বাংলাদেশে বর্তমানে প্রচলিত নির্বাচনী ব্যবস্থায় ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো জনপ্রিয় হলেও প্রান্তিক অবস্থায় পড়ে থাকে। তারা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া বক্তব্য রাখলেও সংসদে প্রতিনিধিত্ব পায় না। ফলে গণতন্ত্রের বহুমাত্রিকতা সীমিত হয়ে পড়ে।
অনেকে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতির বিরোধিতা করে বলেন, ‘ভোট দেবেন গুলিস্তানে, এমপি হবে পাকিস্তানে; ভোট দেবেন স›দ্বীপে চলে যাবে মালদ্বীপে।’ আসলে বিষয়টি এতটা একরৈখিক নয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক একটি ছোট দলের নেতা আবদুর রহিম সাহেবকে, যার প্রতীক বিড়াল। খুলনায় তার অনেক সমর্থক থাকলেও তিনি প্রার্থী হয়েছেন ঢাকায়। ফলে খুলনার ভোটাররা তার পক্ষে ভোট দিতে পারে না; অথচ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে ভোটাররা সারা দেশ থেকেই তার দলকে ভোট দিতে পারতেন এবং তাদের ভোট আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হতো।
আমাদের দেশে ৫০-৫৫টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে, কিন্তু ৯০ শতাংশ মানুষই জানে না এই দলগুলোর প্রতীক বা নেতৃত্ব কার হাতে। বড় দলগুলো ছোট দলগুলোকে দু-একটি আসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোটবদ্ধ করে নেয়। পরে ছোট দলগুলো কার্যত বড় দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়, নিজ আদর্শে বিকশিত হতে পারে না। এভাবে তারা বড় দলের লেজুড় হয়ে থাকে। এর ফলে গণতন্ত্রে বৈচিত্র্য না এসে বরং ফ্যাসিবাদী একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেন, পিআর পদ্ধতিতে এককভাবে সরকার গঠন করা কঠিন হতে পারে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, এককভাবে সরকার গঠন করতে পারার দাপটই প্রায়শ ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়।
সংসদে ছোট-বড় সব দলের প্রতিনিধি থাকলে নীতি, কৌশল ও আদর্শের ভিত্তিতে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, আর জনগণই নির্ধারণ করবে কোন দল কতটা প্রভাবশালী। বড় দল হয়েও ভুল নেতৃত্বে অস্তিত্ব হারাতে পারে আওয়ামী লীগের মতো। আবার ছোট দলও সঠিক নেতৃত্বে বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
পিআর পদ্ধতিতে প্রতিটি দল সারাদেশ থেকে ভোট পাওয়ার সুযোগ পাবে। জনপ্রিয় না হলেও প্রান্তিক অবস্থায় থাকা ছোট দলগুলো অন্তত কিছু আসন পেতে পারে এবং ধীরে ধীরে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারবে; বড় দলের জোটনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে নিজেদের আদর্শিক অবস্থান মেলে ধরতে পারবে।
অতএব, একটি আসনে ‘অটো পাস’-এর আশায় অস্তিত্ব ও নেতৃত্ব অন্য দলের হাতে তুলে দেয়ার চেয়ে আনুপাতিক পদ্ধতির মাধ্যমে সারা দেশে ন্যূনতম ভোট পেয়ে সম্মানজনকভাবে সংসদে প্রবেশ করাই গণতন্ত্রের জন্য উত্তম পথ হতে পারে। এতে সংসদ হবে প্রাণবন্ত, সিদ্ধান্ত হবে বেশি আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে, আর দেশ এগোবে বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের পথে।
লেখক : বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত



