রিয়াজ উদ্দিন
সব ভাষার শক্তি সমান নয়। কোনো কোনো ভাষা পৃথিবীকে শাসন করে। অর্থাৎ গোটা পৃথিবী সেই ভাষা বুঝতে পারে। এসব আন্তর্জাতিক ভাষার অসংখ্য শব্দ বিভিন্ন ভাষায় মিশে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নরেন বিশ্বাস বলেছেন, বাঙলা জীবন্ত ভাষা। গতি এর ধর্ম, নিরন্তর রূপান্তরেই এর ঋদ্ধি। ফলে কোনো সূত্রের সাহায্যে এ-ভাষার ব্যাকরণ, ভাষাতত্ত্ব, ধ্বনিতত্ত্ব বা উচ্চারণতত্ত্বকে চিরস্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ করা আদৌ সম্ভব নয়।
ভাষা হলো বহতা নদীর মতো। বদ্ধ পুকুরের মতো নয়। প্রতিটি ভাষায়ই প্রতিনিয়ত নতুন শব্দ অন্তর্ভুক্ত হয়। আবার প্রচলিত কিছু শব্দ বাদও পড়ে যায়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। তাই অভিধানের একেকটি সংস্করণে নতুন নতুন শব্দ যোগ হতে দেখা যায়। কোনো বাঁধ দিয়ে ভাষাকে আবদ্ধ করা যায় না। বিদেশী ভাষার শব্দ বলে কোনো শব্দ গ্রহণ করবে না, ভাষার ক্ষেত্রে এমন শাসন বেমানান। সময়ের সাথে সাথে প্রয়োজনের তাগিদে ভাষা নিজের প্রয়োজনে বিদেশী ভাষার শব্দকে আত্তীকরণ করে। যেমন : জিপিএস, ই-মেইল, এসএমএস, সিম, সেলফি প্রভৃতি শব্দ এখন আর বিদেশী নয়।
বাংলা ভাষায় শব্দের অনুপাত নিয়ে এক গবেষণায় দেখা যায় এ ভাষায় প্রায় ৪০ শতাংশ শব্দ তৎসম, ১৬ শতাংশ তদ্ভব (দেশী) এবং বাকি ৪৪ শতাংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ফারসি, আরবি, ইংরেজি ও পর্তুগিজসহ বিভিন্ন বিদেশী শব্দ আছে। ‘আরবি-ফারসি বাদ দিলে বাংলা ভাষা হয়ে যাবে শ্রীহীন’ শিরোনামে একটি কথোপকথন লিখেছেন লেখক ও গবেষক অনল পাল।
ভাষাকে কোনো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু এ দেশের মানুষ সেটা মেনে নেয়নি। ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে আসে। নিজেদের বুকের রক্ত দিয়ে তারা বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
কোনো কোনো বিদেশী ভাষার শব্দ এত বেশি ব্যবহার হয় যে সেটা একসময় দেশী ভাষার শব্দ বলে মনে হয়। আমাদের দেশে ২০২৪ এর জুলাইয়ে ছাত্রসমাজ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ইনকিলাব, গোলামি, আযাদি, ইনসাফ এমন বেশ কিছু বিদেশী ভাষার শব্দ ব্যবহার করে। এই শব্দগুলো বিদেশী ভাষার হলেও আমাদের দেশে মানুষের মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায়। ছাত্রসমাজ স্বাচ্ছন্দ্যে এসব শব্দ ব্যবহার করে তাদের আন্দোলনকে বেগবান করতে পেরেছে। এতে বাংলা ভাষার প্রতি তাদের ভালোবাসা কমে গেছে, সেটা বলা যৌক্তিক নয়। এই শব্দগুলোর ভেতরে যে চৌম্বকীয় শক্তি ছিল তা পুরোটাই ছাত্রসমাজ ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছিল। ইনকিলাব শব্দটির চৌম্বকীয় শক্তি এত বেশি তীব্র ছিল যে তা তরুণ-যুবা সব শ্রেণীর নারী পুরুষের রক্তের প্রতিটি কণায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। সেই আগুন দাবানল জ্বালাতে সক্ষম হয়। আর দাবানলে পুড়ে ছারখার হয়ে যায় স্বৈরশাসকের মসনদ। অর্থাৎ তারা তাদের বিচক্ষণতা দিয়ে জুলুমের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার আদায়ে এবং জাতিকে মুক্ত করতে সঠিক শব্দমালা বেঁছে নিতে পেরেছিল।
শব্দ কখনো কখনো মানুষের হৃদয়কে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। একই শব্দ একেকজন মানুষের কাছে একেকরকম অর্থ বহন করে। হোক সেটি দেশী বা বিদেশী শব্দ। যেমন ড্রিম শব্দটি শুনলে সাধারণত আমাদের চোখে স্বপ্ন বিষয়টি ভেসে ওঠে। ঘুমিয়ে অথবা জেগে আমরা স্বপ্ন দেখি। চেষ্টা এবং ভাগ্যের জোরে কারো স্বপ্ন সত্য হয় আবার কারোরটা হয় না। কিন্তু দীর্ঘদিনের সাদা-কালোর বর্ণ বৈষম্য ও নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষকে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য যখন মার্টিন লুথার কিংয়ের মুখে এই একই শব্দ উচ্চারিত হয় ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ তখন মানুষের হৃদয়ের গহিনে চেপে রাখা শত বছরের কষ্টের আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরিত হয়। বর্ণবাদীদের মুখে চপেটাঘাত করতে লেলিহান শিখার মতো জ্বলে ওঠে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন, যা তাদেরকে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার ফিরিয়ে দেয়।