এম এ মাসুম
মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিকে আবারো অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথভাবে ইরানে সামরিক হামলা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের ফলে তেলসমৃদ্ধ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে রীতিমতো যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। কয়েক দিনের মধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলারে পৌঁছে গেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, সঙ্কট দীর্ঘ হলে তা ১৫০ ডলার পর্যন্তও উঠতে পারে।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত একটি সঙ্কীর্ণ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এটি পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সাথে যুক্ত করেছে এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যানুযায়ী প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক তেল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সাথে বিশ্বের মোট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই পথ দিয়ে যায়। ফলে এই পথ দীর্ঘ সময় বন্ধ হয়ে গেলে তা ইতিহাসের অন্যতম বড় জ্বালানি সঙ্কটে রূপ নিতে পারে।
বিশ্বে বর্তমানে তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল। এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে এক ধাক্কায় প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল জ্বালানির সরবরাহ কমে যাবে। তুলনামূলকভাবে ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ বা ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের সময় যে জ্বালানি সঙ্কট তৈরি হয়েছিল, তার পরিমাণ ছিল এর মাত্র এক-চতুর্থাংশ; অর্থাৎ সম্ভাব্য এ সঙ্কটের ব্যাপ্তি অতীতের যেকোনো বড় জ্বালানি ধাক্কার চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল ও এলএনজি আমদানি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য স্বাভাবিকভাবেই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ ও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর। ইতোমধ্যে দেশের বাজারে উদ্বেগের ছায়া দেখা দিয়েছে। যদিও সরকার জানিয়েছে, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে, তবুও ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে হিসাব করে এপ্রিল মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। জ্বালানির দাম আরো বাড়লে এই হার আবারো দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বেড়ে যাবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারেই চাপ সৃষ্টি করে না; এটি মুদ্রাবাজারেও প্রভাব ফেলে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানি ব্যয় আরো বেড়ে যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্কট ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ব্যাংকিং সূত্রে জানা গেছে, রেমিট্যান্স সংগ্রহ ও আমদানি পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের দাম বেড়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সম্প্রতি সর্বোচ্চ ১২২ টাকা ৯০ পয়সা দরে রেমিট্যান্স ডলার কিনছে। ফলে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তির বিনিময় হার প্রায় ১২৩ টাকায় পৌঁছেছে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেও আমদানির জন্য ডলারের দর ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৫০ পয়সা। অল্প সময়ের মধ্যে প্রতি ডলারে প্রায় ৫০ পয়সা বৃদ্ধিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আমদানিকারকদের মতে, ডলারের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব ভোক্তাপর্যায়ে গিয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ৩ মার্চ ডলারের গড় মূল্য ছিল ১২২ টাকা ৩৩ পয়সা, যা বেড়ে ১২২ টাকা ৫৮ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। বাজারে সরবরাহ সঙ্কুুচিত থাকলে এই দাম আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি— রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপরও ঝুঁকি তৈরি করেছে। বর্তমানে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে মিলিয়ে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত। দেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসে এই গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল-জিসিসিভুক্ত দেশগুলো থেকে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে আকাশপথে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় নতুন শ্রমিক পাঠানো ধীর হয়ে গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অনেক শ্রমিক বিদেশে যেতে পারছেন না এবং অনেক প্রবাসী কর্মীও কর্মস্থলে ফিরতে বিলম্বের সম্মুখীন হচ্ছেন। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঙ্ঘাত দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ধীরগতি আসতে পারে। এতে শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা প্রবাসী শ্রমিকদের আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে।
ইরান সঙ্কটের ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ায় শেয়ার ও বন্ড বিক্রির চাপ বেড়েছে। একই সাথে জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে ভোক্তা ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, যদি সঙ্ঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আবারো সুদের হার বাড়াতে হতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যে সুদ বৃদ্ধির নীতি নেয়া হয়েছিল, তা আবার ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সতর্ক ও বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ করা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণ, আমদানি ব্যবস্থাপনা এবং বাজার পর্যবেক্ষণ জোরদার করা জরুরি। একই সাথে জ্বালানির বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
ডলারের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ধাপে ধাপে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার দিকে এগোনোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কৃত্রিমসঙ্কট ঠেকাতে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা দরকার। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সামনে একাধিক ঝুঁকি তৈরি করেছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা।
এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা আরো সতর্ক ও সমন্বিত হওয়া জরুরি। সময়োপযোগী নীতি, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশল গ্রহণ করা গেলে সম্ভাব্য ধাক্কা অনেকটাই সামাল দেয়া সম্ভব হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্কট হয়তো সাময়িক; কিন্তু এর অর্থনৈতিক অভিঘাত হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি। তাই এখনই বিচক্ষণ ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাংলাদেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক



