আল্লাহর প্রতি ভয় ও মহব্বত অর্জনের একটি উৎকৃষ্ট মাধ্যম হলো সিয়াম সাধনা। এটি কেবল কিছু খাদ্য, পানীয় ও জৈবিক চাহিদা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করা নয়। এর মাঝে নিহিত আছে আল্লাহর ভালোবাসা ও তার নৈকট্য লাভের অদম্য বাসনা। যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি তার মনের এই পরম ইচ্ছাকে আকুতিসহকারে জাগ্রত করতে পারে, রমজান থেকে কল্যাণ লাভের সৌভাগ্য তার নসিব হবে। রমজান তার জীবন থেকে দূর করে দেয় যাবতীয় গুনাহ। পুণ্য দিয়ে ভরে দেয় তার আমলনামা।
সিয়ামের মধ্যে অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। এটি মানুষকে ক্ষুধার যন্ত্রণা বুঝতে শেখায়। কেবল একজন ক্ষুধার্ত মানুষই উপলব্ধি করতে পারে অনাহারী থাকার এই মুহূর্তগুলো কেমন হয়। একজন বাবা বা পরিবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি যখন অসহায় হয়ে পড়ে, পরিবার থেকে তার অধীনস্থ মানুষের বাঁচার জন্য আর্তনাদ ভেসে আসে, অভাবের মধ্যে ডুবে থাকা এই মানুষটিই তখন বোঝে দারিদ্র্যের কশাঘাত কী জিনিস। আল্লাহ ক্ষুধা দিয়ে, তৃষ্ণা দিয়ে মানুষকে এমন কিছু শেখাতে চান, যেন মানুষ মানবিক হয়ে অন্যের প্রতি দয়ার্দ্র মনোভাব নিয়ে তাদের দুঃসময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
আল্লাহর প্রিয় এবং একমাত্র তারই জন্য নিবেদিত পুণ্যময় ইবাদত হলো রোজা। যার মাধ্যমে মানুষ তাদের আশপাশের অসহায় মানুষগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখে। তাদের দুঃসময়ে এগিয়ে যায়। নিজে ভালো থাকা, বিলাসিতায় ভাসা, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর ব্যাপারে উদাসীন থাকা, এটি কখনো ঈমানদার বা মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। মুমিন তো সে, যে নিজে পেটপুরে খাওয়ার আগে অপর ভাই ও প্রতিবেশীর কথা ভাবে। তাদের অসহায় মুখগুলো তাকে আঘাত করে। মুমিন দিলে থাকবে মানুষের প্রতি ভালোবাসা। মানুষের হক আদায়ের পেরেশানি। নিজের শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা করবে। মানুষকে অবশ্যই কিয়ামতের দিন এই হক সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। সুতরাং এটি কেবল শুধু অবশ্য পালনীয় ইবাদত এখানেই শেষ নয়; বরং পাপ থেকে মুক্তি ও পুণ্য লাভের পথও বটে। যে পথের উপর মুমিন মুসলমান সবসময় অবিচল থাকে। নিজে ভালো থাকে। অন্যকে ভালো রাখে। আল্লাহর দেয়া সম্পদ থেকে অপরের জন্য খরচ করে। সম্পদের ইবাদত আদায় করায় সে মোটেই কার্পণ্য করে না।
যে ব্যক্তি রমজান পেয়েও মিথ্যা ছাড়তে পারল না, মানুষের অধিকার নিয়ে ভাবল না, মুনাফাখোরি ও জুলুমকে জীবনের অংশ বানিয়ে এমন সব কাজ করল যা মানুষের কষ্টকে আরো বাড়িয়ে দিলো, এমন মানুষের খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কিছু যায়-আসে না। কারণ সে তো আল্লাহকেই চিনল না, তার রহমত লাভের আশাও করল না। কোনো জালিমের প্রতি আল্লাহর রহমত থাকে না। কারণ সে তো আল্লাহর রহমত চায় না। যদি সে আশা করতো রহমতের, সে তো পাপাচারে লিপ্ত হতে পারতো না। মানুষের অধিকার হরণকারীদের প্রতিও কখনো আল্লাহর মহব্বত সৃষ্টি হয় না। এ ধরনের কাজ মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সামাজিকভাবে সে নিজেকে যত বড় ইবাদতকারী বা নেক আমলের দাবি করুক না কেন, আল্লাহর কাছে এ জন্য তার কোনো প্রতিদান নেই।
সুতরাং মানুষ যা কিছু অর্জন করবে ন্যায় ও হকের পথে থেকে অর্জন করবে। যা কিছু ব্যয় করবে কেবল আল্লাহর জন্য ব্যয় করবে। মানুষকে কাছে টেনে নেয়া বা দূরে সরিয়ে দেয়া সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। ঈমানি জিন্দেগির জন্য ক্ষতিকর কোনো কিছুই মুমিন গ্রহণ করবে না। মানুষের প্রতি সে সবসময় এহসান করবে। মানুষ যেন মানুষের দ্বারা উপকৃত হয়। উপকারের পথ ও পদ্ধতির ব্যাপারে সে সবসময় সতর্ক থাকবে।
হারাম উপার্জন দিয়ে মানুষ যতই দান-সদকা করুক না কেন, এই দান-সদকা তার কোনো কাজে আসবে না। এমনকি ইবাদতের স্বাদ পাওয়ার ন্যূনতম মনের অবস্থাও তার তৈরি হবে না। মানুষ হয়েও যারা মানুষের হক নষ্ট করে, অপরের অধিকারে নিজের ভাগ বসায়, হালাল ও হারামের পার্থক্য বুঝেও কেবল নিজ স্বার্থের চিন্তায় হারাম উপার্জনের পথ বেছে নেয়, জাহান্নামই হবে তাদের একমাত্র ঠিকানা।
মানুষের অধিকার নিয়ে খেলছে যারা, সেই পাপ কাজের ভয়াবহতা ভাবতে পারছে না তারা। যদি পারতো, তাহলে এমনটি কখনো করতো না। কিয়ামতের কঠিন বিপদে মা সন্তানকে চিনবে না, সন্তান মায়ের খবর রাখতে চাইবে না, প্রত্যেকে কেবল নিজের কথাই চিন্তা করবে, সেই কঠিন মুসিবতের দিন অপরের হক নষ্টকারী মানুষকে মানুষ এমনিতেই ছেড়ে দেবে, এটি কল্পনাও করা যায় না। বাস্তবতা তো আরো কঠিন।
রমজান মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে। এই কুরআন-মানুষ কী গ্রহণ করবে আর কী বর্জন করতে হবে, সবই বর্ণনা করেছে মানুষের জন্য। কোনো অজুহাত আল্লাহ বাকি রাখেননি মানুষের জন্য। যাকে আশ্রয় করে মানুষ মুক্তির পথ খুঁজতে পারে। রমজান পেয়েও যারা কুরআন পড়ল না, কুরআন বুঝল না, তারা কিভাবে রমজানের পূর্ণ ফজিলত আশা করতে পারে? কুরআন এসেছে মানুষকে বদলে দিতে।
অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিতে। কিভাবে তারা জাহান্নামের অন্ধকার থেকে জান্নাতের আলোর দিকে যাবে? তারা তো পথই চিনল না। জীবনের মানেও বুঝল না। কেবল প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। কিভাবে তারা জীবনে অলিতে-গলিতে ওঁৎ পেতে থাকা শয়তানের ধোঁকা থেকে নিজেকে রক্ষা করবে?
লেখক : পিএইচডি গবেষক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



