বাংলাদেশের রাজনীতি আবারো এক পরিচিত মোড়ে দাঁড়িয়ে। ক্ষমতা বদলেছে। ভাষা বদলেছে; কিন্তু আচরণ? সেটি যেন একই আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের শুরু থেকে একটি বিষয় কেন্দ্রবিন্দুতে- জুলাই জাতীয় সনদ। এ সনদ কেবল একটি কাগজ নয়। এটি একটি প্রতিশ্রুতি। একটি গণ-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। একটি রাজনৈতিক চুক্তি, যা জন্ম নিয়েছিল আন্দোলনের উত্তাপে।
প্রশ্ন উঠছে- এ সনদের ভবিষ্যৎ কী? এটি কি বাস্তবায়িত হবে? নাকি এটি কেবল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল?
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যে একটি স্পষ্ট বার্তা আছে। তিনি বলেছেন, অনেক কিছু আপস করে স্বাক্ষর করা হয়েছে। সংস্কারের নামে নির্বাচন ঠেকানোর আশঙ্কা ছিল। এ বক্তব্য সরল নয়। এটি গভীর রাজনৈতিক সঙ্কেত বহন করে। অর্থাৎ, যে সনদে স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেটি নিয়ে এখন সংশয় তৈরি করা হচ্ছে। এটি কি তাহলে শুরু থেকে আন্তরিক ছিল না? রাজনীতিতে আপস নতুন কিছু নয়; কিন্তু আপস যদি জনগণের সাথে করা প্রতিশ্রুতিকে অস্বীকার করে, তাহলে সেটি আর কৌশল থাকে না, তা হয়ে যায় অবিশ্বাসের সূচনা।
গণভোট একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এটি সরাসরি জনগণের মতামত; কিন্তু এখন যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে সরকার গণভোটের ফল পুরোপুরি মানতে আগ্রহী নয়। বিষয়টি আদালতে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এটি একটি পরিচিত কৌশল। রাজনীতিবিদরা প্রায়ই কঠিন সিদ্ধান্ত আদালতের ওপর ছেড়ে দেন। তাতে রাজনৈতিক দায় কমে; কিন্তু এতে কি জনগণের আস্থা বাড়ে? না। বরং কমে। কারণ জনগণ ভোট দিয়েছে সিদ্ধান্ত নিতে, দায় এড়াতে নয়। অতীতের ফ্যাসিবাদী সরকার আদালতকে যথেচ্ছ ব্যবহার করেছে। এ সরকারও কি সে দিকে যেতে চাচ্ছে? লক্ষণ কিন্তু তাই বলে।
জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ যুক্ত হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি দেখায় যে, ঐকমত্য পুরোপুরি ছিল না। প্রশ্ন হলো- যদি মতভেদ এত গভীর ছিল, তাহলে স্বাক্ষর করা হলো কেন? আর যদি স্বাক্ষর করা হয়, তাহলে এখন তা প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে কেন? এখানে রাজনীতির দ্বৈধতা স্পষ্ট হয়। এক দিকে বলা হচ্ছে- সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। অন্য দিকে বলা হচ্ছে- এটি আপসের ফল। এ দ্বৈত অবস্থান বিভ্রান্তির জন্ম দিচ্ছে।

সংসদে এখন সরকারের শক্তিশালী অবস্থান। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এটি একটি বড় সুযোগ। সংস্কার করার সুযোগ। ব্যবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ; কিন্তু ইতিহাস অন্য কিছু বলে। এ অঞ্চলে অতীতে এমন শক্তিশালী সরকারগুলো অহঙ্কারে পতিত হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা যখন জবাবদিহি দুর্বল করে, তখন তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
আজ সংসদে যে ভাষা ব্যবহার হচ্ছে, তা অনেককে সেই পুরনো দিনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
সংসদে বিরোধী দলকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার প্রবণতা লক্ষণীয়। এটি নতুন নয়। আগের সরকারও একই কাজ করেছিল। আজ যারা ক্ষমতায়, তারা তখন বিরোধী দলে ছিলেন। তারা অভিযোগ করতেন। প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু এখন? তারা একই আচরণ করছেন। এটি একটি চক্র। ক্ষমতা বদলায়, আচরণ বদলায় না।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। তার বক্তব্যে ইতিহাসের ভার আছে। অভিজ্ঞতার সতর্কতা আছে। সবচেয়ে বড় কথা- বর্তমানের জন্য একটি সরাসরি ইঙ্গিত আছে।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। শেখ সাহেব (শেখ মুজিবুর রহমান) নিহত হয়েছিলেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ের ঘটনাগুলো আমাদের আতঙ্কিত করে’। এ উদ্ধৃতি শুধু অতীত স্মরণ করিয়ে দেয়া নয়; এটি বর্তমানের জন্য একটি সতর্ক ঘণ্টা।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা গণতন্ত্রে শক্তি; কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন শক্তি বিপজ্জনক। সৈয়দ তাহের সেই বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। তিনি আরো বলেন, ‘উপমহাদেশে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর সময়ে, বাংলাদেশে শেখ সাহেবের সময়ে, একটা ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা দেখি।’ এ ধারাবাহিক উদাহরণ কাকতালীয় নয়। এগুলো ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের ফল। সংসদে তার আরেকটি মন্তব্য আরো তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘আজকে যারা সরকারি দলের আসনে আছেন, তারা বোধহয় আওয়ামী লীগ থেকে এসেছেন, ঠিক আজকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমরা একই ধরনের আচরণ লক্ষ করছি।’ এই বক্তব্যে একটি তীব্র ব্যঙ্গ আছে এবং একটি গভীর সত্যও লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি পুরনো সমস্যা বহাল রয়েছে। ক্ষমতায় গেলে দলগুলো দ্রুত বদলে যায়। বিরোধী দলে থাকলে তারা গণতন্ত্রের কথা বলে। সহনশীলতার কথা বলে; কিন্তু ক্ষমতায় গিয়েই সেই ভাষা বদলে যায়। আচরণ বদলে যায়। তখন বিরোধী দলকে তুচ্ছ করা শুরু হয়। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়। তাহের মূলত এ চক্রের কথাই বলেছেন। তার বক্তব্য পরিষ্কার, তিনি বর্তমান সরকারকে আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে বলছেন। কারণ আর কিছু নয়, ইতিহাস বারবার একই শিক্ষা দিয়েছে; কিন্তু রাজনীতি সেই শিক্ষা নিতে চায় না।
সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা একটি সুযোগ। এটি সংস্কারের দরজা খুলে দেয়; কিন্তু একই সাথে এটি একটি পরীক্ষা। বিপুল এই শক্তি কিভাবে ব্যবহার করা হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন। যদি এটি সংলাপের বদলে আধিপত্যে ব্যবহার হয়, তাহলে ফল ভালো হয় না। তাহেরের বক্তব্যে আরেকটি দিক হলো সতর্কতা। তিনি বলেছেন, ‘সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই, এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশে আর কখনো না ঘটুক’। এটি কোনো হুমকি নয়। এটি একটি সতর্ক আহ্বান। একটি রাজনৈতিক বার্তা- ইতিহাসের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়।
এই মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ সংবেদনশীল। সংসদে ভাষার ব্যবহার, আচরণের ধরন- সবকিছু নজরে আছে। মানুষ দেখছেন। তুলনা করছেন। একই সাথে বিচার করছেন। সৈয়দ তাহেরের বক্তব্যকে তাই কেবল বিরোধী রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন। ক্ষমতা সীমাহীন হলে সেটি নিজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়। আস্থা। সেই আস্থা যদি ক্ষয়ে যায়, তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও টেকে না। আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের মূলত সেই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন।
একটি বড় অভিযোগ- সরকার সমালোচনা নিতে চায় না। চায় নিয়ন্ত্রিত সমালোচনা। চায় নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে থাকা মতামত; কিন্তু গণতন্ত্রে সমালোচনা স্বাধীন হতে হয়। যেখানে সমালোচনা সীমাবদ্ধ, সেখানে সত্যও সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। মিডিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একসময় বলা হতো, মিডিয়া ছিল একদলীয় প্রভাবের মধ্যে। এখন বলা হচ্ছে, সেটি অন্য দিকে ঝুঁকেছে। যদি মিডিয়া সত্যিই পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। কারণ মিডিয়া হলো জনগণের চোখ। যদি সেই চোখ আংশিক দেখে, তাহলে বাস্তবতাও বিকৃত হয়ে যায়।
রাজনৈতিক বাস্তবতা বনাম নৈতিক প্রতিশ্রুতি- আজকের সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব এখানে। এক দিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা। ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল। অন্য দিকে নৈতিক প্রতিশ্রুতি। জনগণের প্রতি অঙ্গীকার। জুলাই সনদ এ দুইয়ের সংঘর্ষের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যদি এটি বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে এটি কেবল একটি হারানো সুযোগ নয়- এটি একটি ভাঙা বিশ্বাস। তবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। কিন্তু সঙ্কেতগুলো উদ্বেগজনক। সরকার যদি আন্তরিকভাবে সনদ বাস্তবায়ন করে, তাহলে আস্থা ফিরে আসতে পারে।
যদি গণভোটের ফলকে সম্মান করা হয়, তাহলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। যদি বিরোধী দলকে সম্মান দেয়া হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি উন্নত হবে; কিন্তু যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে সঙ্ঘাত বাড়বে।
বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছু দেখেছেন। তারা প্রতিশ্রুতি শুনেছেন। ভাঙা প্রতিশ্রুতিও দেখেছেন। জুলাই আন্দোলন তাদের নতুন আশা দিয়েছিল। এখন সেই আশার পরীক্ষা চলছে। এ পরীক্ষা শুধু একটি সরকারের নয়। এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার। ক্ষমতা স্থায়ী নয়; কিন্তু আস্থা স্থায়ী হতে পারে- যদি সেটি রক্ষা করা হয়।
আজ প্রশ্ন একটাই- সরকার কি সেই আস্থা রক্ষা করবে? নাকি আবারো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
লেখক : সাবেক সাধারণ সম্পাদক