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়ে বারাক ওবামার একটি স্লোগান ছিল। চেইঞ্জ উই ক্যান বিলিভ ইন। এই চেইঞ্জ শব্দটি এত বেশি অর্থবহ ছিল, যা মানুষের হৃদয়ে নাড়া দিতে সক্ষম হয়। মানুষ ওবামাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করে। নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি রাজনৈতিক শব্দের যথাযথ ব্যবহার তাকে সফল হতে সাহায্য করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের নবনির্বাচিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ভাষা দিবসের এক অনুষ্ঠানে ছাত্রসমাজের ব্যবহার করা কিছু বিদেশী ভাষার শব্দ নিয়ে বিষোদগার করতে দেখা গেছে। তিনি ইনকিলাব, ইনসাফ, আযাদি এসব শব্দকে বিদেশী শব্দ বলে অভিহিত করেন এবং এসব শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের এই বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘ইনকিলাব’ ‘ইনসাফ’ ‘আযাদি’ এই শব্দগুলো আমাদের ছেলেমেয়েরা অপূর্ব স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে ২৪-এর জুলাই আগস্টে ধারণ করেছে কোনো ধরনের হীনম্মন্যতা ছাড়াই। শব্দগুলো অবশ্যই টিকে থাকবে, এই শব্দগুলো নিয়ে অ্যালার্জি মাত্রার ওপরে। যত অ্যালার্জি, শব্দগুলো ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে।’
প্রমথ চৌধুরী বাংলা ভাষায় বিদেশী ভাষার ব্যবহার বিষয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তার সেই বিখ্যাত উক্তিটি ছিল ‘ফারসি আরবি ছেঁটে দিলে বাঙ্গলা ভাষা নামে কোনো একটা ভাষাই থাকে না’। তিনি ভাষার স্বাভাবিক মিশ্রণে আরবি-ফারসি শব্দের অপরিহার্যতা স্বীকার করেছিলেন। তিনি মনে করতেন বিদেশী শব্দের আত্মীকরণ ভাষাকে সমৃদ্ধ করে।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিটি কবিতায় আরবি ফারসি উর্দু, হিন্দিসহ নানা ভাষার ব্যবহার চোখে পড়ে। তিনি শব্দগুলোকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, পাঠকবৃন্দ অকপটে তা গ্রহণ করেছেন। নজরুল সাহিত্য বাংলা ভাষায় অপরিসীম প্রভাব সৃষ্টি করেছে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন এবং সেসব দেশের গানের সুর ও ভাষার মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে সেগুলোর অনেক কিছুই তার কবিতায় স্থান দিয়েছেন। এ জন্য নজরুল সাহিত্যকে বাংলাদেশ এমনকি পশ্চিমবঙ্গের কোনো লেখক, গবেষক বা বুদ্ধিজীবী অবহেলার দৃষ্টিতে দেখেননি বা বিরূপ সমালোচনাও করেননি।
রাজনীতিবিদরা ভাষা নিয়ে রাজনীতি করেন। আবার তাদের মুখে রাজনীতির ভাষাও দেখা যায়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অনেক রাজনীতিবিদের ভাষা বিশ্বাস করেন না। কারণ তারা যেসব প্রতিশ্রুতি দেন বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো মুখের ভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তাই এটাকে রাজনীতির ভাষা বলা হয়। রাজনীতির ভাষায় তারা জনগণকে বোকা বানিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। তারা আবার ভাষা নিয়েও রাজনীতি করেন। তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়িয়ে বাংলা ভুলিয়ে বিদেশে লেখাপড়া করতে পাঠান। আর দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বাংলাভাষাকে আঁকড়ে ধরে থাকার সবক দেন। কিন্তু ভাষা নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে অনেকেই তাদের ক্ষমতা হারান। যেমন হারিয়েছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। সর্বশেষ বাংলাদেশের স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতন ত্বরান্বিত করেছিল ছাত্রসমাজকে নিয়ে তার ভুল ভাষার রাজনীতি। তাই রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতির ভাষা উপকারী হলেও ভাষা নিয়ে রাজনীতি তাদের জন্য দুঃসংবাদ নিয়ে আসতে পারে।
লেখক : ব্যাংকার



