আমিরাতকে থামাবে কে

যদি ইসরাইল তার ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে গাজার আরো অঞ্চল দখল করতে এবং আরব স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটি শুধু ফিলিস্তিনের জন্য নয়; বরং গোটা আরব বিশ্বের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। সামনের দিনগুলোতে সুদানের ওপরও ঘনিষ্ঠ নজর রাখতে হবে। সেখানে মানবিক সঙ্কট ভয়াবহ। আরব সরকারগুলো আরএসএফের বিরুদ্ধে সুদানের সেনাবাহিনীকে কত দিন রক্ষা করার অনুমতি দেবে, যা একচেটিয়াভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বারা সমর্থিত? আরব রাষ্ট্রগুলো আরব আমিরাতের লাগাম টানার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না কেন

গাজা থেকে সুদান এবং তার বাইরেও তেলআবিব ও আবুধাবি তাদের নিজেদের স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত করার জন্য ব্যাপক প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। দু’টি রাষ্ট্র ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মতৎপরতার কারণে গত বছরটি ছিল আধুনিক আরব ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির ও সহিংস বছরগুলোর একটি।

গাজায় ইসরাইলি সম্প্রসারণবাদী আগ্রাসন ও নৃশংস যুদ্ধ আরব রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ইতোমধ্যে সুদানে র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের অব্যাহত সমর্থন এবং ইয়েমেন, লিবিয়া, সোমালিয়া ও অন্যান্য স্থানে তার নীতিকে বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা আরো বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয় দেশই অন্যান্য রাষ্ট্রকে বিভক্ত ও দুর্বল করার মাধ্যমে তাদের নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাবের বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা করে আসছিল।

২০২৫ সালে ইসরাইলি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় আরব দেশগুলোকে হয় আক্রমণ হজম করতে শান্তির জন্য মধ্যস্থতা করতে, অথবা ভূরাজনৈতিক জোট পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই দু’টি দেশকে কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যেতে পারে, তা ২০২৬ সালে আরব অঞ্চলের ভবিষ্যৎ গুরুতর প্রভাব ফেলবে। বছরের পর বছর ধরে সংযুক্ত আরব আমিরাত আরব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রতি সমর্থন দিয়ে তার ক্ষমতার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করার জন্য কাজ করে আসছে।

সুদান, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সোমালিয়ায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, এ কৌশলটি বেশ কয়েকটি আরব দেশকে আরো বিভক্ত এবং দুর্বল করে তুলেছে, যার ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

২০২৫ সালজুড়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত সুদানে আরএসএফকে অস্ত্র দেয়া অব্যাহত রেখেছে। এমনকি এই আধাসামরিক গোষ্ঠীটি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নৃশংসতা চালিয়েছে– সেটিকে গণহত্যা বললেও অতিরঞ্জিত হবে না। আরএসএফের অধীনে সুদানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সামরিক ঘাঁটিও রয়েছে। ইয়েমেনে, সংযুক্ত আরব আমিরাত সাউদার্ন ট্রানজিশনার কাউন্সিলকে (এসটিসি) সমর্থন করে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীটি ইয়েমেনকে বিভক্ত করতে এবং ইসরাইলের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়। এসটিসি কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেনকে বিভক্ত করে স্বাধীনতা ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে থাকতে পারে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত লিবিয়ার কমান্ডার খলিফা হাফতারকেও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে যে, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষে আরএসএফকে জ্বালানি সরবরাহ করছেন। ত্রিপোলিতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক স্বীকৃত লিবিয়ান সরকারের বিরুদ্ধে হাফতারের সংগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে মূলত আমিরাতের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। সোমালিয়ার মোগাদিসুভিত্তিক সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সোমালিল্যান্ড ও পুন্টল্যান্ডকেও আবুধাবি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করে।

সুদান, ইয়েমেন ও সোমালিয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলের ফলে এ অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে। সুদানে তার ঘাঁটির পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরে গুরুত্বপূর্ণ নতুন সামরিক ঘাঁটি সংযুক্ত আরব আমিরাত আরব অঞ্চলের অত্যন্ত নিপীড়ন স্বৈরশাসক মিসরের আবদুল ফাত্তাহ আল সিসিকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।

সিরিয়ার জন্য ইসরাইলের পরিকল্পনা খুবই স্পষ্ট। তার লক্ষ্য হলো এটিকে একাধিক রাষ্ট্র বিভক্ত করা, আরো দুর্বল ও অস্থিতিশীল করা এবং ইসরাইলি সম্প্রসারণের জন্য এ অঞ্চলকে ব্যবহার করা।

ইসরাইলের বিভক্ত করো এবং জয় করো নীতি– যা গ্রেটার ইসরাইলের ভিশন দ্বারা পরিচালিত। ইহুদিবাদীদের ধারণা, ইউফ্রেটিস ও নীল নদীর মধ্যবর্তী বিশাল এলাকা ঈশ্বর ইসরাইলকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাই ইসরাইল ওই বিশাল অঞ্চলটি দখল করার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে আরো আক্রমণাত্মক ও সহিংস।

এই লক্ষ্য ইসরাইলি রাজনীতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। কিন্তু অতীতে এটি খুব বেশি প্রকাশিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার জন্য তার ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক মিশনের কথা স্বীকার করেছেন। এ লক্ষ্যে ইসরাইল দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে, গাজায় ইসরাইলের লক্ষ্য হলো– ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা এবং যতটা সম্ভব তাদের জায়গাজমি দখল করে নেয়া।

