বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত গত চার দশকে যে দুরবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে সেটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি থেকে উত্তরণে ব্যাংকিং খাত ছিল অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এই পথে ইসলামী ব্যাংকিং একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা সুদবিহীন এবং নৈতিক অর্থায়নের দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই ধারার অগ্রদূত ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-আইবিবিএল।
বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং খাত বর্তমানে প্রায় ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক পরিসরে বিস্তৃত এবং এটি ক্রমবর্ধমানভাবে মূলধারার অর্থনীতির অংশ হয়ে উঠছে। মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে এটি শুধু বিকল্প ব্যবস্থা নয়; বরং কেন্দ্রীয় আর্থিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এসব দেশে শক্তিশালী শরিয়াহ গভর্নেন্স, কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ সংস্কৃতি ইসলামী ব্যাংকিংকে স্থিতিশীলতা দিয়েছে। বাংলাদেশে আইবিবিএল এই বৈশ্বিক ধারার সাথে সংযুক্ত হয়ে একটি কার্যকর মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলামী ব্যাংকিং বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রতিষ্ঠার প্রারম্ভিক পর্যায়ে আইবিবিএল একটি অনন্য মালিকানা কাঠামো নিয়ে যাত্রা শুরু করে। বহুমাত্রিক এই মালিকানা কাঠামো ব্যাংকের ওপর আস্থা বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। লাভ-ক্ষতির অংশীদারত্বভিত্তিক বিনিয়োগ মডেল, কঠোর তদারকি ব্যবস্থা এবং নৈতিক ব্যাংকিং সংস্কৃতির কারণে ব্যাংকটি দ্রুত জনগণের আস্থা অর্জন করে। গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে, কারণ তারা এটিকে শুধু একটি ব্যাংক নয়; বরং একটি নৈতিক অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে দেখে।
নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়কালকে যথার্থভাবেই আইবিবিএলের ‘স্বর্ণযুগ’ বলা যায়। এই সময়ে ব্যাংকটি ধারাবাহিকভাবে আমানত সংগ্রহ, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং মুনাফা অর্জনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখায়। রেমিট্যান্স আহরণে নেতৃত্ব দিয়ে এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই সাথে কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রাখে। এই সময় ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন অত্যন্ত কম ছিল, যা এর কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি ব্যবস্থার প্রতিফলন।
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রেও আইবিবিএল একটি মানদণ্ড স্থাপন করে। দক্ষ, নৈতিক এবং পেশাদার ব্যাংকার তৈরির মাধ্যমে এটি পুরো ব্যাংকিং খাতে প্রভাব বিস্তার করে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও আইবিবিএলের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য ব্যাংকার ম্যাগাজিনের শীর্ষ এক হাজার ব্যাংকের তালিকায় একাধিকবার স্থান পাওয়া, গ্লোবাল ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যাওয়ার্ডস এবং কেমব্রিজ ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডভাইজরির মতো সংস্থার পুরস্কার ব্যাংকটির অনন্য অর্জন। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মূলধনের শক্তি এবং লাভজনকতায় দক্ষতার কারণে এটি ‘বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাংক’ হিসেবেও স্বীকৃতি লাভ করে। সব মিলিয়ে, ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়কালকে আইবিবিএলের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার যুগ বলা যায়।
তবে ২০১৭ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে। মালিকানা কাঠামোর পরিবর্তন এবং একটি কেন্দ্রীভূত গোষ্ঠীর প্রভাব বৃদ্ধি ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। অভিযোগ রয়েছে, একাধিক বেনামি বা তথাকথিত ‘শেল কোম্পানি’ ব্যবহার করে ব্যাংকের শেয়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা হয়, যা প্রকৃত মালিকানা গোপন রাখার একটি কৌশল। আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রে এ ধরনের কৌশলকে ‘লেয়ারিং’ বলা হয়, যা মানি লন্ডারিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
এই পরিবর্তনের ফলে শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় বড় রদবদল ঘটে। অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যাংকারদের অনেককেই সরিয়ে দেয়া বা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা ও অভিজ্ঞতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সাথে নিয়োগনীতিতে পরিবর্তন এনে দ্রুত সম্প্রসারণভিত্তিক নিয়োগ বাড়ানো হয়, যা ব্যয় বাড়ায়।
এই সময় ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং ঋণের গুণগত মান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। কিছু বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, স্বনামে-বেনামে ঋণ গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ ব্যাংকের ঝুঁকি প্রোফাইল দুর্বল করেছে। কিছু ক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে ঝুঁকি আংশিকভাবে আড়াল করা হয়। একই সাথে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং কাঠামোতেও চাপ সৃষ্টি হয়।
এসব পরিবর্তনের প্রভাবে ব্যাংকের ওপর আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমানত প্রবাহে ধীরগতি দেখা যায়, প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসে এবং সম্পদমান নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ফলে ব্যাংকটির ‘ইসলামিক আইডেন্টিটি’ বা নৈতিক ভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মত দিয়েছেন।
এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল গভর্নেন্স রিস্কবোর্ড গঠন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা। ফলে ২০২৪ সালের আগ পর্যন্ত ব্যাংকটি একটি ‘ট্রানজিশনাল রিস্ক ফেজ’-এ অবস্থান করে, যেখানে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি থাকা সত্ত্বেও আস্থা, শাসন কাঠামো এবং সম্পদমানের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ বজায় ছিল। একসময়কার শক্তিশালী ও আস্থাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, অনিয়ম, ঋণখেলাপি বৃদ্ধি এবং নীতিগত বিচ্যুতির কারণে আর্থিক চাপে পড়ে।
শেল কোম্পানির মাধ্যমে শেয়ার অধিগ্রহণের বিষয়টি এই সঙ্কট আরো জটিল করে তোলে। এসব কোম্পানির অধিকাংশের বাস্তব কোনো ব্যবসায়িক কার্যক্রম ছিল না এবং তাদের মূলধনও ছিল সীমিত। তবুও তারা বিপুল শেয়ার ক্রয় করতে সক্ষম হয়, যা অর্থের উৎস এবং প্রকৃত মালিকানা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে একটি ব্যাংকের ৫ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, একাধিক বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়, যা আইনি কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ব্যাংকটি থেকে স্বনামে ও বেনামে জামানতবিহীন ঋণ গ্রহণ করে এবং সেই তথ্য গোপন রেখে অর্থ পাচারের ফলে ঋণগুলো নন-পারফর্মিং হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আমানত বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ফ্যাক্টরে ঘুরে দাঁড়ালেও প্রভিশন সংরক্ষণের বিধির কারণে ব্যাংকটি পরপর দু’বার ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে আসে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসেÑ যদি অতীতে শেল কোম্পানির মাধ্যমে অর্জিত মালিকানা বৈধতা পায়, তবে তা কি ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মকে উৎসাহিত করবে না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে স্পষ্ট হয়, শুধু আইনি কাঠামো থাকা যথেষ্ট নয়; বরং এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ জরুরি। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মতো সংস্থার কার্যকর ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০১৭ সালের পরবর্তী সময়ে বিদেশী শেয়ারহোল্ডারদের প্রস্থান ব্যাংকের আন্তর্জাতিক সংযোগ ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলে। আইডিবি, কুয়েত ফাইন্যান্স হাউজ এবং অন্যান্য অংশীদার তাদের শেয়ার বিক্রি করে চলে যায়। ব্যাংকটি একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে।
২০২৪ সালের পরবর্তী সময় আইবিবিএলের জন্য একটি পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার পর্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সময়ে পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং অভ্যন্তরীণ অডিট শক্তিশালী করার মাধ্যমে ব্যাংকটিকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। গ্রাহক আস্থা পুনরুদ্ধারে আমানত ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা হয়েছে এবং ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এই পর্যায়টি দ্রুত উন্নতির নয়; বরং একটি শক্ত ভিত্তি পুনর্গঠনের সময়।
ইসলামী ব্যাংককে আগের গৌরব ফিরে পেতে হলে আংশিক সংস্কার নয়; বরং একটি গভীর, কাঠামোগত এবং আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অপরিহার্য। সর্বাগ্রে করপোরেট গভর্নেন্সকে শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে, যাতে ব্যাংকের পরিচালনা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক, গোষ্ঠীগত বা প্রভাবশালী স্বার্থের বাইরে থাকে। বোর্ড ও ব্যবস্থাপনায় পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে এবং মালিকানা কাঠামো পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রকৃত ও বৈধ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একক গোষ্ঠীর হাতে শেয়ার কেন্দ্রীভূত হওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে। এত চ্যালেঞ্জের পরও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ালেও বর্তমান নির্বাচিত সরকার ব্যাংক বিধিতে ১৮ নম্বর ধারায় একটি উপবিধি সংযুক্ত করে ব্যাংকে অতীতের বিতাড়িত লুটেরাদের মালিকানা ফিরে পাওয়ার বিধান রেখে আইন পাস করে। এতে ব্যাংক এবং গ্রাহকদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হয়। ব্যাংকের সঞ্চিতির ওপর চাপ পড়তে যাচ্ছে।
একসময়ের বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ এই ব্যাংককে লুটেরাদের প্রভাবমুক্ত রাখতে রাষ্ট্র, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংকার, গ্রাহক এবং দেশের জনগণের সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে। সরকারের করণীয় হলো, আইনের শাসন নিশ্চিত করা, অতীতে যেসব বিতর্কিত মালিকানা পরিবর্তন বা প্রভাব বিস্তার হয়েছে, সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ভবিষ্যতে যেন কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। একই সাথে একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে বোর্ড ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা, নৈতিকতা এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে এই প্রতিষ্ঠানটি আবারো দেশের ব্যাংকিং খাতে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে। কারণ, একটি ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি তার মূলধনে নয়; বরং জনগণের আস্থা, আইনের শাসন এবং সুশাসনের ওপরই নির্ভরশীল। হ
লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট



