বাজেটে কালো টাকা সাদা করা আর নয়

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতে। যখন সততা অবমূল্যায়িত হয়, তখন সমাজের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য এখন সময় এসেছে স্পষ্ট অবস্থান নেয়ার- সাময়িক রাজস্বের জন্য নয়; বরং নৈতিকতা, জবাবদিহি ও টেকসই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য। তাই ২০২৬-২৭ বাজেটের মূল বার্তা হওয়া উচিত একটিই- কালো টাকা সাদাকরণ নয়, জবাবদিহির বাজেটই ভবিষ্যতের পথ।

দেশের বাজেট আলোচনায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগের বিষয়টি বারবার ফিরে আসে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ প্রথম দেয়া হয় ১৯৭৫ সালে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট প্রায় ২১ বার এ সুযোগ দেয়া হয়। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী সরকারের ১৫ বছর মেয়াদে প্রতি বছর এই সুযোগ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বাধীনতার পর থেকে ২১ বারে মোট সাদা হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। অথচ কেবল আওয়ামী সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের ১৫ বছরে বিদেশে পাচার হয় ২৮ লাখ কোটি টাকা। এত ব্যর্থতার পরও গত অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে এই সুযোগ রাখার চেষ্টা করে। পরে জনদাবির মুখে ফিরে আসে। সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে, সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার কথা ভাবছে। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান, করব্যবস্থার ন্যায়ভিত্তিক কাঠামো এবং আইনের সমতার প্রশ্নের সাথে গভীরভাবে জড়িত।

কালো টাকা সাদা করা হলো এমন এক প্রক্রিয়া, যেখানে নির্দিষ্ট কর দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়। এতে সাধারণত অর্থের উৎস নিয়ে কঠোর তদন্ত করা হয় না, ফলে দীর্ঘদিনের করফাঁকি বা অনিয়ম সহজেই বৈধতা পেয়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়, এতে অচল অর্থ অর্থনীতিতে ফিরে আসে, বিনিয়োগ বাড়ে এবং রাজস্ব আয় বাড়ে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে ভিন্ন কথা। বহুবার এই সুযোগ দেয়া হলেও করফাঁকি, দুর্নীতি কমেনি এবং টেকসই রাজস্ব কাঠামোও গড়ে ওঠেনি; বরং এতে সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, সততার চেয়ে অসততা বেশি লাভজনক।

এই নীতি অর্থনৈতিক নয়, এটি ন্যায়বিচার ও নৈতিকতার প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে এই সুযোগ চালু থাকায় করফাঁকি ও অবৈধ অর্থ উপার্জনের প্রবণতা কমার বদলে আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সৎ করদাতারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করেন, কারণ তাদের ওপর করের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে। কিন্তু যখন একজন নিয়মিত করদাতা পুরো কর দেন, আর অন্য দিকে কর ফাঁকি দেয়া ব্যক্তি বিশেষ সুবিধায় সেই অর্থ বৈধ করে ফেলেন, তখন রাষ্ট্র কার্যত অসততাকে প্রশ্রয় দেয়।

বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে আছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি জবাবদিহিও জরুরি। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই সুযোগ বন্ধ করে দেয়া উচিত। তাতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেয়া যাবে যে, দুর্নীতি ও করফাঁকির সাথে আপস করা হবে না।

কালো টাকা বৈধ করার নীতি শুধু বাংলাদেশের নয়; বিশ্বের বহু দেশ বিভিন্ন সময় এমন সুযোগ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে বেশির ভাগ দেশেই এর নেতিবাচক প্রভাব বেশি দেখা গেছে। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, আর্জেন্টিনা, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলো বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ২০১৬ সালের কর ক্ষমা কর্মসূচি তুলনামূলকভাবে সফল হিসেবে ধরা হয়, কারণ সেখানে কঠোর নজরদারি ও পরবর্তী কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। ফলে কিছু অর্থ দেশে ফেরত আসে এবং রাজস্ব বাড়ে; কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্যের মূল কারণ ছিল নীতি-পরবর্তী কঠোর প্রয়োগ। ইতালি, আর্জেন্টিনা ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কিছু অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে এলেও দীর্ঘমেয়াদে কর নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার উন্নতি হয়নি। ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, বারবার এমন সুযোগ দিলে মানুষ নিয়মিত কর দেয় না; বরং ভবিষ্যতে ওই সুযোগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে।

বর্তমানে অনেক দেশ এই নীতি থেকে সরে গিয়ে কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, ডিজিটাল নজরদারি ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে জোর দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ওইসিডি ও ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সও স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বারবার সুযোগ দেয়া হলেও বাংলাদেশে কালো অর্থনীতির আকার কমেনি (ICMAB); বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বেড়েছে বলে ধারণা করা হয়।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগকে অনেকসময় অর্থনীতির জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়। বলা হয়- অপ্রদর্শিত অর্থ মূল অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনা যাবে এবং রাজস্ব বাড়বে; কিন্তু বাস্তবে এটি স্বল্পমেয়াদে কিছু আয় দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে দুর্বল করে।

এটি করফাঁকি উৎসাহিত করে। এতে রাজস্ব কাঠামো দুর্বল হয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, বারবার এই সুযোগ দেয়া হলেও কর-জিডিপি অনুপাত তেমন বাড়েনি। অর্থাৎ- টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধি হয়নি; বরং এটি এমন বার্তা দিয়েছে যে, কর ফাঁকি দিলেও শেষ পর্যন্ত বৈধ হওয়ার সুযোগ আছে।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো- বৈধ হওয়া অর্থ বেশির ভাগ সময় উৎপাদনশীল খাতে যায় না; বরং জমি ও ফ্ল্যাটের মতো অলস সম্পদে বিনিয়োগ হয়। এতে প্রকৃত কর্মসংস্থান বা শিল্পায়ন বাড়ে না; বরং সম্পদের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি হয়।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকেও এটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। যে নীতি অন্যায় উপার্জনকে পরোক্ষভাবে বৈধতার সুযোগ দেয়, তা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। কালো টাকা সাদা করার সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনৈতিক নয়; বরং নৈতিক ও সামাজিক। কারণ এটি ধীরে ধীরে সমাজের মূল্যবোধ পরিবর্তন করে দেয়। তরুণ প্রজন্মের মনে নৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো- এটি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

একটি সমাজের স্থিতিশীলতা শুধু অর্থনীতির ওপর নয়, নৈতিক ভিত্তির ওপরও নির্ভর করে। যখন সেই ভিত্তি দুর্বল হয়, তখন দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নও টেকসই হয় না। তাই কালো টাকা সাদা করার নীতি বন্ধ করা শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি নৈতিক দায়িত্বও।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। কর ফাঁকি দেয়া ব্যবসায়ী অতিরিক্ত অর্থ হাতে রেখে কম দামে প্রতিযোগিতা করতে পারেন, ফলে সৎ ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে পড়েন। দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এর প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পড়ে। একটি দেশের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বারবার অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিলে বিদেশে ধারণা তৈরি হয়, দেশে দুর্নীতি ও করফাঁকির প্রতি সহনশীলতা রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অর্থপাচার ও মানিলন্ডারিং নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে রয়েছে। এ অবস্থায় এমন নীতি বিদেশীদের আস্থা দুর্বল করতে পারে। পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার নৈতিক অবস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সমাধান হলো- কালো টাকা সাদা করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা এবং একটি স্বচ্ছ করব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো বিশেষ সুবিধা থাকবে না।

একই সাথে করব্যবস্থা সহজ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে, যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় কর দিতে আগ্রহী হয়। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে এবং করফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সম্পদের উৎস যাচাই কঠোর করা, বড় লেনদেন ও সম্পদ ক্রয়ে নজরদারি বাড়ানোও জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আইন থাকলেই হবে না, তা সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে। তবেই একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে।

রাষ্ট্রের শক্তি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতে। যখন সততা অবমূল্যায়িত হয়, তখন সমাজের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের জন্য এখন সময় এসেছে স্পষ্ট অবস্থান নেয়ার- সাময়িক রাজস্বের জন্য নয়; বরং নৈতিকতা, জবাবদিহি ও টেকসই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য। তাই ২০২৬-২৭ বাজেটের মূল বার্তা হওয়া উচিত একটিই- কালো টাকা সাদাকরণ নয়, জবাবদিহির বাজেটই ভবিষ্যতের পথ।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]