খাল খননের প্রাসঙ্গিকতা

কৃষিতে ভালো ফলন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের গুণগত পরিবর্তন আনতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মপরিকল্পনা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এ ছাড়াও ভারত অভিন্ন ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রত্যাহার করে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে যে পানি সঙ্কট সৃষ্টি করছে তার কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নদীমাতৃক ব-দ্বীপ হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ। আবহাওয়ার বিচারে ষড়ঋতুর দেশ। এই দেশের নামের সাথে নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর ওতপ্রোতোভাবে জড়িত। বাংলাদেশে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, দেশে বর্তমানে ৪১৪টি হাওর আছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য- ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪২৩টি হাওর আছে বাংলাদেশে। আছে ছোট-বড় মিলিয়ে অসংখ্য খাল। বর্তমানে দেশে বহমান নদ-নদীর সংখ্যা এক হাজার আট। নদীগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক নদীর সংখ্যা ৫৭টি। এর মধ্যে ৫৪ নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতে। দেশের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণাঞ্চল এবং ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে বঙ্গোপসাগর।

গ্রাম ও শহরের পাদদেশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মানবদেহের শিরা ও উপশিরার মতো নদী, হাওর ও খালগুলো প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ধন, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কৃষি, মৎস্য সম্পদ ও নৌপথে পণ্য পরিবহন, পর্যটনকেন্দ্রসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছাড়াও বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এই নদ-নদী এবং জলযানের ভূমিকা অপরিসীম। গল্প, কবিতা, চলচ্চিত্র ও গানের মাধ্যমে আবহমান বাংলার নদ-নদীর, হাওর, বিলের বৈচিত্র্যতা, বিশাল জলরাশির কারণে সৃষ্ট প্রতিকূলতা ঝড় জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি একইসাথে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি সুরের গানে মানুষের আবেগ অনুভূতির এখনো অনেকটা জায়গা দখল করে রেখেছে। এক কথায়, বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু হাল আমলে এসে প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট এই সমস্ত হাওর ও নদ-নদী, খাল-বিলের পানি স্বাভাবিক প্রবাহে বিঘ্ন ঘটছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫৪ নদীর প্রায় সবকটি নদীতে ভারত বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে।

দেশের নদী, খাল ও হাওরগুলোর নাব্য এবং বিস্তৃতি আগের অবস্থানে না থাকায় বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে এবং ভারতে বন্যা দেখা দিলে কোনো প্রকার সতর্কতা ছাড়াই পানি ছেড়ে দেয়ায় আমাদের অসংখ্য গ্রাম-শহর তলিয়ে যায়। এতে বাংলাদেশের বিশেষ করে ভাটি অঞ্চল প্লাবিত হয়। জানমাল ও কৃষিপণ্য ব্যাপকভাবে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। একই সাথে বন্যার পানির সাথে উজান থেকে বয়ে আসা মাটি, পলি ও বালু নদী, খালের তলদেশে জমা হয়ে নাব্য হ্রাস পায়, যার ফলে আমাদের নদী ও খালগুলো ভরাট হয়ে যায়। এতে নদীগুলোতে ডুবোচরের সৃষ্টি হয়। আর এই সুযোগে কতিপয় অসাধু ও লোভী মানুষ নদী ও খালের পাড় দখল করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট বা বাণিজ্যিক স্থাপনা এমনকি শিল্পা-কারখানা নির্মাণ করে অবৈধভাবে দখল করে নেয়। অপর দিকে, এ সমস্ত বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং নদীর তীরঘেঁষে গড়ে উঠা শিল্প-কলকারখানার বর্জ্য এবং শহরের কঠিন বর্জ্য (প্লাস্টিক, আবর্জনা) সরাসরি খালে ফেলায় তলদেশ ভরাট হয়। এতে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় খালগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে।

অন্য দিকে জনসংখ্যা বাড়ায় খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষিতে ঝুঁকি বেড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়া, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, কৃষি উৎপাদনে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনে সমস্যা ও ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়নে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা, ব্রিজ বা স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করেই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে যশোরের উলশী যদুনাথপুরে পরীক্ষামূলকভাবে খাল খনন কর্মসূচির সূচনা করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন ও দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি কৃষিতে বিপ্লব ঘটানো এবং কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য বর্ষাকালের বিশাল জলরাশির কিছু অংশ ধরে রাখতে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। খাল খনন কর্মসূচি মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে তিনি কাজের বিনিময়ে খাদ্যের (কাবিখা) কর্মসূচি পরিচালনা করেছেন। এই কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন। এতে এক দিকে গ্রামে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। অন্য দিকে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছিল।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই ১৯ দফার অন্যতম একটি লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন এবং কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে দেশজুড়ে ব্যাপক আকারে খাল খনন শুরু করেন।

দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর পর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন করে খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। বিগত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় যেতে পারলে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কারা হবে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মাথায় গত ১৬ মার্চ দেশব্যাপী নদী-নালা-খাল, জলাধার খনন ও পুনর্খনন কর্মসূচির আওতায় দিনাজপুর জেলার কাহারোল উপজেলার বলরামপুর সাহাপাড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে খাল খনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি, তৈরী পোশাক শিল্প (RMG) এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এরমধ্যে শুধু কৃষি খাত থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তথ্য অনুযায়ী জিডিপিতে কৃষির সরাসরি অবদান ১১.০২ শতাংশ। এ ছাড়াও কৃষি আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ।

কাজেই কৃষিতে ভালো ফলন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের গুণগত পরিবর্তন আনতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মপরিকল্পনা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। এ ছাড়াও ভারত অভিন্ন ৫৪টি আন্তর্জাতিক নদীর পানি প্রত্যাহার করে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে যে পানি সঙ্কট সৃষ্টি করছে তার কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।

লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট