সাঈদ বারী
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২৬ মার্চ একটি অনিবার্য আলোকবর্তিকা। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, একটি জাতির আত্মপ্রকাশের মুহূর্ত, একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংগ্রাম, বঞ্চনা ও আত্মত্যাগের চূড়ান্ত উচ্চারণ। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষাকে রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় রূপ দেয়। সেই ঘোষণার পেছনে ছিল রক্তাক্ত প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক প্রতারণা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক নিপীড়নের দীর্ঘ ইতিহাস।
স্বাধীনতার ঘোষণা কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ববাংলার মানুষের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ ক্রমেই স্পষ্ট হতে থাকে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ছয় দফা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান— প্রতিটি পর্যায়েই বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াই তীব্রতর হয়েছে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি এবং ষড়যন্ত্র পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তোলে।
এরই পরিণতিতে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়, যা ইতিহাসে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে কুখ্যাত। সেই অমানবিক আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতেই স্বাধীনতার ঘোষণা উচ্চারিত হয়, যা বাঙালিকে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অনুপ্রেরণা দেয়।
পরবর্তীকালে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। এই সংগ্রামে লাখো শহীদের আত্মত্যাগ এবং অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও বেদনা জড়িয়ে আছে। গ্রাম থেকে শহর, ছাত্র থেকে কৃষক, নারী থেকে শ্রমিক— সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের মানুষ এই যুদ্ধে অংশ নেয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক সমর্থন, প্রতিবেশীসহ বিভিন্ন দেশের সহায়তা এবং প্রবাসী বাঙালিদের প্রচেষ্টা এই সংগ্রামকে আরো শক্তিশালী করে তোলে।
স্বাধীনতা অর্জনের অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি সময় পর আমরা যখন ২৬ মার্চ উদযাপন করি, তখন তা কেবল অতীত স্মরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং এটি আমাদের সামনে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও তুলে ধরে। স্বাধীনতা মানে শুধু ভৌগোলিক সীমানা অর্জন নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক সমতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের এক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি— সব মিলিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আয় বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহনশীলতার অভাব এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন আমাদের সামনে বারবার ফিরে আসে। স্বাধীনতার চেতনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই। উন্নয়নের সুফল যেন সমাজের সব স্তরে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
গণতন্ত্রের চর্চা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা স্বাধীনতার অন্যতম পূর্বশর্ত। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার, আইনের শাসন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সাথে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন অপরিহার্য। স্বাধীনতার যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এ ছাড়া সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাও স্বাধীনতার একটি মৌলিক দাবি। এখনো সমাজের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। শিক্ষার সুযোগে বৈষম্য, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। একটি সত্যিকার স্বাধীন রাষ্ট্রে এই বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। গ্রাম ও শহরের উন্নয়নের ব্যবধান কমানোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তরুণ প্রজন্মের কাছে ২৬ মার্চের গুরুত্ব আরো গভীরভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে ইতিহাসের প্রতি আগ্রহ কিছুটা কমে যাচ্ছে। কিন্তু একটি জাতির আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে তার ইতিহাসের ওপর ভিত্তি করে। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, শহীদদের ত্যাগ এবং স্বাধীনতার চেতনা নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেয়া জরুরি। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং গণমাধ্যম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পরিবার থেকেও ইতিহাসচর্চার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
বিশ্বায়নের এই যুগে জাতীয় পরিচয় ও মূল্যবোধ ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার চেতনা আমাদের সেই পরিচয়ের মূল ভিত্তি। এই চেতনা আমাদের শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবস্থান নিতে। ২৬ মার্চ সেই শিক্ষারই প্রতীক।
স্বাধীনতা অর্জন একটি জাতির জন্য যত বড় সাফল্য, তা রক্ষা করা ততটাই কঠিন। ইতিহাস সাক্ষী, অনেক দেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর নানা সঙ্কটে পতিত হয়েছে। তাই স্বাধীনতার অর্জনকে টেকসই করতে হলে আমাদের সচেতন থাকতে হবে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে লালন করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।
২৬ মার্চ আমাদের শুধু অতীতের গৌরবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না; বরং আমাদের ভবিষ্যতের পথও নির্দেশ করে। এই দিনে আমরা নতুন করে শপথ নিতে পারি— স্বাধীনতার চেতনা ধারণ করে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ এবং মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার। সেই বাংলাদেশ হবে শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি মানুষ মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে। এই শপথের বাস্তবায়নই হোক ২৬ মার্চের সবচেয়ে বড় অর্জন।
লেখক : প্রকাশক ও কলাম লেখক



