ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন
বহুল প্রচলিত একটি প্রবাদ এরকম, গাধা জল খায় ঘোলা করে। এই প্রবাদটি অনেকের মনে পড়তে পরে জুলাই সনদ নিয়ে যা কিছু হচ্ছে তার প্রেক্ষিতে।
নব্বইয়ের দশকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি জিতে এসেছিল বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। ভাগ্যের কী পরিহাস! সেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত ও আওয়ামী লীগকে মিলে রাজপথে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুলতে হয়। শেষমেশ একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে একরকম নাকে খত দিয়ে বিএনপিকেই সেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। আর লাভের লাভ যা হয় তা হলো, এই বিলটি পাসের অব্যবহিত পরে ওই সংসদ ভেঙে দিয়ে যে নির্বাচন দেয়া হয়, তাতে বিএনপি ক্ষমতাচ্যুত হয় এবং দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার সুযোগ পায়। অথচ, বিএনপি চাইলেই একটু দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়ে আগেভাগে নিজ থেকে উদ্যোগী হয়ে এই ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারত। সে ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থার দাবিতে রাজপথে যে তুমুল আন্দোলন গড়ে ওঠে সেটি হতো না এবং যেরকম অসম্মানজনকভাবে বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল, তাও হয়তো ঘটত না।
এদেশে আরেকটি জনপ্রিয় প্রবাদ আছে। সেটি হলো— ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়। এদেশে অতি চালাক রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কীর্তিকলাপের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, তারা ন্যাড়া হয়েও বারবার বেলতলায় যায়। তা না হলে নব্বইয়ের দশকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০০১ সালে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপির সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়িয়ে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ার পথ সুগম করে আওয়ামী লীগের হাতে আরো একবার জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের রেসিপি ধরিয়ে দেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? সেই আন্দোলনের ফলে ওয়ান-ইলেভেন নামের ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে আরো একবার বিএনপিকে চালচুলো সবই হারাতে হলো। অথচ আওয়ামী লীগের হাতে আন্দোলন তৈরির ওই সুযোগটি যদি বিএনপি তুলে না দিত, এ দেশের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো।
এবার আওয়ামী লীগের মুন্সিয়ানার দিকটি একবার দেখা যাক। যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার আন্দোলনের উপর ভর করে দীর্ঘ দু’দশক পর অনেক কষ্টেসৃষ্টে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে এসেছিল এবং যে ব্যবস্থাকে অবলম্বন করে ২০০৮ সালে তারা আরো একবার বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল, ক্ষমতার মসনদকে নিজেদের চিরস্থায়ী ইজারায় পরিণত করার লোভে সেটিকে তারা আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে জবাই করে ফেলল। এরপর একের পর এক ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে পারলেও শেষরক্ষা কি হলো? যেভাবে দীর্ঘ ৭০ বছরের প্রাচীন এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি গণরোষের মুখে উৎখাত হয়ে দেশছাড়া হলো, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে ফাংশন করতে দিলে তাদের কি সেই পরিণতির মুখোমুখি হতে হতো?
এবার ভেবে দেখুন তো, জুলাই যদি না হতো, আজ যারা ক্ষমতায় আছেন তারা এ মুহূর্তে কোথায় থাকতেন? বেগম খালেদা জিয়াকে যেভাবে বিচারিক অবিচারের মাধ্যমে কারারুদ্ধ করে, যথাযথ চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, জুলাই না হলে কি সে অবস্থার পরিবর্তন হতো? তারেক রহমান ব্রিটেনে স্বেচ্ছা নির্বাসন থেকে দেশে ফিরে একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে আসীন হতে পারতেন? যে জুলাই আপনাদের অর্গলমুক্ত করল সেই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার প্রতি এই উপেক্ষা কেন? ইতিহাসের সেই বাঁকগুলোর দিকে একবার ফিরে তাকান। দেওয়ালের লিখন ঠিকমতো পড়তে না পারায় একবার যেভাবে ১৯৯৬ সালে এবং ফের ২০০৬ সালে ধপাস করে পড়ে যেতে হয়েছিল, জুলাই সনদ নিয়ে টালবাহানা করে সেই চিত্রনাট্যই কি পুনর্মঞ্চায়নের প্রস্তুতি চলছে?
জুলাই সনদ নিয়ে যে এরকম একটি টালবাহানা হতে পারে, সেটি অনুমিতই ছিল। গণভোট প্রশ্নে বিএনপির দাবি আমলে নিয়ে গ্রাউন্ডটি তৈরি করে রেখেছিল ইউনূস সরকার নিজেই, আর তাতে বুঝে হোক কিংবা না বুঝে— সমর্থন জুগিয়েছিল জুলাই বিপ্লবের নায়কদের নিয়ে গড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। না, আপনি ভুল কিছু শুনছেন না, ঘটনার ধারাক্রম সেরকমই। জামায়াত ও তার সমমনা দলগুলো জোর দাবি জানিয়ে আসছিল জুলাই সনদের উপর গণভোট আগে অনুষ্ঠানের জন্য। অন্যদিকে আগে গণভোট অনুষ্ঠান প্রশ্নে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে আসছিল বিএনপি। এ বিষয়ে এনসিপির অবস্থান ছিল— সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হওয়াতে তারা কোনো সমস্যা দেখে না। শেষাবধি ইউনূস সরকার সেভাবেই সিদ্ধান্ত দেয়। একবার ভেবে দেখুন তো, গণভোটটা আগে হয়ে গেলে জুলাই সনদ নিয়ে আজ যে ইঁদুর-বিড়াল খেলা শুরু হয়েছে তা কি সম্ভব হতো?
তবে, এত কিছুর পরও এদেশের মানুষ আশা ছাড়তে রাজি নয়। তারা বুঝে গেছে, তাদের যাত্রাপথ বন্ধুর। এখানে প্রতিটি ইঞ্চি এগোতে হয় যুদ্ধ করে। বিজয় নিশ্চিত করা না গেলে তা ফস্কে যায়। যুদ্ধ শুরু করতে হয় নতুন করে। তবে, ইতিহাস তাদের আশাবাদী করে তোলে। অতীতে যারাই গণরায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তাদের পরাজয় হয়েছে। দেখার বিষয়, এখন যারা ক্ষমতার মসনদ অলঙ্কৃত করার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তারা কি গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজেদের ইতিহাসের বরপুত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন, নাকি গণরায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আরো একবার নিজেদের পতনের রাস্তা প্রশস্ত করবেন!
লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



