ভয়হীন বাংলাদেশের খোঁজে

বাংলাদেশে ‘চাঁদা’ শব্দটি বহু আগেই অভিধানগত অর্থ হারিয়েছে। এটি আর স্বেচ্ছা অনুদান নয়, বরং এক ধরনের বাধ্যতামূলক কর— যার কোনো আইন নেই, রসিদ নেই, জবাবদিহি নেই।

আর ‘দখল’ মানে শুধু জমি বা ফুটপাথ নয়; দখল হয়েছে রাষ্ট্রের নৈতিকতা, অর্থনীতির প্রবাহ, নাগরিকের অধিকার ও আইনের শাসন।

ফলে চাঁদাবাজি ও দখলবাজি আজ বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটি এক ধরনের সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা। এই বাস্তবতার বিপরীতে যদি আমরা একটি চাঁদাবাজি-দখলবাজিমুক্ত বাংলাদেশের কথা কল্পনা করি— তাহলে সেটি কেমন হবে?

এটি কি ইউটোপিয়া, নাকি বাস্তব নীতি, প্রশাসনিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য?

প্রশ্নটি কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তা, অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

ভয়-ট্যাক্সের অর্থনীতি
চাঁদাবাজি আসলে এক ধরনের ‘ভয়-ট্যাক্স’; দোকান খুলতে মাসোহারা; বাস-ট্রাক চালাতে লাইনম্যানের চাঁদা; বাজারে বসতে স্থানীয় ফি; টেন্ডার পেতে ভাগ— সব মিলিয়ে ব্যবসার ওপর চাপানো হয় অদৃশ্য অতিরিক্ত খরচ।

এই খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই পড়ে। ফলে দ্রব্যমূল্য বাড়ে; প্রতিযোগিতা কমে; সৎ উদ্যোক্তা টিকে থাকতে পারে না।

চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ মানে ব্যবসার এই ‘অদৃশ্য কর’ শূন্যে নামবে। ছোট দোকান থেকে বড় শিল্প— সবাই সমান সুযোগ পাবে। টেন্ডার সিন্ডিকেট ভাঙলে ১০০ টাকার কাজ ২০০ টাকায় করার সংস্কৃতি বন্ধ হবে। রাষ্ট্রের অর্থ বাঁচবে, জনসেবা বাড়বে।

অর্থনীতির ভাষায়, এটি হবে লো-রিস্ক এনভায়রনমেন্ট— যেখানে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা একসাথে বাড়ে। পেশিশক্তি নয়, দক্ষতা ও উদ্ভাবনই হবে মূল পুঁজি।

কেস স্টাডি ১: বাজারের অদৃশ্য কর
ঢাকার একটি কাঁচাবাজারের ৪০ জন দোকানির তথ্য— ছোট দোকান : দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা মাসে; বড় দোকান : ১০-১৫ হাজার টাকা মাসে; একটি বাজার থেকে মাসে সংগ্রহ : প্রায় তিন-চার লাখ টাকা; এই অর্থ যায় না সরকারি কোষাগারে। উন্নয়নেও নয়। যায় কয়েকজন প্রভাবশালীর পকেটে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি ডেডওয়েট লস— যে অর্থ উৎপাদনে যুক্ত হওয়ার কথা, সেটি অপচয় হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘চাঁদাবাজি থাকলে বাজার কখনো প্রতিযোগিতামূলক হয় না। দাম সবসময় বেশি থাকে।’

শহরের চেহারার পরিবর্তন
আমাদের শহরগুলো এখন দখলের মানচিত্র। ফুটপাথ নিয়ন্ত্রণে গোষ্ঠী; মাঠে রাজনৈতিক দখল; খাল-নদী ভরাট; বাসস্ট্যান্ডে ‘লাইন খরচ’;

দখলবাজিমুক্ত শহর মানে : ফুটপাথ পথচারীর; পার্ক শিশুদের; বাজার ব্যবসায়ীর আর নদী নদীর মতো। এটি শুধু সৌন্দর্যের প্রশ্ন নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক দক্ষতার বিষয়। সুশৃঙ্খল নগরায়ন মানে কম দুর্ঘটনা, কম অপচয়, বেশি উৎপাদনশীলতা।

কেস স্টাডি ২: ফুটপাথ কার
ফার্মগেট-কাওরানবাজার এলাকায় হাঁটার জায়গা নেই। হকারদের ভাষ্য, ‘দিনে ৩০০-৪০০ টাকা বিক্রি করি, তারও ১০০-১৫০ টাকা দিতে হয় জায়গার জন্য।’ অর্থাৎ দরিদ্রের ওপরও চাঁদার বোঝা। সমাধান দখল নয়— পরিকল্পিত বাজার, লাইসেন্সিং ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা। এতে শৃঙ্খলা যেমন বাড়বে, তেমনি নগরের উৎপাদনশীল সময়ও বাড়বে।

সরকারি প্রকল্পে ‘বড় চাঁদা’
সবচেয়ে বড় চাঁদাবাজি হয় সরকারি প্রকল্পে। অভিযোগ— সিন্ডিকেট ছাড়া টেন্ডার পাওয়া যায় না। ‘ভাগ’ না দিলে কাজ মেলে না। নিম্নমানের নির্মাণ আর দ্রুত অবকাঠামো ভেঙে পড়ে। ফলে ১০০ টাকার কাজ ১৬০-২০০ টাকায় হয়। চাঁদাবাজিমুক্ত ব্যবস্থা মানে ওপেন কম্পিটিশন; কম খরচ; টেকসই প্রকল্প।

