বিশ্বের সফল জাতিগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তাদের উন্নতির একটি মন্ত্র হলো মাতৃভাষায় শিক্ষা ও গবেষণা। জাপানের কথা ধরা যাক; তারা বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো তাদের শিক্ষাব্যবস্থার আদ্যোপান্ত জাপানি ভাষায় রচিত। এমনকি ফিনল্যান্ড, যারা আধুনিক বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ, সেখানেও প্রাথমিক স্তরে শিশুর মাতৃভাষাকেই একমাত্র গুরুত্ব দেয়া হয়।
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও ভাষাবিজ্ঞান স্পষ্টভাবে বলছে, শিশুর ১০ থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত তার মগজের বিকাশ ও চিন্তা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার জন্য মাতৃভাষার বিকল্প নেই। অথচ আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে শিশুদের জীবন নিয়ে এক ধরনের বৈজ্ঞানিক জুয়া খেলা হচ্ছে।
শৈশব থেকেই তাদের ওপর নানা ভাষার অপ্রয়োজনীয় বোঝা চাপিয়ে দিয়ে আমরা তাদের মনোজগৎকে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলছি। ফলে শিশুরা না শিখছে গভীর চিন্তা করতে, না পারছে কোনো একটি ভাষায় প্রকৃত দক্ষতা অর্জন করতে। এই জগাখিচুড়ি শিক্ষাপদ্ধতি সৃজনশীলতা হত্যার নামান্তর।
অনেকে মনে করেন, মাতৃভাষার ওপর গুরুত্ব দিলে আমরা হয়তো বিশ্বায়ন থেকে পিছিয়ে পড়ব। এই ধারণাটি কেবল ভুলই নয়; বরং বিপজ্জনক। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা জার্মানির উদাহরণ দেখুন; তারা তাদের মাতৃভাষায় দক্ষ হওয়ার পর বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইংরেজি বা অন্যান্য প্রভাবশালী ভাষা রপ্ত করে বিশ্ব জয় করছে। আমাদের প্রস্তাব হলো- একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত (প্রাথমিক স্তর) শিক্ষা হবে সম্পূর্ণ মাতৃভাষায়। এরপর শিশুকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে আন্তর্জাতিক ভাষাগুলোতে দক্ষ করে তুলতে হবে। ভাষা শিক্ষা হতে হবে বৈজ্ঞানিক স্তর বিন্যাসের মাধ্যমে, যেখানে মাতৃভাষা হবে ভিত্তি আর বিদেশী ভাষা হবে সেই ভিত্তির ওপর আধুনিক ইমারত। বর্তমান সময়ে আমরা ইমারত গড়তে গিয়ে ভিত্তিটিকেই ধসিয়ে দিচ্ছি।
লেখক : ডিন, কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা



