকরা। হিন্দুত্ববাদের অন্যতম শীর্ষ চরিত্র হলো মহারাষ্ট্রের শিবাজি। মারাঠা গোত্রপতি শিবাজি হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির এক জনপ্রিয় চরিত্র এ কারণে যে, তিনি মোগল সম্রাটদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। এমনকি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত তার প্রশস্তি গেয়ে কবিতা রচনা করেন। কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্র ব্যানার্জি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম শিবাজি উৎসব চালু করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় প্রকাশিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় সাম্প্রদায়িকতার উসকানি দেয়া হতো। রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে ওই পত্রিকার সম্পাদক হয়েছিলেন। বস্তুত সাম্প্রদায়িকতাকে পণ্য বানিয়ে সাহিত্য চর্র্চায় রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, হেমচন্দ্র নবীনচন্দ্র, ঈশ্বরগুপ্তের মতো লেখক- কেউ পিছিয়ে ছিলেন না। বাঙালি হিন্দু মানসকে মুসলিমবিদ্বেষে বিষাক্ত করে তুলেছিলেন এসব কবি-সাহিত্যিক। ব্রিটিশ আমলের সেই সময়ে বাংলার গ্রামে-গঞ্জে চলছিল হিন্দু জমিদারদের হাতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ও বিদ্বেষ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে উগ্র হিন্দুদের মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতা আরো বেড়ে যায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯১১ সালে ব্রিটেনের রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষ সফরে এলে তাকে রাজকীয় সংবর্ধনা দেয়া হয়। তার বন্দনা করে রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতা/গান রচনা করেন ‘জনগণ মন অধিনায়ক হে ভারত ভাগ্যবিধাতা’। পরে সেটিই ভারতের অন্যতম জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে চালু করা হয়। সত্যিই বিস্ময়কর যে, ঔপনিবেশিক প্রভুর জন্য নিবেদিত একটি গানকে স্বাধীন ভারতের জাতীয়সঙ্গীত করা হয়। একইভাবে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে বাঙলাকে দ্বিখণ্ডিত করার অভিযোগ তুলে রবীন্দ্রনাথ যে গানটি লিখেছিলেন সেটি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে।
যাই হোক, উগ্র হিন্দুত্ববাদের ইতিহাস থেকে এবারে গেল সপ্তাহে তাদের দ্বারা সংঘটিত কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা করা যাক। নির্বাচন-পরবর্তীকালে তাদের কার্যকলাপের চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্ল্যাটফর্ম ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টে’র একটি বিবৃতিতে। সেটি তুলে ধরছি- ‘ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়লাভের অব্যবহিত পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিতভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দল, বামপন্থী সংগঠন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ধারাবাহিক হামলা, ভাঙচুর, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক উসকানি চালানো হচ্ছে।’ বিবৃতিতে আরো বলা হয়, কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় গরুর গোশত বিক্রেতাদের দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও চরম নিন্দনীয়। এটি স্পষ্টতই সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর জীবিকা, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের ওপর হিন্দুত্ববাদী আক্রমণ। কেন্দ্রের শাসকদলের সমর্থকদের এই ‘বুলডোজার রাজনীতি’ গণতন্ত্রের নয়; বরং উগ্র ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রচর্চার প্রতিফলন।’ বামপন্থী নেতাদের এ বিবৃতিকে সাধুবাদ জানাতে হয়। তারা আরো বলেছেন, ‘আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি বিজেপির বিভিন্ন নেতার বাংলাদেশবিরোধী কুরুচিপূর্ণ, উসকানিমূলক ও অবমাননাকর বক্তব্যে বিরুদ্ধে। প্রতিবেশী একটি স্বাধীন সার্বভৗম রাষ্ট্র সম্পর্কে এ ধরনের দম্ভ, অবমাননা ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ শুধু কূটনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী নয়; বরং জনগণের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিদ্বেষ সৃষ্টির অপচেষ্টা। বাংলাদেশ কোনো শক্তির করুণা বা তত্ত্বাবধানে পরিচালিত রাষ্ট্র নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত জনগণের স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। বাংলাদেশের জনগণ সাম্প্রদায়িকতা, আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদসহ সব আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অতীতেও লড়েছে, এখনো লড়বে।’
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিধান সভা নির্বাচনে বাংলাদেশের লাগোয়া রাজ্যগুলোর সব ক’টিতে বিজেপির জয় পাওয়া বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের মতো আসাম, মেঘালয় ও ত্রিপুরাতে বিজেপির সরকার গঠনের ফলে এর পরবতী কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা খতিয়ে দেখা যাক।
প্রথমত, আসামের মতো পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের লোকদের বাদ দেয়া হয়েছে। বিজেপি অভিযোগ করেছে, এরা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। বেশ কিছু দিন থেকে বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশী বলে সীমান্তের ওপার থেকে পুশব্যাক করার অপচেষ্টা চলছে। এখন সেই অপচেষ্টা আরো ব্যাপক ও জোরদার হতে পারে; এমনকি তা রোহিঙ্গাদের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সাহসী কূটনীতি প্রয়োজন হবে।
দ্বিতীয়ত, ভারতের অন্যান্য রাজ্যে যেখানে বিজেপি ক্ষমতায় রয়েছে সেগুলোতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিমদের ওপর নানাবিধ অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এবারে সেই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গও যোগ হলো। এর তীব্রতা আরো বাড়তে পারে; যার প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে।
তৃতীয়ত, উপর্যুপরি সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা চালানো হতে পারে। বিগত নির্বাচনে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের উত্থান বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অনেক জেলায় জামায়াতে ইসলামীর জয়লাভকে বিজেপি ভালোভাবে নেয়নি। তারা প্রতিনিয়ত তাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যাচ্ছে।
চতুর্থত, পতিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একটি বিরাট অংশ ভারতে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নিয়েছেন। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম থেকে প্রতীয়মান হয়, তারা বিজেপির জয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। শুভেন্দু অধিকারী তো বলেই ফেলেছেন, ‘শেখ হাসিনা এখনো বাংলাদেশের বৈধ প্রধানমন্ত্রী। তিনি শীগগিরই ঢাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন।’ বাংলাদেশের কথাকথিত সুশীলদের বেশ হাসিখুশি দেখা যাচ্ছে বলে কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। সুতরাং বিজেপি সরকার রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের পরিকল্পনায় তাদের বাংলাদেশী দালালদের যোগসাজশে কিছু করবে না- এমনটি মনে করার সরল চিন্তা করা সঠিক হবে না।
লেখক : গবেষক ও সাবেক সচিব



