মো: সালমান সাদেকীন চয়ন
একবিংশ শতাব্দীর এই পর্যায়ে এসে আমরা এমন এক প্রযুক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েছি, যা কয়েক দশক আগেও কল্পবিজ্ঞানের বিষয় ছিল। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন স্মার্টফোন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কর্মক্ষেত্রে জায়গা করে নিয়েছে, তথ্য আদান-প্রদান ও প্রচারে অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু যে এআই প্রযুক্তি কাজ সহজ করছে, সেটির কারণেই আমাদের নিরাপত্তা ও তথ্যের সত্যতা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে। প্রশ্ন জাগছে, তথ্যের এই দ্রুত প্রবাহের যুগে আমরা আসলে কতটা নিরাপদ?
সাধারণ মানুষের জন্য এআইয়ের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ‘পার্সোনালাইজড ইনফরমেশন’ বা ব্যক্তিগত রুচি অনুযায়ী তথ্য পাওয়া। কেউ যখন ইন্টারনেটে কোনো বিষয় খোঁজেন, এআই তার পছন্দ বুঝে সেই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য সামনে হাজির করে। এছাড়া চ্যাটবটের মাধ্যমে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সাধারণ মানুষকে তথ্যসেবা দিচ্ছে। সারিতে না দাঁড়িয়েও মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জরুরি প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাচ্ছে।
প্রযুক্তির ঔৎকর্ষের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপব্যবহারের ঝুঁকি। এআইয়ের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক ‘ডিপফেক’। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যে কারো কণ্ঠস্বর বা চেহারা হুবহু নকল করে ভিডিও বা অডিও তৈরি করা সম্ভব। সা¤প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি, কিভাবে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সেলিব্রেটিদের নামে ভুয়া ভিডিও ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকলের পার্থক্য বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আগে ভুয়া খবর ছড়াতে অনেক পরিশ্রম করতে হতো; এখন এআই দিয়ে মুহূর্তে হাজারও ভুয়া প্রোফাইল থেকে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো যায়। এর ফলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। সামাজিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রচার বা স্পর্শকাতর ধর্মীয় বিষয়ে এআইয়ের অপব্যবহার ভয়াবহ হতে পারে।
আমরা যখন এআইভিত্তিক কোনো অ্যাপ বা সার্ভিস ব্যবহার করি, তখন অজান্তে নিজেদের অনেক ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে দিই। এ তথ্যগুলো এআই বিশ্লেষণ করে আমাদের আচরণ বা পছন্দ-অপছন্দ বুঝে ফেলে। এই ‘ডাটা মাইনিং’ প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের গোপনীয়তা বিঘিœত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ একজন তার বন্ধুকে কোনো একটি পণ্যের কথা বলছেন, একটু পরে ওই বন্ধুর ফেসবুক ফিডে সেই পণ্যের বিজ্ঞাপন চলে আসছে। এটি শুনতে সুবিধাজনক মনে হলেও, কারো ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা তথ্য যে নজরদারির মধ্যে আছে, এটি তার প্রমাণ।
এআই আমাদের কাজ যেমন গতিশীল করেছে, তেমনি দায়িত্বও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন শুধু তথ্য প্রচার করলে হয় না, সেই তথ্যটি যে আসল- তা প্রমাণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ। এআইয়ের কোনো নৈতিকতা বা আবেগ নেই। এটি অনেক সময় ভুল তথ্য বা হ্যালুসিনেশনের শিকার হয়। অর্থাৎ এআই অনেক সময় ভুল বা বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করে। এ ভুল তথ্য যদি কোনো সরকারি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার হয়ে যায়, তবে তার ফল হতে পারে বিপর্যয়কর।
এখন প্রশ্ন, এআইয়ের যুগে আমরা কি পুরোপুরি অনিরাপদ? উত্তর হ্যাঁ বা না, দুটোই হতে পারে। যদি আমরা সচেতন হই, তা হলে এআই সমস্যা নয়; বরং কাজ সহজ করার যুতসই টুল। কিন্তু অসচেতন হলে পদে পদে বিপত্তি ঘটাতে পারে, প্রযুক্তির যেমন নেতিবাচক দিক আছে, তেমনি একে মোকাবেলার উপায়ও আছে। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি বা ভিডিও শনাক্ত করতে এআইভিত্তিক ‘ডিটেক্টর’ তৈরি হচ্ছে। তা ছাড়া বিশ্বজুড়ে এআই ব্যবহারের নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে।
তথ্যের এই গোলকধাঁধায় নিজেকে নিরাপদ রাখতে আমাদের কিছু সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। কোনো চাঞ্চল্যকর খবর বা তথ্য দেখলেই তা সাথে সাথে বিশ্বাস করা যাবে না। দেখতে হবে, তথ্যটি কোনো স্বীকৃত সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল পেজ থেকে এসেছে কিনা। যদি কোনো ভিডিওতে কারো কথা বা চোখের পলক অস্বাভাবিক মনে হয়, তবে সেটি ডিপফেক হতে পারে। এ থেকে বাঁচতে সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ারে আরো সতর্ক হতে হবে। তাই টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন বা বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার করা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তি সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান রাখা এখন শৌখিনতা নয়, বরং বেঁচে থাকার প্রয়াস। এআই কী এবং কিভাবে কাজ করে তার সাধারণ ধারণা রাখা উচিত।
এআই বিশ্বকে আমাদের হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। কিন্তু এর অপব্যবহার থেকে বাঁচতে প্রয়োজন সচেতনতা। এআইয়ের যুগে আমরা তখনই নিরাপদ থাকব, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাথে মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি ও নৈতিকতার সঠিক সমন্বয় ঘটবে। মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি মানুষকে চালিত করবে না, মানুষই নিজের প্রয়োজনে প্রযুক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে।
লেখক : সহকারী পরিচালক (তথ্য ও প্রকাশনা), বুয়েট