ইসরাইলি সেনাবাহিনী প্রধান সম্প্রতি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় প্রত্যাহার বিন্দু, হলুদ লাইন, একটি নতুন ইসরাইলি সীমানা গঠন করবে। ইসরাইল অধিকৃত পশ্চিমতীরে ও একই নীতি অনুসরণ করছে। সেখানে ২০২৫ সালে জমি বাজেয়াপ্ত, বাড়িঘর ধ্বংস করা এবং অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত করা হয়েছে। সেখানে একটি বিশাল নতুন বসতি স্থাপন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পশ্চিমতীরকে দু’ভাগে বিভক্ত করা হবে। এ ছাড়াও ইসরাইলের অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী পাঁচ বছরে বসতি স্থাপন সম্প্রসারণের জন্য ৮৪০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। ফিলিস্তিনিদের দেশ থেকে মুছে ফেলার প্রচেষ্টা আগে কখনো এত খোলামেলা ও স্পষ্ট ছিল না।

বৃহত্তর ইসরাইল প্রতিষ্ঠার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিল রেখে ইসরাইল লেবানন ও সিরিয়ার বেশ কিছু অংশও অবৈধভাবে দখল করেছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী ২০২৫ সালে লেবানন ভূখণ্ডে কয়েক শ’ বার হামলা চালিয়েছে। হিজবুল্লাহর সাথে ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করা সত্ত্বেও ইসরাইল এ হামলা অব্যাহত রাখে।

সিরিয়ায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে স্বৈরশাসক বাশার আল আসাদের পতনের ফলে দেশটিতে স্বৈরশাসন-পরবর্তী যুগের সূচনা হয়। প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল শাবার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী প্রশাসন শুরু থেকেই ইসরাইলের সাথে সঙ্ঘাত চায় না বলে ইঙ্গিত দিয়েছিল। কিন্তু শাবাব শান্তিপূর্ণ অবস্থান সত্ত্বেও ইসরাইল সিরিয়ার ভূখণ্ডে বিনা উসকানিতে শত শত আক্রমণ চালায়। সিরিয়ার ব্যাপারে ইসরাইলের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা হচ্ছে একাধিক হামলার মাধ্যমে দেশটিকে দুর্বল ও বিভক্ত করা এবং অঞ্চলটিকে ইসরাইলি সম্প্রসারণের জন্য ব্যবহার করা।

ইসরাইল ২০২৫ সালে আরো তিনটি আরব দেশে আক্রমণ শুরু করে– ইয়েমেন, তিউনিসিয়া ও কাতার। আরব রাষ্ট্রগুলোর ওপর এসব আক্রমণ জুন মাসে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল-মার্কিন যৌথ সামরিক অভিযানের সময় হয়েছিল।

২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ইসরাইল একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। তার পর থেকে তারা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো গভীর করেছে এবং ক্রিস্টালবল গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি প্ল্যাটফর্ম ও ইয়েমেন নীতিসহ একাধিক রাজনৈতিক ফ্রন্টে ঘনিষ্ঠভাবে সমন্বয় করেছে। ইসরাইল ও ইউএই সুদান ও সোমালিল্যান্ডের ব্যাপারেও ঐক্যবদ্ধ। কিছু উত্তেজনা সত্ত্বেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরাইল ও ইউএই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ যখন ট্রাম্প গত জানুয়ারিতে গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার প্রস্তাব দিয়েছলেন, যার মধ্যে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে বহিষ্কার করার বিষয় ছিল, তখন ইউএই এ ধারণার প্রতি সমর্থন করার ইঙ্গিত দিয়ে আরবদের সারি থেকে সরে গিয়েছিল। তার পর মার্চ মাসে যখন আরব লিগ গাজার জন্য নিজস্ব পরিকল্পনার প্রস্তাব করেছিল, তখন আরব আমিরাত ট্রাম্প প্রশাসনকে এটি প্রত্যাখ্যান করার জন্য তদবির করেছিল বলে জানা গেছে।

বৃহত্তর আরব বিশ্বে বেশ কিছু সঙ্কট ও দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত রয়েছে। তবে গাজা ও সুদানের ফলাফল এ অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হতে পারে। গাজায় ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনার বাকি ধাপগুলো কিভাবে এগোবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আরব আমিরাত বাদে আরব রাষ্ট্রগুলো সম্ভবত চায় যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে গাজা ও পশ্চিমতীরে একটি কার্যকর ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য একটি কূটনৈতিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করবে। কিন্তু ইসরাইলি একগুঁয়েমি ও তেলআবিবের বৃহত্তর ইসরাইলের উচ্চাকাক্সক্ষার প্রতি ট্রাম্পের স্পষ্ট সম্মতির কারণে এটি মনে হয় স্বপ্নই থেকে যাবে।

আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলি অপরাধ ও ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক আরো স্বাভাবিক করার বিরুদ্ধে আরব জনমত সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত। সৌদি আরব, মিসর ও কাতারের মার্কিন প্রশাসনের ওপর প্রভাব রয়েছে। তারা কতটা তা প্রয়োগ করতে ইচ্ছুক তা ২০০৬ সালে গাজায় কী ঘটবে, তা নির্ধারণ করতে পারে।

যদি ইসরাইল তার ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে গাজার আরো অঞ্চল দখল করতে এবং আরব স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়, তাহলে সেটি শুধু ফিলিস্তিনের জন্য নয়; বরং গোটা আরব বিশ্বের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। সামনের দিনগুলোতে সুদানের ওপরও ঘনিষ্ঠ নজর রাখতে হবে। সেখানে মানবিক সঙ্কট ভয়াবহ। আরব সরকারগুলো আরএসএফের বিরুদ্ধে সুদানের সেনাবাহিনীকে কত দিন রক্ষা করার অনুমতি দেবে যা– একচেটিয়াভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্বারা সমর্থিত? আরব রাষ্ট্রগুলো আরব আমিরাতের লাগাম টানার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না কেন?

লেখক : যুগ্ম বার্তা সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত