রাজস্ব আহরণ অবকাঠামোর ধারণাগত সীমাবদ্ধতা

১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হলেও মানসিকতায় সবকিছু ব্রিটিশ রয়ে যায়। কর আদায়ে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। কর রাজস্ব আদায়কারীকে বেতনভুক সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। মূলত তখন থেকে রাজস্ব আইনের প্রয়োগে, ব্যাখ্যায় আরো জটিলতা দেখা দেয়। তাতে সহায়তার জন্য বিশেষ প্রফেশনাল গ্রুপও গড়ে ওঠে। ভিন্ন ব্যাখ্যার বাতাবরণে ‘আন্ডার হ্যান্ড’ লেনদেন শুরু হয়। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে অনলাইনিকরণ তথা আইনের পদ্ধতি প্রক্রিয়া সংস্কার আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর বাস্তবায়ন করদাতা ও রাজস্ব বিভাগ উভয় পক্ষের স্বার্থে সত্বর হওয়া বাঞ্ছনীয়

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর একটি জনস্বার্থ সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের ওপর দেশের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব অর্পিত। বাজেট অর্থায়নে বেশির ভাগ টাকার জোগান দেয় এনবিআর। একই সাথে শুল্ক ও কর কাঠামো কী হবে, বিনিয়োগ কেমন হবে, পণ্যমূল্য স্থিতিশীল থাকবে কি থাকবে না— এসব বিষয় এনবিআরের নীতি ও কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

এনবিআরের উদ্দেশ্য মূলত চারটি, যাকে বলা হয় চারটি আর (রেভিনিউ, রি-প্রাইসিং, রি-ডিস্ট্রিবিউশন, অ্যান্ড রি-প্রেজেনটেশন)। প্রথমত, রাজস্ব আদায় করা। কেননা, অভ্যন্তরীণ সম্পদের ওপর দেশের উন্নয়ন ও বাজেট বাস্তবায়ন নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত, রি-প্রাইসিং বা দর পুনঃনির্ধারণ। কেননা, পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ক-কর যে হারে আরোপ করা হয়, তার ওপর ভিত্তি করে পণ্যের দাম ওঠানামা করে। যেমন— সিগারেটের ওপর বেশি শুল্ক-কর ধার্য করলে দাম বাড়বে। ভোজ্যতেল আমদানির ওপর মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট কমালে দাম কমবে। তৃতীয়ত, রি-ডিস্ট্রিবিউশন অব ওয়েলথ বা সম্পদের পুনর্বণ্টন। এনবিআর রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বিরাজমান সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য কমায়। আয়কর আদায়ের মাধ্যমে অর্থনীতিতে বৈষম্য কমানো হয়। বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে কর অন্যতম পদ্ধতি। ফলে সম্পদের সমতা নিশ্চিত হয়। সহজ ভাষায় বললে, ধনীর কাছ থেকে কর নিয়ে গরিবকে দেয়া হয়। যার আয় বেশি, তার কর বেশি— এমন অনুপাতে কর আদায় করা হয়। এভাবে সমতা বিধান করা হয়। চতুর্থত, রি-প্রেজেনটেশন বা প্রতিনিধিত্ব। অর্থাৎ— যারা কর দেন রাষ্ট্রের সাথে তাদের একধরনের মালিকানা গড়ে ওঠে। যে ব্যক্তি কর দেন না, তার মালিকানা থাকে না। আবার এনবিআরই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যার নীতিগুলো জাতীয় সংসদ পাস করে। সংসদের অনুমোদন ছাড়া সরকার কোনো ধরনের কর আরোপ বা কর বাড়াতে পারে না। দেশের সংবিধানে সংসদকে একমাত্র কর আরোপের অধিকার বা ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। সুতরাং সংসদে কর নীতি ও করের হার ইত্যাদি প্রণয়ন, প্রবিধান এবং করারোপে জনগণের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়গুলো স্পর্শকাতর হওয়ায় এসব দায়িত্ব পালন করা খুব কঠিন। এনবিআরে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন (রাজস্ব আহরণ) পর্যায়ে যারা কাজ করেন তাদের মেধা, প্রজ্ঞা, আইন-কানুনের আলোকে কাজ করতে সদা সতর্ক থাকতে হয়। এ দায়িত্ব পালন কঠিন। সেই সাথে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ। এ দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রের স্বার্থে এনবিআরকে ন্যায়-নীতিনিষ্ঠ নিরপেক্ষ হতে হয়। দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন ব্রতে নামতে হয়। সেই যে মহাজন বাক্য— ‘চোর তো চুরি করবে; কিন্তু গৃহস্থকে সজাগ থাকতে হবে’। তবে গৃহস্থের দায়িত্ব পালনকালে কেউ যেন এনবিআরের বিরুদ্ধে কোনোরকম ‘হয়রানি’র অনুযোগ, রেগুলেটর হিসেবে কঠোর কিংবা নিজের স্বেচ্ছা ক্ষমতা প্রয়োগে পক্ষপাতিত্ব তথা দুর্নীতির অভিযোগ তুলতে না পারে; সে বিষয়ে সদা সচেতন থাকতে হয়। করদাতা নিজের মেধা ও পরিশ্রমের দ্বারা অর্জিত আয় থেকে রাষ্ট্রকে কর দেন, এটি তার নাগরিক দায়িত্ব। এনবিআরের উচিত করদাতাকে তার এই নাগরিক দায়িত্ব পালনে সহায়তা, উদ্বুদ্ধ ও সচেতন করা। কাজটি করতে হবে সম্মান ও সমীহার দৃষ্টিতে। ঔপনিবেশিক মানসিকতাসুলভ সন্দেহ ও নিবর্তনের পন্থা পদ্ধতিতে নয়। কর রাজস্ব এবং খাজনা বা ঋণ এক জিনিস নয়। সুতরাং রাজস্ব আহরণকে খাজনা বা ঋণ আদায়ের সাথে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ নেই। এ কারণে এনবিআরের ইতিবাচক মানসিকতা থাকা খুব প্রয়োজন। যারা রাজস্ব আহরণ নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগ করবেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্যই ইতিবাচক হতে হবে। কারণ, নীতি প্রণয়নের সাথে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব স্বার্থ জড়িত। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নীতি গ্রহণ করা হলে রাষ্ট্র ও জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

রাজস্ব আদায়ের কাজ অন্যান্য সরকারি অন্য সংস্থার চেয়ে এনবিআর সঙ্গত কারণে আলাদা। সমাজকল্যাণ বিভাগের একজন কর্মকর্তার বেতন আর একজন রাজস্ব কর্মকর্তার বেতন এক হওয়া উচিত নয়। এ কারণে উচিত নয় যে, সমাজকল্যাণ বিভাগের কর্মকর্তা এবং রাজস্ব কর্মকর্তার কাজ এক নয়। রাজস্ব কর্মকর্তার কাজের ধরনের সাথে সরকারের রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। যে সংস্থাটি বছরে লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের দায়িত্বে নিয়োজিত; সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করা হবে— এটিই স্বাভাবিক। ফলে কোনো কোনো রাজস্ব কর্মকর্তা প্রলুব্ধ হতে বাধ্য হন। তাই রাজস্ব বিভাগে আলাদা বেতনকাঠামো নির্ধারণ করা যেতে পারে। তাদের প্রণোদনার ব্যবস্থা থাকলে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে কাঠামোগত সমস্যা। আইনের দুর্বলতা তো আছেই। একই সাথে করদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের মানসিকতায় পরিবর্তন আনাও প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, রাজস্ব আহরণে, করের আওতাবহির্ভূত তথা ফাঁকিবাজদের ধরার ক্ষেত্রে কঠোর ও নিরপেক্ষ (শুধু সরকারি নয় রাষ্ট্রীয়) অঙ্গীকার ও সমর্থন থাকা দরকার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এনবিআর যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত হওয়া দরকার। এখানে পক্ষপাতিত্ব বা সীমাবদ্ধ বা দলীয় সমর্থন বা শ্রেণিকরণ সমীচীন নয়। নিয়মিত করদাতার আয়ের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে, অনিয়মিতদেরটা করা যাবে না— এমন বৈষম্য সবাইকে করের আওতায় আনার ক্ষেত্রে এবং বিদ্যমান করদাতাকে নিরুৎসাহিত করার শামিল। রাজস্ব খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব করদাতার প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। দেশে নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবি করলেও ব্রিটিশদের তৈরি ঔপনিবেশিক নিয়ম কানুন এখনো চলতে দেয়া যুক্তিযুক্ত নয়। এখনো যিনি নীতি তৈরি করেন, তিনি তা প্রয়োগ করেন। এটি এনবিআরের কাঠামোগত বড় দুর্বলতা।

ভারতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বিভাগ আলাদা। কাস্টমস ও মূল্য সংযোজন করের নীতিমালা নির্ধারণে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রত্যক্ষ কর অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাতব্বরিতে নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলাদেশে এনবিআরের চেয়ারম্যানের অধীনে আয়কর ও কাস্টমস বিভাগ। দুই বিভাগের কাজের ধরন আলাদা। শুল্ক ও আয়করের বিষয়গুলো অত্যন্ত বিশেষায়িত ও জটিল। ফলে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের কাজ একই নেতৃত্বে পরিচালিত হওয়ায় নানা জটিলতা এবং স্বেচ্ছা ক্ষমতা প্রয়োগ বল্গাহীন হয়ে যেতে পারে। বাস্তবায়ন থেকে নীতি প্রণয়নের নেতৃত্ব আলাদা হলে এবং সেখানে স্টেকহোল্ডারদের বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ প্রদানের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টি হলে পারস্পরিক দোষারোপ বা হয়রানির ক্ষেত্র সঙ্কুুচিত হতে পারে। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন উভয় ক্ষেত্রে মান মর্যাদা যথাযথভাবে স্বীকৃতির সুযোগ থাকলে উভয় প্রতিষ্ঠান পারস্পরিক সমন্বয় সিদ্ধ হবে। রাজস্ব আহরণ গতিশীল ও সেবাধর্মী হয়ে উঠবে। পদ্ধতি প্রক্রিয়া সংস্কার বা উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে না।

এনবিআরে দৃষ্টিভঙ্গির রীতি পদ্ধতির সংস্কার অবশ্যই জরুরি। ব্রিটিশরা এ দেশের মানুষকে নেটিভ মনে করে সন্দেহের চোখে দেখত। ব্যবসাবাণিজ্য হোক বা না হোক, রাজস্ব আদায় করতে হবে— এমন মনোভাব পোষণ করা হতো সে সময়ে। রাজস্ব আদায়কারীদের আদায় করা রাজস্বের কিছু অংশ কমিশন হিসেবে দেয়া হতো। বাকিটা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার নিয়ম ছিল। সে জন্য রাজস্ব বিভাগের পদ-পদবিতে কালেক্টর বা কমিশনার শব্দটি এসেছে।

১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ভারতে সিপাহি বিপ্লবের পর ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পরিবর্তে ব্রিটিশ সরকার নিজে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব নেয়। ব্রিটিশ সরকারের সাবেক অর্থ ও রেভিনিউ সচিব জেমস উইলসনকে ভারতবর্ষে প্রথম অর্থমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। ১৮৬০ সালের এপ্রিলে সংসদে প্রথম বক্তৃতা দেন তিনি। ওই সময় সংসদে এ দেশে প্রথম আয়কর ও শুল্ক আরোপের ঘোষণা করে বলেন, জনগণকে কাজ দেখাতে হবে। উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য টাকা লাগবে। তাই ঘোষণা দেয়া হয়, আয়ের ওপর কর ও পণ্য আমদানিতে শুল্ক দিতে হবে।

ব্রিটিশ আমলে পোষণ করা ধ্যানধারণায় প্রণীত হয় রাজস্ব আইন। ১৯২৪ সালে প্রথম ভারতে আয়কর আইন তৈরি করা হয়। মূলত ১৮৬০ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত যেসব নিয়ম-কানুন করা হয়েছিল, সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয় এ আইনে। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হলেও মানসিকতায় সবকিছু ব্রিটিশ রয়ে যায়। কর আদায়ে মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। কর রাজস্ব আদায়কারীকে বেতনভুক সরকারি কর্মচারী হিসেবে নিয়ে আসা হয়। মূলত তখন থেকে রাজস্ব আইনের প্রয়োগে, ব্যাখ্যায় আরো জটিলতা দেখা দেয়। তাতে সহায়তার জন্য বিশেষ প্রফেশনাল গ্রুপও গড়ে ওঠে। ভিন্ন ব্যাখ্যার বাতাবরণে ‘আন্ডার হ্যান্ড’ লেনদেন শুরু হয়। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে অনলাইনিকরণ তথা আইনের পদ্ধতি প্রক্রিয়া সংস্কার আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর বাস্তবায়ন করদাতা ও রাজস্ব বিভাগ উভয় পক্ষের স্বার্থে সত্বর হওয়া বাঞ্ছনীয়।

লেখক : সাবেক সচিব ও এনবিআরের প্রাক্তন চেয়ারম্যান