সেক্যুলার মিডিয়ার কাছাখোলা নীতি

বাংলাদেশ যদি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে থাকতে চায়, তাহলে ঢাকার রক্ষাকবচ অবশ্যই হতে হবে ইসলাম। ইসলাম হচ্ছে এদেশের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার। ইসলামী জীবনাদর্শ বাদ দেয়ার অর্থ- বাংলাদেশের সর্বভারতীয় সংস্কৃতিতে লীন হয়ে যাওয়া। এর সহজ অর্থ, একত্ববাদী সংস্কৃতির পরিবর্তে পৌত্তলিক সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়ার নামান্তর। এক্ষেত্রে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান মানে ভারতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসার সচেতন পদক্ষেপ

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি তকমা দিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়। বিচারিক ও বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম-খুনের নির্বিচার শিকার হন দলটির নেতাকর্মীরা। এর জন্য অনেকাংশে দায়ী এ দেশের সেক্যুলারপন্থী মিডিয়া।

শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ করা হয়। ফলে যে কাউকে জামায়াত-শিবির ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা তখন কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য করেনি শাসক শ্রেণী। জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের হত্যার বৈধতা উৎপাদনে এ দেশের সেক্যুলার মিডিয়া শেখ হাসিনার সরকারের সাথে গলাগলি ধরে চলার নীতি নিয়েছিল। সে সময় তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) রায় ঘিরে শাহবাগে মিডিয়ার সেক্যুলার অংশটি (পড়তে হবে প্রায় সব সংবাদমাধ্যম) ঠাণ্ডা মাথায় ‘মব’ তৈরিতে ইন্ধন জোগায়। মিডিয়ার সহযোগিতায় শেখ হাসিনা ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশ থেকে ইসলামী ভাবধারার রাজনীতি সমূলে উৎপাটনে কাছাখোলা নীতি গ্রহণ করেন। সেই আলোকে সারা দেশে ইসলামপন্থীদের নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার হরণ করে ফ্যাসিবাদী সরকার। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর এই ‘ভুয়া গ্লানি’ বয়ে বেড়াতে হয় জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির নেতাকর্মীসহ বিশ্বাসী ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীকে।

চব্বিশের বর্ষা বিপ্লবের পর এ দেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী সবাই মনে করেছিলেন, বাংলাদেশে ট্যাগিং বা ফ্রেমিংয়ের রাজনীতির অবসান ঘটবে। স্বাধীনতার পক্ষ কিংবা বিপক্ষের কৃত্রিম বিভাজনের রাজনীতি বলে কিছু থাকবে না। এ কথা সত্যি যে, দেশের সাধারণ দেশপ্রেমিক নাগরিকরা এখন এই কৃত্রিম দেয়াল অতিক্রম করে নতুন সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দোবস্তের দিকে ধাবমান। কিন্তু এলিট শ্রেণী তাদের পুরনো মনোজাগতিক অবস্থা থেকে এখনো বেরিয়ে আসতে পারেনি। তারা সেই বিভেদের দেয়াল অটুট রেখে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বজায় রেখে নিজেদের শক্তিমত্তা জারি রাখার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সেই অপচেষ্টার প্রতিফলন এখনো আমরা দেখতে পাই সেক্যুলার মিডিয়ায় জামায়াতের অগ্রযাত্রা রুখতে নেয়া কূটকৌশলে। পুরনো বয়ানে জামায়াত বধের নীতিতে তারা এখনো বদ্ধপরিকর।

উদাহরণ হিসেবে আমরা এখানে সেক্যুলার মিডিয়ার নেতৃস্থানীয় একটি পত্রিকার দু’টি উপসম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনার প্রয়াস চালাব। আমাদের লেখায় উপসম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ, যেকোনো পত্রিকার উপসম্পাদকীয় যদি ওই পত্রিকার দায়িত্বশীল পদে আসীন কেউ লিখেন, তাহলে অনায়াসে ধরে নেয়া যায়, তিনি পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতি যথাযথ অনুসরণ করেছেন।

চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে যেহেতু ইসলামপন্থী মানে, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নিয়েছেন। সেহেতু শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের মানুষের কাছে জামায়াত-শিবিরের গ্রহণযোগ্যতা বা কদর আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন বেশি। যে বার্তা আমরা দেশের পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের বিজয়ে ইতোমধ্যে পেয়ে গেছি। কিন্তু জামায়াতের এ উত্থান এলিট শ্রেণীর চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে। যার কারণে এখন সর্বশক্তি দিয়ে এই রাজনৈতিক দলের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী। এ জন্য ঢাকার কাওরানবাজার থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী দৈনিক প্রথম আলোর দু’টি উপসম্পাদকীয়তে জামায়াতের বিরুদ্ধে সেই পুরনো বয়ান উপস্থাপন করা হয়েছে। এর একটি লিখেছেন পত্রিকাটির সম্পাদকীয় সহকারী মনোজ দে। সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে পত্রিকাটিতে ‘মুক্তিযুদ্ধ : ইতিহাসের মনগড়া ভাষ্য তৈরিতে বিজেপির পথে জামায়াত’ শিরোনামে এক জায়গায় লিখেছেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে জামায়াত জড়িত থাকার বিষয়টি ১৯৭১ সালে ঢাকার মার্কিন কনসাল হার্বাট ডি স্পিভাকের গোপন তারবার্তা থেকেও জানা যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে পাঠানো এক তারবার্তায় স্পিভাক লিখেছেন, নিহত বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা কত তা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে; কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, এটি জামায়াতের থাগস’রা (দুর্বৃত্তরা) ঘটিয়েছে।’ (সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫, প্রথম আলো)