একটি সরল হিসাব : কত বড় অর্থ অপচয়

ধরা যাক ২০ লাখ ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসায়; ৩০ শতাংশ চাঁদা দেয়; গড়ে তিন হাজার টাকা মাসে। তাহলে মাসে ˜˜ ৬০০ কোটি টাকা, বছরে ˜˜ সাত হাজার ২০০ কোটি টাকা।

এই অর্থ যদি উৎপাদনে বিনিয়োগ হয়— নতুন ব্যবসায়, যন্ত্রপাতি, কর্মসংস্থান— তাহলে অর্থনীতির গতি বহুগুণ বাড়তে পারে।

রাজনীতির রূপান্তর
চাঁদাবাজি টিকে থাকে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। বহু এলাকায় ‘এলাকা নিয়ন্ত্রণ’ মানেই রাজনৈতিক শক্তি।

ফলে রাজনীতি- পেশিশক্তি- দখল- অর্থ। এই চক্র ভাঙতে না পারলে সমস্যার সমাধান অসম্ভব।

চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ মানে : ক্যাডার নয়, সংগঠক; ভয় নয়, জনসমর্থন; সন্ত্রাস নয়, আদর্শ। এক তরুণের ভাষায়, ‘রাজনীতিতে যেতে চাই; কিন্তু মাস্তান হতে চাই না।’ এমন তরুণদের জায়গা তৈরি হলেই রাজনীতি সুস্থ হবে।

প্রশাসনে আস্থার প্রত্যাবর্তন : ‘দালাল ছাড়া কাজ হয় না’—এই ধারণা নাগরিকের রাষ্ট্রবোধ নষ্ট করেছে।

ডিজিটাল সেবা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি থাকলে ঘুষ কমবে, চাঁদা কমবে, আস্থা বাড়বে। এক অবসরপ্রাপ্ত আমলার ভাষায়, ‘যেখানে প্রক্রিয়া পরিষ্কার, সেখানে ঘুষের সুযোগ কমে যায়।’

সামাজিক ও মানসিক প্রভাব : ভয় থেকে স্বাধীনতা
চাঁদাবাজির সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থে নয়— মনে। যখন মানুষ ভাবে, ‘ঝামেলা এড়াতে টাকা দিই’, তখন সে নাগরিক নয়, জিম্মি।

ভয়হীন সমাজে উদ্যোক্তা বাড়ে, সংস্কৃতি বিকশিত হয়, আত্মবিশ্বাস বাড়ে, গণতন্ত্র শক্ত হয়, মানুষ নিজেকে ‘প্রজা’ নয়, ‘অধিকারসম্পন্ন নাগরিক’ হিসেবে ভাবতে শেখে।

এক সকাল : বাস্তবতার গল্প
মোহাম্মদপুরের মুদিদোকানি আবদুল মালেক প্রতি সপ্তাহে খামে টাকা রাখেন। ‘সরকারকে ট্যাক্স দিই, আবার ওদেরও ট্যাক্স দিতে হয়। এটা ট্যাক্স না— ভয়।’ এই ভয়ই বাংলাদেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর প্রতিদিনের বাস্তবতা।

তাহলে করণীয় কী
সমাধান অসম্ভব নয়। তবে প্রয়োজন তিনটি মৌলিক শর্ত : ১. রাজনৈতিক জিরো টলারেন্স; দলীয় পরিচয় দিয়ে অপরাধ রক্ষা নয়; ২. নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ : পুলিশ ও প্রশাসনের পেশাদারিত্ব; ৩. নাগরিক সচেতনতা : ‘সমঝোতা সংস্কৃতি’ ভাঙা। সেই সাথে ডিজিটাল ট্র্যাকিং, স্বচ্ছ টেন্ডার, নগর পরিকল্পনা, হটলাইন ও দ্রুত বিচার। কারণ, নীরব সমর্থনও চাঁদাবাজিকে শক্তিশালী করে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশ : একটি সম্ভাবনার ছবি
ভাবুন— রিকশাচালক পুরো আয় নিয়ে ঘরে ফিরছেন; দোকানি মাসোহারা দিচ্ছেন না; ঠিকাদার দক্ষতায় কাজ পাচ্ছেন; ফুটপাথ খালি; থানায় গেলে সম্মান মিলছে— এটি কল্পনা নয়। এটি সুশাসনের ফল।

চাঁদাবাজি-দখলবাজিমুক্ত বাংলাদেশ মানে উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞা, যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখায় না, নিরাপত্তা দেয়। যেখানে ক্ষমতা দখলের নয়, সেবার। গণতন্ত্র তখন স্লোগান নয়— অভিজ্ঞতা।

স্বাধীনতা তখন ইতিহাস নয়— প্রতিদিনের বাস্তবতা। প্রশ্ন একটিই, আমরা কি সেই সাহসী পরিবর্তনের পথে হাঁটতে প্রস্তুত?

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নয়া দিগন্ত

[email protected]