উদ্ধৃতিটি মনোজ দে প্রথম আলোর মাসিক প্রকাশনা ‘প্রতিচিন্তা’র ৮ মে ২০১৭ সালে প্রকাশিত মিজানুর রহমান খানের ‘মার্কিন দলিলপত্রের সাক্ষ্য; কেন বুদ্ধিজীবী হত্যা? কিভাবে জামায়াত-জড়িত?’ নিবন্ধ থেকে নিয়েছেন। লক্ষ করার বিষয়, এখানে মার্কিন তারবার্তায় ‘বিশ্বাস’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তথ্য-প্রমাণ আর বিশ্বাসের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত, তা হয়তো মিজানুর রহমান খান ভুলে গিয়েছিলেন; আর জামায়াতকে কুপোকাত করতে নিজের যুক্তির জন্য সহায়ক হওয়ায় মনোজ দে ‘দুর্বল’ জেনেও সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

দ্বিতীয় যে কলাম থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি সেটির লেখক পত্রিকাটির উপসম্পাদক এ কে এম জাকারিয়া। সন্দেহ নেই, সা¤প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের হাতেগোনা যে কয়জন কলামিস্ট সুখপাঠ্য কলাম লেখেন; তাদের মধ্যে এ কে এম জাকারিয়া অন্যতম। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তার লেখা এই নিবন্ধকারও মনোযোগসহকারে পড়ে থাকেন। সেই এ কে এম জাকারিয়া ‘নির্বাচন : মধ্য ও ডানপন্থার ভোটের লড়াই’ শিরোনামে কলামে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি হিসেবে বিবেচিত জামায়াত তার রাজনৈতিক পথচলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, দুই দলের সাথে মিলেমিশেই এগিয়েছে, আন্দোলন করেছে। বিএনপির সাথে জোট করে সরকারের অংশীদারও হয়েছে। তবে জামায়াত তার রাজনৈতিক ইতিহাসে এখন সবচেয়ে ভালো সময় পার করছে। একাত্তরের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান ও অপকর্মকে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দিয়ে ঢেকে ফেলার চেষ্টায় তারা অনেকটাই সফল হয়েছে। জামায়াতের নির্বাচনী জোটে এনসিপিকে যুক্ত করতে পারা সেই সাফল্যে নতুন পালক হিসেবেই বিবেচিত হবে।’ (বুধবার, ৭ জানুয়ারি ২০২৬, প্রথম আলো)

উপরোল্লিখিত দু’টি উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতি আর যাই হোক, জামায়াতের প্রতি বস্তুনিষ্ঠ নয়। পত্রিকাটি জামায়াতের প্রতি অতিশয় বিরূপ। তাই দেখা যাচ্ছে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের বিরুদ্ধে সেই পুরনো বয়ান ক‚টকৌশলে হাজির করেছে। অথচ জামায়াত যে একাত্তরে রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন করতে পারেনি, তা দলটি বারবার বলে আসছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে পক্ষাবলম্বন না করার বিষয়ে দলটির স্বীকারোক্তি এই রকম, জামায়াত দলগতভাবে আশঙ্কা করেছিল যে ভারতের সহায়তায় দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ দিল্লির প্রভাববলয়ে গিয়ে স্বকীয়তা টিকিয়ে রাখতে পারবে না। একাত্তরে জামায়াত নেতারা যে আশঙ্কা করেছিলেন, আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ৫৪ বছরে তা কতটুকু বাস্তবতা বা দূরদৃষ্টির পরিচয়বাহী, তা দেশবাসী সবাই প্রত্যক্ষ করেছেন। এ কথা এখন অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, স্বাধীনতা-উত্তর শেখ মুজিবের শাসনামল ও তার মেয়ে শেখ হাসিনার দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী জমানায় দেশ যে স্বকীয়তা হারিয়ে দিল্লির উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।

কবুল না করে কোনো উপায় নেই, বাংলাদেশ যদি দক্ষিণ এশিয়ায় নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখে মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে মাথা উঁচু করে থাকতে চায়, তাহলে ঢাকার রক্ষাকবচ অবশ্যই হতে হবে ইসলাম। ইসলাম হচ্ছে এদেশের নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার। ইসলামী জীবনাদর্শ বাদ দেয়ার অর্থ- বাংলাদেশের সর্বভারতীয় সংস্কৃতিতে লীন হয়ে যাওয়া। এর সহজ অর্থ, একত্ববাদী সংস্কৃতির পরিবর্তে পৌত্তলিক সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়ার নামান্তর। এক্ষেত্রে ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থান মানে ভারতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে বাংলাদেশের বেরিয়ে আসার সচেতন পদক্ষেপ। আর এ দেশে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী জামায়াত যেহেতু ইসলামপন্থীদের নেতৃত্ব দিচ্ছে, সেহেতু সেক্যুলারদের প্রধান নিশানা এখন জামায়াত। এ জন্য পুরনো কায়দায় জামায়াতকে ঘায়েল করতে সেক্যুলারপন্থী মিডিয়া তৎপর হয়ে উঠেছে। বর্ষা বিপ্লবের পর কিছু দিন নিশ্চুপ থাকার পর মিডিয়ার এই অংশটি আবার সরব হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, জামায়াতের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের চিহ্নিত অংশটির নেতিবাচক আক্রমণের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হবে এটি নিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে ইসলামপন্থীরা কতটুকু সচেতন বলা মুশকিল; সেই সাথে প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে আশার কথা, দেশের জনগণ এখন আর পুরনো বিভেদ সৃষ্টিকারী বয়ান আমলে নিচ্ছেন না। তাই ফ্যাসিবাদমুক্ত পরিবেশে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায় আসার ব্যাপারে অনেকেই আশাবাদী। যদি ক্ষমতায় নাও আসতে পারে, তাহলেও সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আবিভর্‚ত হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।

লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]